জলা মাঠ ছেড়ে নক্ষত্রের পানে

0

বাংলায় তারা নক্ষত্র গ্রহ এসব নিয়ে কিছু লিখতে হলে যদি কোন কবির উদ্ধৃতি দিতে হয় তো আমরা অনেকেই জীবনানন্দকে (১৮৯৯-১৯৫৪) টেনে আনি। জীবনানন্দকে মহাবিশ্বের এক ধরণের অর্থহীনতা নাড়া দিয়েছিল। প্রকৃতির সৌন্দর্য তাঁর কাছে ছিল রহস্যময়, মানুষের ক্রিয়া আরো অবোধ্য। আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে দূর আকাশের নক্ষত্র, শুধুমাত্র তার ইশারা নিয়ে আমাদের বিজ্ঞান গড়তে হয়, আমাদের কবিতা লিখতে হয়। তাই তিনি লিখলেন

চলে যায় আকাশের সেই দূর নক্ষত্রের লাল নীল শিখার সন্ধানে,
প্রাণ যে আঁধার রাত্রি আমার , আর তুমি স্বাতীর মতন
রূপের বিচিত্র বাতি নিয়ে এলে, তাই প্রেম ধুলায় কাঁটায় যেইখানে
মৃত হয়ে পড়ে ছিল পৃথিবীর শূণ্য পথে সে গভীর শিহরণ,
তুমি সখী, ডুবে যাবে মুহূর্তেই রোমহর্ষে অনিবার অরুণের ম্লানে
জানি আমি; প্রেম যে তবুও প্রেম; স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে রবে, বাঁচিতে সেজানে।

স্বাতী নক্ষত্রের মত প্রেমিক বা প্রেমিকা ভোরের আলোয় ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু কবি ভাবছেন প্রেম তবু স্বপ্নের মাঝে বেঁচে রবে। জীবনানন্দ সব সময় তা ভাবেন নি, জীবনের আপাতঃ অর্থহীনতা তাকে তাড়া করে বেরিয়েছে।

আপনি শিল্পী হোন, কারিগর হোন, কলম-পেশা কেরানী হোন, এমন কি বিজ্ঞানী হোন, কেউ যদি বলে মহাবিশ্বের মাঝে প্রেম বা স্বপ্নের কোন মূল্য নেই আপনার সমস্ত জৈবিক সত্তা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। কোয়ান্টাম বিজ্ঞানীরা বলছেন আমরা যা পর্যবেক্ষণ করি তার মাঝে আমাদের অংশগ্রহণ আছে, অর্থাৎ আমাদের সত্ত্বা অনেকাংশে আমাদের বাস্তবকে নির্ধারণ করে দিচ্ছে। কিন্তু এই আলোচনা বাস্তবতার কাঠামোর ওপর নয় – সেই আলোচনা করার মত প্রশিক্ষণ আমার নেই।

“দূর নক্ষত্রের লাল নীল শিখার সন্ধানে” যেতে হলে আমাদের পৃথিবী-পৃষ্ঠ ছেড়ে যেতে হবে। কিন্তু পৃথিবী আমাদের তার মাধ্যাকর্ষণ শক্তির নাগপাশে জড়িয়ে রেখেছে, তার থেকে মুক্তি পেতে হলে তৈরি করতে হবে শক্তিশালী যন্ত্র যে যন্ত্র কিনা আমাদের মহাকাশযানকে অভ্রভেদী করবে। এই যন্ত্র হল একটা ইঞ্জিন যাকে আমরা বলি রকেট ইঞ্জিন। মানুষ তার মস্তিষ্কের গুণে যা কিছু সৃষ্টি করেছে রকেট ইঞ্জিন তার মধ্যে একটি; বর্তমানের সভ্যতায় এটি আমাদের প্রয়োজনীয়তার মাপকাঠিতে খুব একটা উঁচু অবস্থানে নেই, কিন্তু ক্রমশঃ মানব সভ্যতার উদ্ভাবনের তালিকায় এক নম্বর স্থানটি দখল করে নেবে এই রকেট ইঞ্জিন।

