Top header

কালের সংক্ষিপ্ততর ইতিহাস (A Briefer History of Time): পর্ব-৮

0

[সব পর্বের তালিকা ও লিংক পাবেন এখানে]

অষ্টম অধায়ঃ বিগ ব্যাং, ব্ল্যাক হোল এবং মহাবিশ্বের বিবর্তন

ফ্রিডম্যানের প্রথম মডেলে (যেখানে বলা ছিল মহাবিশ্ব আবার গুটিয়ে যাবে) স্থানের মতোই চতুর্থ মাত্রা সময়ও সসীম। এটা এমন একটি রেখার মতো, যার দুদিকে দুটি প্রান্ত বা সীমানা আছে। অতএব, সময়ের একটি সমাপ্তি আছে, আবার শুরুও আছে। প্রকৃতপক্ষে আমরা মহাবিশ্বে যে পরিমাণ বস্তু দেখি তা সম্পর্কে আইনস্টাইনের সমীকরণের যে সমাধানগুলো আছে, তার সবকয়টির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আছে। তা হল, অতীতের কোনো এক সময়ে (১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে) পাশ্ববর্তী গ্যালাক্সিদের মাঝে কোনো দূরত্ব ছিল না। অন্য কথায়, শূন্য ব্যাসার্ধের একটি গোলকের মতো পুরো মহাবিশ্ব জিরো সাইজের একটিমাত্র বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত ছিল। সেই সময় মহাবিশ্বের ঘনত্ব এবং স্থান-কালের বক্রতা ছিল অসীম। এই সময়কেই আমরা বলি বিগ ব্যাং বা মহা বিস্ফোরণ।

কসমোলজি (মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও বিবর্তন বিষয়ক বিদ্যা) নিয়ে আমাদের যতগুলো তত্ত্ব আছে তাদের প্রত্যেকটিতেই স্থান-কালকে মসৃণ ও প্রায় সমতল ধরে নেওয়া হয়। এর ফলে আমাদের সবগুলো তত্ত্ব বিগ ব্যাং পর্যন্ত গিয়ে অকেজো হয়ে পড়ে। অসীম বক্রতার কোনো স্থান- কালকে কী করে ‘প্রায় সমতল’ বলা যেতে পারে! এর ফলে বিগ ব্যাং এর আগে যদি কোনো কিছু থেকেও থাকে, আমরা সেটা কাজে লাগিয়ে বলতে পারব না যে তারপর কী ঘটবে? কেননা অনুমান করার ক্ষমতা বিগ ব্যাং পর্যন্ত এসেই শেষ।

একইভাবে, যদি (এবং বাস্তবে তাই) আমরা যদি শুধু বিগ ব্যাং এর পরের ঘটনা জানি, তবে তা কাজে লাগিয়ে এর আগের কিছু আমরা জানত পারব না। বিগ ব্যাং এর আগের কোনো ঘটনা মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার মতো কোনো বৈজ্ঞানিক মডেলের অংশ হতে বা এরকম কোনো মডেলের উপর কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। তাই এই ধরনের তথ্যকে মডেল থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলতে হবে সময়ের শুরুই হয়েছে বিগ ব্যাং থেকে। তাই বিগ ব্যাং ঘটার জন্যে প্রয়োজনীয় পরিবেশ কে তৈরি করেছে তা বিজ্ঞানের দেখার বিষয় নয়।

