বানর কেন আমাদের মতো কথা বলতে পারে না?

0

মানুষ ব্যাতীত (নন হিউম্যান) অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীবর্গের মাঝে গরিলারা খুব বুদ্ধিমান হয় এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এরা মানুষের সাথে সাংকেতিক ভাষায় যোগাযোগ করতে পারলেও একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারেনা।

সম্প্রতি সায়েন্স এডভান্স জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায় মানুষ ব্যাতীত অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীবর্গ এমনকি খাদ্য শৃংখলের নিচে থাকা বানরগুলোরও মানুষের মতো কথা বলা কন্ঠনালীর শারীরিক গঠন রয়েছে। আর এই আবিষ্কারের মাধ্যমেই বহুপুরনো একটি তত্বকে অকার্যকর  হলো যাতে বলা হতো বানর, গরিলা, শিম্পাঞ্জি এবং এদের মতো আরও অনেকে মানুষের মতো কথা বলতে পারেনা কারণ এসব শব্দ উৎপন্ন করার মতো যথেষ্ট দক্ষতা এদের নেই।

ভিয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানসম্পর্কীয় (কগনেটিভ) জীববিজ্ঞান বিভাগের প্রধান টেকামস ফিচ বলেন, “আমি মনে করি এই নতুন তথ্যগুলো বানর এবং বনমানুষের কথা বলতে না পারার জন্য এদের কন্ঠনালীর গঠন প্রক্রিয়াকে দায়ী করে যে জনশ্রুতি বিস্তৃত রয়েছে তা দূরীভূত করতে সাহায্য করবে।”

বানরের কন্ঠনালীর এক্স-রে।

ফিচ, জ্যেষ্ঠ লেখক আসিফ ঘজানফার, বার্ট দে বোয়ের এবং নেইল ম্যাথিউর এসব স্তন্যপায়ী প্রানীর (প্রাইমেট) কন্ঠে উৎপাদিত নড়াচড়ার পরিসীমা তদন্ত করে দেখেছেন। এক্স-রে ভিডিও ব্যবহার করে বানরের ঠোঁট, জিহ্বা, স্বরযন্ত্র এবং আরও কিছু যা বানর কন্ঠস্ত করতে পারে ধারণ করেন ও পরে এদের নড়াচড়া সনাক্ত করেন। এরপর গবেষকগণ এক্স-রে গুলো ব্যবহার করে বানরের কন্ঠের একটি কম্পিউটার মডেল তৈরী করেন।

এই মডেল বাগযন্ত্রের ফলাফল হিসেবে আপনি শুনতে  পাবেন বানরের ভাষায় ‘Will you marry me?’ নিচে এর অডিও ট্র্যাক দেয়া হলো।

https://soundcloud.com/new-scientist/computer-recreation-of-monkey-asking-will-you-marry-me

পরীক্ষাটিতে খুবই ভালো ফলাফল পাওয়া  গেছে যদিও এখন পর্যন্তও আমরা জানতে পারিনি কেন বানর এবং বনমানুষ আমাদের মতো কথা বলতে পারছে না।

ফিচ এবং তাঁর সহযোগীরা বিশ্বাস করেন যে, অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রানী নমনীয় এবং কথা বলার উপযোগী নমনীয় কন্ঠানালীর অধিকারী। ফিচ সন্দেহ করছেন, মানুষ তার মস্তিষ্কে কমপক্ষে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে বিবর্তিত হয় যা আমাদেরকে যোগাযোগের সীমা তৈরী করে দেয়। তিনি বলেন, “মোটর করোটিকাল স্নায়ুকোষ এবং কন্ঠনালী পেশিতন্তুকে নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুকোষের মধ্যে আমাদের সরাসরি সংযোগ রয়েছে যা বিশেষভাবে স্বরযন্ত্রের দায়িত্বে থাকে।”

ফিচ আরও বলেন, মানুষের মস্তিষ্ক এবং কথা বলার জন্য কন্ঠনালীর বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে বিভিন্ন তত্ত্ব দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সেগুলোর মাঝে অন্যতম একটি হচ্ছে বৃটিশ প্রকৃতিবিদ চার্লস ডারউইনের তত্ত্ব। যিনি অনুমান করেন আমাদের পূর্বপুরুষেরা ‘গান গাওয়া বানর’ থেকে বিবর্তিত হয়েছে। ডারউইন সন্দেহ করেন এই গান গাওয়ার দক্ষতার মাধ্যমে বাগযন্ত্রের সূচনা হয় পরে তা কথা বলায় ব্যবহৃত হয়।

ফিচ মনে করেন মানুষ ব্যাতীত অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের কথা বলা শেখানো সম্ভব না হলেও ভবিষ্যতে জেনেটিক সম্পাদনার মাধ্যমে হয়তো সম্ভব হতে পারে।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক লরি সান্তোস বলেন, “এই আবিষ্কারটি মানুষের কথা বলার অনন্য ভাষা ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি সম্পর্কে জানার জন্য এক সম্পূর্ণ নতুন দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে।”

অন্যদিকে ফ্রি ইউনিভার্সিটি অফ বার্লিনের প্রাণী আচরণ বিভাগের অধ্যাপক কন্সটেন্ট কার্ফ বলেন, সম্ভবত আমরা প্রাণীদের যোগাযোগের দক্ষতাকে খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখিনা। এমন অনেক প্রাণী রয়েছে যাদের পরিষ্কার কন্ঠ রয়েছে যেমন, তোতা পাখি।

সম্প্রতি বিভিন্ন পরিক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা  গেছে, প্রাণীরা প্রাকৃতিক পরিবেশের অধীনে কিছু করতে পারেনা, কিন্তু যখন তাদের প্রশিক্ষিত এবং উৎসাহিত করা হয় তখন সেটা করতে পারে যেমন, সি  লায়ন এবং তোতা পাখি অনেকটাই  অর্থপূর্ণ শব্দ করতে সক্ষম হয়। [লাইভ সাইন্স অবলম্বনে]

শফিকুল ইসলাম

 

Share.

মন্তব্য করুন