মহিমান্বিত নকশা (The Grand Design): পর্ব-১

0

[বইটির সূচিপত্র তখা সব পর্বের লিংক দেখুন এখানে]

প্রথম অধ্যায়: অস্তিত্বরহস্য (The Mystery of Being)

আমাদের প্রত্যেকেই খুব অল্প সময়ের জন্য বেঁচে থাকি, এবং এই স্বল্প সময়ের মাঝে এই সমগ্র মহাবিশ্বের অল্প অংশই আমাদের পক্ষে দেখা বা অনুসন্ধান করা সম্ভব হয়ে ওঠে। কিন্তু মানব প্রজাতি খুবই কৌতূহলী। আমরা বিস্মিত হই, আমরা উত্তর খুঁজি। এই কোমল-কঠোর পৃথিবীতে বেঁচে থেকে এবং উপরের সুবিশালতার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মানুষ বরাবরই নানা রকমের প্রশ্ন করে গেছে: আমরা যে পৃথিবীতে বেঁচে আছি সেটিকে কীভাবে বোঝা যাবে? এই মহাবিশ্বের মতিগতিই বা কেমন? বাস্তবতার প্রকৃতি কেমন? সবকিছু কোথায় থেকে এলো? মহাবিশ্ব সৃষ্টিতে কি কোনো সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন ছিলো? আমরা সকলেই এইসব প্রশ্নাবলি নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তা করি না, তবে প্রায় প্রত্যেকই কখনো না কখনো এইসব নিয়ে মাথা ঘামাই।

গতানুগতিকভাবে এইসব প্রশ্ন দর্শনশাস্ত্রের পাঠ-এখতিয়ারে ছিলো, কিন্তু দর্শনশাস্ত্রের মৃত্যু হয়েছে। দর্শনশাস্ত্র আধুনিক বিজ্ঞান বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞানের নানাবিধ উৎকর্ষতার সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে হালনাগাদ করতে পারে নি। ক্রমে বিজ্ঞানিরাই আমাদের একমাত্র এবং নির্ভরযোগ্য আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছেন। এই বইটির উদ্দেশ্য হলো সাম্প্রতিক সময়ের আবিস্কার এবং তাত্ত্বিক অগ্রগতির আলোকে পূর্বোল্লেখিত প্রশ্নগুলোর উত্তরানুসন্ধান। এইসব বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি আমাদের মহাবিশ্ব ও সেখানে আমাদের অবস্থান সম্পর্কে এক নতুন ধারণার সম্মুখীন করেছে যেটি কিনা গতানুগতিক ধারণা থেকে অনেকাংশে ভিন্ন, এমনকি যদি দুয়েক দশক আগের অবস্থার সাথে মিলিয়ে দেখেন তবুও ভিন্নতা চোখে পড়বে। যদিও এই নতুন ধারণার প্রথম খসড়াচিত্র প্রায় শতাব্দি খানেক পুরানো।

মহাবিশ্ব সম্পর্কিত গতানুগতিক ধারণা মতে বস্তুসমূহ একটি সুনির্ধারিত পথে পরিভ্রমণ করে এবং তাদের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস আছে। কোনো নির্দিষ্ট সময়ক্ষণে আমরা তাদের অবস্থান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নির্ধারণ বা পরিমাপ করতে পারি। এই ধারণা দৈনন্দিন উদ্দেশ্যের জন্য কার্যকরী, কিন্তু ১৯২০ সালে দেখা গেলো যে এই চিরায়ত ধারণা ভৌত জগতের পারমাণবিক ও অতিপারমাণবিক স্তরের বিভিন্ন “অদ্ভুত” ঘটনা ব্যাখ্যা করার জন্য কার্যকরী নয়। ফলে সেই সময় একটি ভিন্ন নির্মাণকাঠামো (framework) পরিগ্রহণ করার দরকার হয়ে পড়ে- কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা। দেখা গেলো যে অতিপারমাণবিক বিভিন্ন ঘটনার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা বেজায় রকমের নির্ভুল এবং যখন বৃহত্তর বস্তুসমূহের উপর প্রয়োগ করা হয় তখন চিরায়ত তত্ত্বের অনুমান বা ভবিষ্যদ্বাণীর সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। মনে রাখা দরকার যে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা এবং চিরায়ত পদার্থবিদ্যা ভৌতবাস্তবতার সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ধারণার উপর ভিত্তি করে ঘটে উঠেছে।