জীবনানন্দ মারা গিয়েছিলেন ১৯৫৪ সনে, তিনি “জলা মাঠ ছেড়ে দিয়ে চাঁদের আহ্বানে” রকেট উৎক্ষেপন দেখে যেতে পারেন নি। মানুষকে চাঁদে নিয়ে গিয়েছিল Saturn V নামে এক বিশাল রকেট। স্যাটার্ন ৫ আজ পর্যন্ত যত রকেট বানানো হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে ভারি, সবচেয়ে উঁচু। এর উচ্চতা ছিল ১১১ মিটার বা ৩৩৬ ফুট। চিন্তা করুন একটি ৩৩ তলা বাড়ি, তার থেকে উঁচু ছিল সেই রকেট। এবার চিন্তা করুন সেরকম একটি রকেটের প্রতিটি অংশকে জোড়া লাগানো হচ্ছে, প্রথম স্টেজটি ১৩ তলা, দ্বিতীয় স্টেজটি ৮ তলা ও তৃতীয় স্টেজটি ৬ তলার সমান। বাকি ৬ তলায় কমান্ড মডিউল, চাঁদের ল্যান্ডার ইত্যাদি। প্রথম বা নিচের তিনটি স্টেজে জ্বালানী ছাড়া আর কিছু নেই। মানুষ যে এরকম একটি বিশালাকায় সামঞ্জস্যপূর্ণ যন্ত্র সৃষ্টি করে মহাশূন্যে পাঠাতে পারে সেটা আমার জন্য এখনো বিস্ময়কর।

প্রথমে জার্মানীর ও পরে যুক্তরাষ্ট্রের রকেট যুগের স্রষ্টা ভেরনার ভন ব্রাউন (১৯১২-১৯৭৭) স্যাটার্ন ৫য়ের প্রথম স্টেজের ৫টি ইঞ্জিনের সাথে।

প্রথমে জার্মানীর ও পরে যুক্তরাষ্ট্রের রকেট যুগের স্রষ্টা ভেরনার ভন ব্রাউন (১৯১২-১৯৭৭) স্যাটার্ন ৫য়ের প্রথম স্টেজের ৫টি ইঞ্জিনের সাথে।

কি পরিমাণ জ্বালানী লাগবে? সেও এক বিশাল ব্যাপার। প্রথম স্টেজটিতে ৮১৭,০০০ লিটার (বা প্রায় আট লক্ষ লিটার) কেরোসিন ও ১,৩১১,১০০ লিটার (বা প্রায় ১৩ লক্ষ লিটার) তরল অক্সিজেন থাকত। মঞ্চ থেকে রকেট উৎক্ষেপনের মাত্র ১৬৮ সেকেন্ড বা তিন মিনিট শেষ হবার আগেই এই সব জ্বালানী শেষ। এই দু-তিন মিনিটে প্রথম স্টেজটির কাজই ছিল পুরো রকেটটিকে প্রায় ৬৭ কিলোমিটার ওপরে উঠিয়ে দেয়া আর তার গতিবেগকে সেকেন্ডে ২.৩ কিলোমিটার করা। প্রথম স্টেজটির জ্বালানী ফুরিয়ে গেলে তাকে মূল রকেট দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা দেয়া হত।

