সাইবেরিয়ায় ক্রমাগত বরফ গলতে থাকায় ৮০,০০০ বল্গা হরিণের মৃত্যু

0

জলবায়ু পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে গলে যাওয়া একখন্ড বরফের চাইয়ে বিমর্ষ মুখে বসে থাকা পানিবন্দি একটি মেরু ভাল্লুকের ছবির চেয়ে ভালো কিছু আর হতে পারেনা।

কিন্তু ক্রমাগত তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব পৃথিবীতে বসবাসকারী অন্যান্য প্রজাতির প্রানীরাও অনুভর করছে। যার প্রতীকস্বরূপ আলাস্কার উপকূলে ভেসে আসা কিছু মৃত পাফিনের (বড় চক্ষু বিশেষ সামুদ্রিক পাখি) ছবি উঠে আসছে আমাদের সামনে। এছাড়াও আমেরিকার পিকাসগুলো ঠান্ডা পরিবেশের খোঁজে বড় বড় পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যাচ্ছে, তুষার প্রিয়  উলভারিনগুলো সবুজ গাছপালার ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে এবং সেই সাথে মৃত বল্গাহরিণ, যারা অনাহারে থাকতে থকতে সাইবেরিয়ার গভীর বরফের নিচে সমাধিস্থ হচ্ছে।

নতুন এক গবেষণা অনুযায়ী গত এক দশকে ইয়ামাল উপদ্বীপে অন্তত ৮০,০০০ বল্গা হরিণ মারা গিয়েছে, যার প্রধান কারণ ছিলো জলবায়ুর পরিবর্তন।

নতুন এক গবেষণা অনুযায়ী গত এক দশকে ইয়ামাল উপদ্বীপে অন্তত ৮০,০০০ বল্গা হরিণ মারা গিয়েছে, যার প্রধান কারণ ছিলো জলবায়ুর পরিবর্তন।

সাইবেরিয়ার উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত রাশিয়ার ইয়ামাল উপদ্বীপ অতি অল্প পরিমানের তাপমাত্রা এবং পুরু বরফ সহ্য করা পশুদের জন্য উত্তম আবাসস্থল। বল্গা হরিণের অভয়ারণ্য হিসেবেও এ অঞ্চলটি বিশেষভাবে পরিচিত।  হাজার হাজার বল্গা হরিণ এই অঞ্চলে ঘুরাঘুরি করে থাকে এবং নেনেটস উপজাতির মানুষ এদের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে, যারা আফ্রিকার যাযাবরদের মধ্যে সর্বশেষ বল্গা হরিণ শিকারি জাতি।

গত সপ্তাহে বায়োলজি লেটার্স জার্নালে প্রকাশিত এক সমীক্ষা অনুসারে, জলবায়ুর পরিবর্তন এসব প্রাণীর এবং যেসব সম্প্রদায় এদের উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে তাদের গুরুতর হুমকির সম্মুখীন করছে। বিজ্ঞানীদের দাবি পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারনে গত দশ বছরে ইয়ামাল উপদ্বীপে অন্তত ৮০ হাজার বল্গা হরিণের মৃত্যু হয়েছে এবং আগামী বছরগুলোতে এর ঝুঁকি আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে এই উপদ্বীপটিতে প্রায় ৬১,০০০ বল্গা হরিণের মৃত্যু হয়েছে যা স্থানীয় সংখ্যার অনুপাতে প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান। গবেষকরা বলেন, অঞ্চলভেদে এটাই সর্ববৃহৎ বল্গা হরিণের মৃত্যুহারের ঘটনা। বিজ্ঞানীরা আরও বলেন, ২০০৬ সালেও খাদ্যাভাবে প্রায় ২০,০০০ বল্গা হরিণের মৃত্যু হয়েছিলো।