কোয়ান্টাম তত্ত্বকে নানাবিধভাবেই সূত্রবন্ধ করা যায়, তবে সবচে’ সহজ বর্ণনা দিয়েছিলেন রিচার্ড (ডিক) ফাইনম্যান, যিনি কিনা ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির একজন বর্ণিল বিজ্ঞানি ছিলেন এবং মাঝে মাঝে কাছেরই একটি বস্ত্রমোচন ক্লাবে (strip joint) বাঙ্গো ড্রাম বাজাতেন। ফাইনম্যানের মতে, একটি সিস্টেমের কেবল মাত্র একটি সুনির্দিষ্ট ইতিহাসই নয় বরং সম্ভাব্য সব ইতিহাসই থাকতে পারে। আমাদের উত্তরানুসন্ধানের জন্য আমরা ফাইনম্যানের পদ্ধতিটি আরো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করবো এবং এটি প্রয়োগ করে দেখবো যে মহাবিশ্বের কোনো একক ইতিহাস নেই, এমনকি কোনো স্বাধীন অস্তিত্বই নেই। অনেক পদার্থবিজ্ঞানির কাছে-ও ব্যাপারটি বৈপ্লবিক ধারণা বলে মনে হতে পারে! মনে হয় বটে, আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক বিষয়ই আমাদের সহজাত ধারণা সাথে খাপ খায় না। কিন্তু আমাদের সহজাত ধারণাসমূহ প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে ঘটে ওঠা, অত্যাধুনিক প্রযুত্তিলব্ধ পারমানবিক জগৎ বা আদি মহাবিশ্বের চিত্রের উপর ভিত্তি করে নয়।

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের উদ্ভবের আগ পর্যন্ত অনেকে ভাবতো যে সব জ্ঞানই সরাসরি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে লাভ করা সম্ভব অর্থাৎ আমরা ইন্দ্রিয়াবলি দিয়ে একটি বস্তুকে যেমনটি অনুভব করি বস্তুটি তেমনই। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের চমকপ্রদ সাফল্য- যেগুলো ফাইনম্যানের ধারণার মতো ধারণার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এবং আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার সাথে সাংঘর্ষিক- দেখায় যে বাস্তবতা আসলে এইরকম নয়। বাস্তবতার গতানুগতিক চিত্র তাই আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সাথে খাপ খাওয়ার নয়। এই রকমের বিভ্রান্তি কাটানোর জন্য আমরা মডেল-নির্ভর বাস্তবতার (model-dependent realism) সাহায্য নিই। ব্যাপারটির মূল ধারণা হলো যে আমরা ইন্দ্রিয়তাড়িত হয়ে জগতের একটি কল্পিত মডেল মস্তিষ্কে বানিয়ে নিই। যখন এমন কোনো মডেল বিভিন্ন ঘটনাকে ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে তখন আমরা এই মডেলকে এবং এর সব গাঠনিক ও ধারণাগত উপাদানকে বাস্তবতার বৈশিষ্ট্য বা পরমসত্য হিসাবে মেনে নিই। কিন্তু দেখা যায় যে এইসব ঘটনাবলি অন্য মডেল দিয়ে-ও ব্যাখ্যা করা যায়, যেখানে ভিন্ন ঘরনার মৌলিক উপাদান এবং ধারণা ব্যবহার করা হয়। ধরুন, এমন দুইটি ভিন্ন মডেল একটি ঘটনা সম্পর্কে নিখুঁত ভাবে ভবিষ্যদ্বাণী বা অনুমান করতে পারে তখন বলতে পারবেন না যে একটি মডেল অন্য মডেলের চেয়ে বেশি বা কম বাস্তব, বরং আমরা যেকোনো একটি গ্রহণযোগ্য মডেলকে দ্বিধাহীনভাবে ব্যবহার করতে পারি।

