বিশেষজ্ঞ মত: বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রলয়ঙ্কারী ভুমিকম্পের ঝুঁকি

0

নতুন গবেষনা অনুযায়ী একটি প্রকান্ড ফল্ট বা স্তরচ্যুতি বাংলাদেশ, ভারতের পূর্বাঞ্চল এবং মায়ানমারের একাংশে প্রলয়ঙ্কারী ভুমিকম্পের সৃষ্টি করতে পারে।

গবেষনায় পাওয়া যায়, এই গুপ্ত ফল্টটি নদীর চরের কয়েক কিলোমিটার নিচে অবস্থিত এবং পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবহুল অঞ্চলটিতে ৮.২ থেকে ৯.০ মাত্রার ভুমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে। এবং যেহেতু গবেষকগণ এই ব্যবস্থাটি সাম্প্রতিক সময়ে আবিষ্কার করেছেন তাই তাঁরা এখনো অনুমান করতে পারছেন না কবে নাগাদ এধরনের একটি ভুমিকম্প আঘাত হানবে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট-ডোহার্টি ধরিত্রি পর্যবেক্ষনাগারের ভু-পদার্থবিদ এবং এই গবেষণার একজন সহ-গবেষক মাইকেল স্টেকলার এ প্রসঙ্গে বলেন “আমরা এখনো জানিনা দিনটি কি আগামীকাল নাকি ৫০০ বছর পরের কোনো এক সময়।”

বাংলাদেশ, ভারত ও মায়ানমারের ভুগর্ভস্থ একটি অবনমন অঞ্চল যা থেকে ৮.২ থেকে ৯.০ মাত্রার একটি ভুমিকম্প হতে পারে। লাল রেখা দিয়ে সম্ভাব্য বিচ্যুতির এলাকাটি নির্দেশ করা হচ্ছে। নিরেট রেখা দিয়ে অপেক্ষাকৃত অধিক সম্ভাব্য অঞ্চল বোঝানো হচ্ছে। উজ্জ্বল শহুরে আলোকময় অঞ্চলগুলো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ইঙ্গিত বহন করছে।

বাংলাদেশ, ভারত ও মায়ানমারের ভুগর্ভস্থ একটি অবনমন অঞ্চল যা থেকে ৮.২ থেকে ৯.০ মাত্রার একটি ভুমিকম্প হতে পারে। লাল রেখা দিয়ে সম্ভাব্য বিচ্যুতির এলাকাটি নির্দেশ করা হচ্ছে। নিরেট রেখা দিয়ে অপেক্ষাকৃত অধিক সম্ভাব্য অঞ্চল বোঝানো হচ্ছে। উজ্জ্বল শহুরে আলোকময় অঞ্চলগুলো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ইঙ্গিত বহন করছে।

লুকিয়ে থাকা বিচ্যুতি রেখা: নিচু ও জলাবদ্ধ ভুমির বাংলাদেশে প্রমত্ত গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মিলনে তৈরি হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপটি এবং শেষমেশ পতিত হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। প্রতিবছর এদুটি প্রকান্ড নদীর প্রবাহ এই অঞ্চলে বিপুল পরিমান পলি সঞ্চয় করে। এই পলিমাটির স্তর এই অঞ্চলের ভু-প্রকৃতিকে ঝাপসা করে দেয় এবং তাই এর ভুপ্রকৃতি বোঝা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গবেষকগণ জানতে পেরেছেন এই পলির স্তরের নিচে টেকটোনিক প্লেটগুলো সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে।

ভুপৃষ্ঠের গভীরে প্লেটগুলোর মধ্যে কি ঘটছে তা জানার জন্য স্টেকলার ও তাঁর সহকর্মীবৃন্দ বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাথে নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ২০০৩ থেকে ২০১৪ সাল নাগাদ অত্যন্ত সংবেদনশীল জিপিএস সরঞ্জাম স্থাপন করেছেন। এগুলো হতে প্রাপ্ত তথ্যের সাথে ভারত এবং মিয়ানমার হতে প্রাপ্ত প্লেটের তথ্য একীভুত করে গবেষকগণ এই অঞ্চলের বিচ্যুতি রেখার সম্পূর্ন মানচিত্র তৈরি করেছেন।

স্টেকলারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জিপিএসএর এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে উদ্ঘটিত হয়েছে, বাংলাদেশ, ভারত এবং মায়ানমারের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত অংশে মাটির অনেক গভীরে একটি প্লেট আরেকটি প্লেটের নীচে ঢুকে যাচ্ছে । (এই প্লেটদুটি যথাসম্ভব ভারতীয় প্লেট এবং ইউরেশীয় কিংবা মতান্তরে বার্মা অণুপ্লেট।)