উভয় ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, অস্বাভাবিক পুরু বরফের স্তর এবং আবাসস্থলে বরফের আধিক্যতা এদের বেঁচে থাকার জন্য শৈবাল ও অন্যান্য গাছপালার সহজলভ্যতা কমিয়ে এনেছে। যার ফলে জীবনধারন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিলো।  খেতে না পেয়ে ব্যাপক হারে হরিণ মারা যেতে থাকে।

নেনেটসদের জীবনধারণের মাধ্যম হচ্ছে বল্গাহরিণ পালন করা। শতাধিক সংখ্যার বল্গা হরিণের দল একেকটি পরিবারের মালিকানায় পালিত হয়ে থাকে।

নেনেটসদের জীবনধারণের মাধ্যম হচ্ছে বল্গাহরিণ পালন করা। শতাধিক সংখ্যার বল্গা হরিণের দল একেকটি পরিবারের মালিকানায় পালিত হয়ে থাকে।

বল্গা হরিণ তাদের পা ব্যবহার করে বরফের পাতলা আস্তরন খুব সহজেই ভেদ করতে পারে কিন্তু গবেষকগণ বলেন, ২০০৬ ও ২০১৩ সালে বরফ আগের তুলনায় বেশী পরিমাণে পুরু ও শক্ত ছিলো যা এদের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু এসব ঘটছে কেন?

গবেষকদের মতে, কারা এবং বারেন্টস সমুদ্র সংলগ্ন বরফ অপসারিত হওয়ার ফলাফলই এই দুর্ভেদ্য তুষার। অস্বাভাবিক হারে উষ্ণ তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে গলতে থাকা বরফ উচ্চ মাত্রার বাষ্পীভবন এবং আর্দ্রতা উৎপন্ন করছে। এর ফলে কয়েক দফায় ভারী বর্ষণের সৃষ্টি করে যা তুষারময় মাটিকে জলসিক্ত করে তুলে (এক বিস্ময়কর ঘটনা যাকে বিজ্ঞানীরা “তুষারের উপর বৃষ্টি” বা ROS হিসেবে উল্লেখ করেছেন)। ROS ঘটনা ঘটে তাপমাত্রার আচমকা নিম্নমুখী হওয়ার মাধ্যমে যা তুষারকে বরফে পরিণত করে।

উদাহরণস্বরূপ, ২০১৩ সালের নভেম্বরে ২৪ ঘন্টার ঝড়বৃষ্টির পর তাপোমাত্রা -৪০ ডিগ্রী ফারেনহাইট কমে যায়। যার ফলে মাটিতে বরফের কঠিন ব্লক তৈরি হয়ে যায়। সময়ের সাথে সাথে সেই বরফ বসন্ত কালে গলতে শুরু করে। ফলে নৃগোষ্ঠীগুলো তাদের বেশিরভাগ পশুদের হারিয়ে তুন্দ্রা অঞ্চলে আটকা পড়ে যায় এবং মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকে।

সাইবেরিয়া ক্রমাগত উষ্ণ হয়ে যাওয়াতে ইয়ামাল উপদ্বীপে নিয়মিত বৃষ্টিপাত হচ্ছে এবং এর তীব্রতা ক্রমশ বেড়েই চলছে। ফোর্বস এর মতে আবহাওয়ার এই পরিবর্তন তুষার বৃষ্টির সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে যা শুধু স্থানীয় বল্গা হরিণের জন্যই হুমকি নয় সাথে নেনেটস সম্প্রদায়ের জন্যও যারা এসব পশুদের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে অতি শীঘ্রই আরেকটা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এগিয়ে আসছে। কারণ আর্কটিক সাগরে বরফের পরিমাণ রেকর্ড মাত্রায় কমে গেছে। ইন্টারন্যশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ ন্যাচারের মতে, বল্গাহরিণগুলো এখন পুরো মাত্রায় অরক্ষিত। শুধু রাশিয়াতেই ১৯৯০ সালের তুলনায় বল্গা হরিণের পরিমাণ ২০ ভাগ কমে গেছে। [The World Post– অবলম্বনে]

শফিকুল ইসলাম

Share.

মন্তব্য করুন