সেই প্লেটো থেকে শুরু করে নিউটনের উৎকৃষ্ট থিউরী হয়ে আধুনিক কোয়ান্টাম তত্ত্ব পর্যন্ত, আমরা বিজ্ঞানের ইতিহাসে একের পর এক উন্নততর তত্ত্ব অথবা মডেল-ধারণা আবিস্কার করেছি। স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে এই ধারা কি চলতেই থাকবে, নাকি একটি পরমতত্ত্বে গিয়ে থামবে- যে পরমতত্ত্বের সাহায্যে মহাবিশ্বের সকল বল ও পর্যবেক্ষণকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে, নাকি আমরা একের পর এক উন্নততর তত্ত্ব আবিষ্কার করে যেতেই থাকবো অর্থাৎ এমন কোনো পরমতত্ত্বই আবিস্কার করা সম্ভব হবে না যেটি উন্নয়ন-অসাধ্য হবে? এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো আমাদের হাতে নেই, বরং আমাদের কাছে এমন একটি তত্ত্ব আছে যেটি পরমতত্ত্বের অধিকতর কাছাকাছি; যার নাম এম-তত্ত্ব। এখনো পর্যন্ত এম-তত্ত্বই একমাত্র মডেল, যার এমন সব বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলো একটি পরমতত্ত্বের থাকা উচিত এবং আমাদের পরবর্তী আলোচনা হবে অনেকাংশই এই এম-তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে।

সাধারণ বিচারে এম-তত্ত্বকে একক কোনো তত্ত্ব বলা যায় না। এটি বরং একটি তত্ত্বগুচ্ছ বা তত্ত্বের সমষ্টি, যেটির প্রতিটি সদস্য তত্ত্ব ভৌত ঘটনাসমুহের কোনো একটি নির্দিষ্ট অংশকে বর্ণনা করে। ধরেন গিয়ে অনেকটা মানচিত্রের মতো। অনেকে জানেন পুরো পৃথিবীর ভূতলকে একটি একক মানচিত্রে পুরোপুরি দেখানো সম্ভব নয়। সাধারণত মানচিত্র তৈরিতে যে মারকেটর অভিক্ষেপণ (Mercator projection) ব্যবহার করা হয় তাতে উত্তর এবং দক্ষিণ দিকে যতোই যাওয়া হয়, এলাকাসমুহ বড় থেকে আরো বড় দেখায় এবং উত্তর ও দক্ষিণ মেরুকে দেখানো যায় না।। তাই পুরো পৃথিবীর একটি নির্ভরযোগ্য মানচিত্র তৈরি করতে হলে কতগুলো ভিন্ন ভিন্ন মানচিত্র অংশ ব্যবহার করা হয়, যেখানে ক্ষুদ্রাংশগুলো পৃথিবীর একেকটি অংশকে নির্ভুলভাবে প্রকাশ করে। ফলে মানচিত্রের অংশগুলো একে-অপরের উপর আপতিত হয় এবং যেখানে আপতিত হয় সেখানে উভয় চিত্রই একই এলাকা বর্ণনা করে। এম-তত্ত্ব অনেকটা এরকমই। এম-তত্ত্বের বিভিন্ন সদস্য তত্ত্ব দেখতে অনেক সময় একে অপর থেকে ভিন্ন মনে হলেও তারা মূলত একটি একক তত্ত্বের অন্তর্নিহিত বিভিন্ন অংশ। মূল তত্ত্বের এইসব বিভিন্ন রূপ যার একেকটি একেক সীমায় প্রযোজ্য, যেমন- যখন চলকের মান যেমন শক্তির পরিমাণ খুবই ছোট, তার জন্য রয়েছে একটি সদস্য তত্ত্ব, যেনো মারক্যাটর অভিক্ষেপণ থেকে পাওয়া পৃথিবীর মানচিত্রের বিভিন্ন অংশ, যে অংশে একাধিক মানচিত্র একে অপরের উপর আপতিত হলে-ও তারা একই অনুমান যোগায়। যেমন কোনো ভালো সমতল প্রতিলিপি বা মানচিত্র নেই যেটি কোনো আপতিত মানচিত্র ছাড়া পুরো ভূতল পুরোপুরি দেখাতে পারে তেমনি এমন কোনো একক তত্ত্ব নেই যেটি এককভাবে সকল পর্যবেক্ষণকে ব্যাখ্যা করতে পারে।