প্রথম স্টেজটিতে পাঁচটি ইঞ্জিন থাকত, একইরকম পাঁচটি। ইঞ্জিনের নাম Rocketdyne F1। প্রতিটি ইঞ্জিন প্রতি সেকেন্ডে ২,৫৭৮ কিলোগ্রাম জ্বালানী (কেরোসিন আর তরল অক্সিজেন) পোড়াত। পাঁচটি ইঞ্জিন মিলে পোড়াত প্রায় ১৩,০০০ কেজি বা ১৩ টন জ্বালানী প্রতি সেকেন্ডে, একটি দোতলা বাসের ভরের সমান জ্বালানী! কি পরিমাণ বল বা থ্রাস্ট প্রতিটি ইঞ্জিন থেকে পাওয়া যেত? ৬,৭০০,০০০ নিউটন বা সাতষট্টি লক্ষ নিউটন। এই সংখ্যাটার কোন মানেই নেই যদি না আমরা এর সাথে অন্য কোন যন্ত্রের তুলনা না করি। GE কোম্পানী একটি আধুনিক বোয়িং বিমানের যে জেট ইঞ্জিন তৈরি করছে তার থ্রাস্ট ২৫০,০০০ নিউটন থেকে ৩৫০,০০০ (আড়াই থেকে সাড়ে তিনলক্ষ) নিউটন হতে পারে। এই তুলনা থেকে বোঝা যাচ্ছে এই রকেট ইঞ্জিনগুলো কি পরিমাণ শক্তিশালী।

জীবনানন্দ থেকে রকেট ইঞ্জিনে কেমন করে এলাম। তার কারণ নক্ষত্রের স্বপ্নকে সত্যি করতে হলে পৃথিবীর বুক থেকে ওপরে উঠতে হবে, কিন্তু সেই ওপরে ওঠা সহজ ব্যাপার নয়। পৃথিবী যেমন আমাদের বাসস্থান দিয়েছে, তেমন ভাবেই পৃথিবী আমাদের ধরে রেখেছে, মহাশূন্যে যাত্রা কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের খাতায় লেখা ছিল না। মানুষ বিবর্তনের বাইরে এসে মহাবিশ্বকে বুঝতে চাইছে, তার রকেট ইঞ্জিন বানানোর প্রচেষ্টা সেই বুঝতে চাইবার অ্যাডভেঞ্চার। (এটা যেসব সময় সত্যি তা নয়, রকেট ইঞ্জিনের ইতিহাস কালিমা লিপ্ত, আধুনিক ইঞ্জিনের উৎস খুঁজতে হলে আমাদের যেতে হবে মানুষে মানুষে সংঘর্ষের মাঝে, অন্যদিনের জন্য সেটা তোলা থাকুক।)

সোভিয়েত ডাকটিকিটে ৎসিওলকভস্কি

সোভিয়েত ডাকটিকিটে ৎসিওলকভস্কি

পৃথিবীর কক্ষপথের রকেট মারফৎ কোনো যান স্থাপনা করা একটা দুরুহ ব্যাপার। এতখানই দুরুহ যে পৃথিবীর নিকট কক্ষপথে যেতে যে পরিমাণ শক্তি খরচ হবে সেটা মঙ্গলে যেতে যা হবে তার অর্ধেক। আর এই শক্তি জোগাড় করতে হচ্ছে রাসায়নিক জ্বালানী থেকে, কেরোসিন-অক্সিজেন বা অক্সিজেন-হাইড্রোজেনের মিশ্রণ থেকে। আমাদের গ্রহ যদি তার ঘনত্ব ঠিক রেখে একটু বড় হত, তাহলে আমরা রাসায়নিক জ্বালানী ব্যবহার করে পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে কখনই কক্ষপথে উঠতে পারতাম না। তাই মহাকাশে যাবার সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ চাঁদে যাওয়া নয়, বরং পৃথিবীর কক্ষপথে যান স্থাপনা করা। আর কত পরিমাণ জ্বালানী ব্যবহার করলে কত পরিমাণ গতি পাওয়া যাবে সেটা ঠিক করে দেয় পোলিশ-রুশ বিজ্ঞানী ৎসিওলকভস্কির (১৮৫৭-১৯৩৫) রকেট সমীকরণ:

10406396_1045321638830403_1000318705989400434_n
এখানে mi হল রকেটের জ্বালানীসহ আদি ভর, mf হল জ্বালানী খরচ করার পর চূড়ান্ত ভর। ve রকেটের পেছন দিকে গ্যাসের বিনির্গমন গতিবেগ ও Δv হল সম্মুখে গতিবেগ পরিবর্তনের মান। আর ln হল ন্যাচারাল বা প্রাকৃতিক লগারিথম। ওপরের সমীকরণ থেকে নিচের সমীকরণটি পাওয়া সম্ভব।