এই চ্যুতির উপরের স্তুরগুলোতে প্লেটগুলো একে অপরের সাথে আটকে গিয়ে প্রবল টান-টান অবস্থা তৈরি করছে যা চাপ সইতে না পেরে বিদীর্ণ হয়ে গেলে ভয়াবহ ভুমিকম্প তৈরি করবে। এই টানের তথ্য থেকে গবেষকদল অনুমান করেন এই চ্যুতিতে ৮.২ থেকে ৯.০ মাত্রার অতিপ্রলয়ঙ্কারী ভুমিকম্প ঘটে যেতে পারে।

অতিবিপদসংকুল এলাকা: যদিও ৮ বা তার চেয়ে বেশী মাত্রার ভুমিকম্প সমগ্র পৃথিবীতে প্রভুত ক্ষয়-ক্ষতি সাধন করতে পারে তথাপি বিশেষ করে এই অঞ্চলটি অতিমাত্রায় বিপদসংকুল। গবেষকগণ হিসেব করে দেখেছেন এই বিচ্যুতির ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ১৪ কোটি মানুষের বাস যার মধ্যে ১ কোটি ৭০ লাখ জনসংখ্যার মেগাসিটি ঢাকাও অন্তর্ভুক্ত। দেশটি ইতিমধ্যেই দুর্বল অবকাঠামো নিয়ে দুর্দশাগ্রস্থ।

স্টেকলার বলেন, “আমি দেখতে পেয়েছি ঢাকায় বিশতলা ভবন নির্মানের জন্য বালু সরানো হচ্ছে। যদি একটা ভুমিকম্প হয়ে যায় তাহলে এই ভবনগুলো তৎক্ষণাৎ পড়ে যাবে। ভবন ধ্বসই শুধু এই অঞ্চলের বড় সমস্যা নয়। এই অঞ্চলটি অতিঘনবসতিপূর্ণ তাই ভুমিকম্প হলে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোকে উদ্ধার করাও কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে।”

তিনি বলেন, “এইমূহুর্তেও ঢাকার রাস্তাগুলো যানবাহনে গাদাগাদি হয়ে আছে। সাধারণ একটি দিনে ঢাকায় মুক্তভাবে ঘোরাঘুরি করা অসম্ভব কাজ। যদি রাস্তাগুলো নুড়ি-পাথরে স্তুপীকৃত হয়ে যায় তাহলে ত্রাণ এবং উদ্ধার সরঞ্জাম বিভিন্ন দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর কোনো সুযোগই থাকবে না।“

তবে ভুমিকম্পটি সহসাই আঘাত হানবে কিনা সেই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ দলটি এখনই কিছু বলতে পারছে না। তবে বিশেষজ্ঞদের কাছে সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে যে এই এলাকায় ১৭৬২ সালে একটি তীব্র আলোড়ন হয়েছিলো যার ফলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের একটি বড় নদীর গতিপথ আমূল বদলে গিয়েছিলো। এর বাইরে অন্যসব আলামত বিপুল পলিস্তরের নিচে চাপা পড়ে গেছে এবং ঐতিহাসিক তথ্যও সহজপ্রাপ্য নয় যা থেকে বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পারবেন কত ঘন ঘন এখানে ভুমিকম্প আঘাত হানে।

স্টেকলার বলেন, এই অঞ্চলের দেশগুলো সমসাময়িক সমস্যা যেমন: জঙ্গী হামলা, জলবায়ুর পরিবর্তন, দারিদ্র সমস্যা, দুর্নীতি এসব সামাল দিতেই ব্যস্ত তাই ভুমিকম্পের মতো ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত সমস্যায় মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নীতি-নির্ধারকদের জন্য দুঃষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। এই অঞ্চলের ঝুঁকিটি আরো ভালোভাবে অনুধাবন করার জন্য গবেষকগণ এই বিচ্যুতিরেখার আরো অনুপুঙ্খ মানচিত্র তৈরির চেষ্টা করছেন এবং এই অঞ্চলের সুনামির তথ্য আরো বিস্তারিতভাবে পাওয়ার চেষ্টা করছেন যেন ভুমিকম্পের ঝুঁকি আরো বিস্তরিতভাবে বোধগম্য হয় এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। [Live Science অবলম্বনে]

Share.

মন্তব্য করুন