আমরা বর্ণনা করবো কীভাবে এম-তত্ত্ব সৃষ্টি বিষয়ক বিভিন্ন প্রশ্নসমূহের উত্তর সরবরাহ করতে পারে। এই তত্ত্ব মোতাবেক, আমাদের মহাবিশ্বই একমাত্র মহাবিশ্ব নয়। বরং এম-তত্ত্ব মতে, একদম শূন্য থেকে বহু সংখ্যক মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিলো। তাদের সৃষ্টিতে কোনো অতিপ্রাকৃতিক শক্তি বা ঈশ্বরের অংশগ্রহণের প্রয়োজন নেই। বরং ভৌত সূত্রসমূহ মেনেই এই বহুসংখ্যক মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছে। বিজ্ঞান এইরকমই অনুমান করছে। প্রতিটি মহাবিশ্বেরই নানা ইতিহাস আছে এবং পরবর্তী কোনো নির্দিষ্ট সময়ে, যেমন সৃষ্টির সূচনা থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত, এরা সম্ভাব্য অনেক অবস্থাতেই থাকতে পারে। তবে এইসব অবস্থার বেশিরভাগই আমাদের পর্যবেক্ষিত মহাবিশ্ব থেকে সম্পুর্ণ আলাদা এবং কোনো প্রকার জীবনের জন্য প্রতিকূল হতে পারে। খুব কম মহাবিশ্বেই আমাদের মতো জীবনের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব। তাই আমাদের অস্তিত্বই যেসব সম্ভাব্য মহাবিশ্বে আমাদের অস্তিত্ব সম্ভব সেগুলোকে নির্দিষ্ট করে দেয়। যদিও মহাজাগতিক স্কেলে আমরা অতীব ক্ষুদ্র এবং গুরুত্বহীন, তদাপি আমরা যেনো সৃষ্টির রাজার আসনে চড়ে বসেছি।

মহাবিশ্বকে গভীরভাবে বুঝতে হলে আমাদেরকে শুধু মহাবিশ্বে কীভাবে সবকিছু ঘটে সেটি জানলেই হবে না, জানতে হবে ‘কেনো’ ঘটে সেটি-ও।

কেনো কোনো কিছু না থাকার বদলে কিছু বিদ্যমান?

কেনো আমাদের অস্তিত্ব আছে?

কেনো ঠিক এই ভৌত সূত্রসমূহ আছে, কেনো অন্য কোনো ভৌত সূত্র নেই?

এগুলোই জীবন, মহাবিশ্ব এবং সবকিছুর পরমতম প্রশ্ন। আমরা এই বইয়ে এগুলোর উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবো। ‘হিচহাইকারস গাইড টু গ্যালাক্সি’তে (The Hitchhiker’s Guide to the Galaxy) দেয়া উত্তরের মতো আমাদের উত্তর শুধুমাত্র “৪২” হবে না।

[বইটির সূচিপত্র তখা সব পর্বের লিংক দেখুন এখানে]

মূল: স্টিফেন হকিং ও লিওনার্দো ম্লোডিনো

অনুবাদ: -আশরাফ মাহমুদ
গবেষক, কবি ও লেখক
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

Share.

মন্তব্য করুন