11390229_1045320588830508_7686740868583505189_n

এখানে বাঁ দিকের রাশিটি রকেটের কত ভগ্নাংশ জ্বালানী সেটা নির্ধারণ করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যদি গ্যাসের নির্গমন গতিবেগ সেকেন্ডে ৫ কিলোমিটার হয় ও গতিবেগ পরিবর্তন সেকেন্ডে ১০ কিলোমিটার করতে হয় তবে জ্বালানীর পরিমাণ রকেটের ৮৬%  হতে হবে। অর্থাৎ পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে কক্ষপথে পৌঁছাতে আমাদের যে যানটি তৈরি করতে হবে সেই যানটির সবটুকুই প্রায় জ্বালানী দিয়ে ভর্তি, কক্ষপথে প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে যাবার সুযোগ খুবই কম।

নভোচারী ডন পেটিট The Tyranny of Rocket Equation  নামে একটি চমকপ্রদ লেখায় বলেছেন রকেটে জ্বালানীর পরিমাণ যদি তার ভরের ৮৫ থেকে ৯০% হয়, সাধারণ একটি গাড়ির জ্বালানী গাড়িটির মোট ভরের মাত্র ৪%, একটি বড় জাহাজের ৩%[১]। কিন্তু বিমানের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা ৩০% থেকে ৪০%। তিনি বলছেন প্রকৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকে জ্বালানীই যখন একটি যানের মূল উপাদান সেখানে সামান্য একটা জিনিসের পরিবর্তন করতে হলে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। পেটিট বলছেন যতদিন আমরা রকেট সমীকরণের স্বেচ্ছাচারিতায় আবদ্ধ থাকব ততদিন সহজে মহাকাশে ভ্রমণ সহজ হবে না, হয়তো ভবিষ্যতে নতুন ধরণের জ্বালানী আমাদের রকেট সমীকরণ থেকে মুক্ত করবে।

পৃথিবীর বিশাল মাধ্যাকর্ষণের কুয়ো থেকে ওপরে ওঠা একটা কষ্টসাধ্য কাজ। এই কাজটা কঠিন। কিন্তু ভবিষ্যতের মানুষকে এই কাজে ব্রতী হতে হবে, কারণ আমাদের গ্রহের বাইরে পরিবেশ যতই প্রতিকূল হোক না, আমাদেরকে মহাবিশ্বকে জানার জন্য, খনিজ পদার্থের জন্য, শক্তি আহরণের জন্য সেই পরিবেশে ভ্রমণ করতে হবে। ১৯৬০য়ের দশক মানুষকে মহাকাশের ব্যপারে রোমান্টিক করেছিল। হয়তো আবার সময় এসেছে সেদিকে দৃষ্টি দেবার। আমাদের উদ্দেশ্য যত আকাশচুম্বী হবে তত দৈনন্দিন ঘাত-প্রতিঘাতের সমস্যাকে আমরা সহজেই সমাধান করতে পারব। আপাততঃ এই লেখাটা শেষ করছি এল্টন জনের রকেটম্যান গানের কয়েকটি লাইন দিয়ে (গানটির মধ্যে ডেভিড বো-ইর Major Tomয়ের অনুরণন পাওয়া যাবে)।

She packed my bags last night, preflight
Zero hour, nine a.m.
And I’m gonna be high
As a kite by then

I miss the earth so much
I miss my wife
It’s lonely out in space
On such a timeless flight

And I think it’s gonna be a long, long, time
‘Til touchdown brings me ’round again to find
I’m not the man they think I am at home
Ah, no no no
I’m a rocket man
Rocket man
Burnin’ out this fuse
Up here alone

-দীপেন ভট্টাচার্য
বিজ্ঞানী ও গল্পকার
Share.

মন্তব্য করুন