মহাবিশ্বের আকার শূন্য হলে সেই সময় এর তাপমাত্রাও অসীম হবার কথা। তাই মনে করা হয় বিগ ব্যাং এর সময় মহাবিশ্ব ছিল অসীম পরিমাণ উত্তপ্ত। প্রসারণের সাথে সাথে বিকিরণের তাপমাত্রা কমে আসে। সহজ কথায় বললে, তাপমাত্রা হল কণার গড় শক্তি বা গতি। তাই তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় বস্তুর উপর তার শক্ত প্রভাব পড়ে। উচ্চ তাপমাত্রায় কণাগুলো এত জোরে ছোটাছুটি করতে থাকে যে এদের মধ্যে ক্রিয়াশীল নিউক্লিয়ার বা তড়িচ্চুম্বকীয় বলকেও এরা পাত্তা দেয় না। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস, তাপমাত্রা কমে গেলে এরা একে অপরের দিকে আকর্ষণ অনুভব করে জড় হতে শুরু করবে। মহাবিশ্বে কী কী ধরনের কণিকা থাকবে তাও নির্ভর করে তাপমাত্রা ওপর এবং একই কারণে মহাবিশ্বের বয়সেরও ওপর।

এরিস্টটল বিশ্বাস করতেন না যে, বস্তু বিভিন্ন কণিকা দিয়ে গঠিত। তিনি মনে করতেন, বস্তুকে যত ইচ্ছা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর অংশে ভাগ করা যায়। কখনও পদার্থের এমন কোনো কণা পাওয়া যাবে না যাকে আর কোনোভাবে ভাগ করা যাবে না। ডেমোক্রিটাসসহ কয়েকজন গ্রিকের বিশ্বাস ছিল উল্টো। তাঁদের মতে, এক একটি বস্তু অনেকগুলো বিভিন্ন প্রকারের পরমাণু (atom) দ্বারা গঠিত (গ্রিক ভাষায় atom শব্দের অর্থ indivisible বা অবিভাজ্য)। এখন আমরা জানি যে এটাই সঠিক, অন্তত আমাদের পরিবেশে এবং মহাবিশ্বের বর্তমানে পরিস্থিতিতে)। কিন্তু আমাদের মহাবিশ্বের পরমাণুরা সব সময় ছিল না। এরা অবিভাজ্য নয়। মহাবিশ্বের সব রকম কণিকার মধ্যে এদের পরিমাণ একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ।

পরমাণুরা আরও ছোট কণিকা দ্বারা গঠিত। এগুলো হল ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন। প্রোটন ও নিউট্রন নিজেরা আবার আরও ছোট কণিকা দ্বারা গঠিত। এদের নাম কোয়ার্ক। এদিকে আবার প্রতিটি কণিকার বিপরীতে আছে প্রতিকণিকা (antiparticle)। এই প্রতিকণিকাদের ভর এদের যমজ কণিকাদের সমান। কিন্তু এদের আধান (চার্জ) ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিপরীত। যেমন, ইলেকট্রনের প্রতিকণিকা হল পজিট্রন। এর চার্জ হল ইল্কেট্রনের বিপরীত, মানে পজিটিভ। প্রতিকণিকায় তৈরি একটি পুরো প্রতিজগৎ (antiworld) এবং প্রতিমানব (antipeople) উপস্থিত থাকতে পারে। তবে একটি কণিকা ও তার প্রতিকণিকার সাক্ষাৎ হলে এরা একে অপরকে ধ্বংস করে দেয়। অতএব, আপনার প্রতিমানবের সাথে দেখা হয়ে গেলে হাত মেলাতে যাবেন না যেন! এক ঝলক আলো উদ্গীরণ করে দুজনেই হাওয়া হয়ে যাবেন!

আলোক শক্তিও আসলে আরেকটি কণিকারই একটি রূপ। এটি হল ভরহীন কণিকা ফোটন। পৃথিবীতে প্রাপ্ত ফোটনের সবচেয়ে বড় উৎস হল আমাদের পাশে অবস্থিত সূর্য, যা একটি বিশাল নিউক্লিয়ার চুল্লি। সূর্য আরেক ধরনের কণিকারও একটি বড় উৎস। এটা হল আগে উল্লিখিত নিউট্রিনো (এবং অ্যান্টিনিউট্রিনো)। কিন্তু খুব হালকা এই কণিকারা বস্তুর সাথে ক্রিয়া করে না বললেই চলে। এর ফলে এরা নির্বিঘ্নে আমাদেরকে ভেদ করে চলে যায়, তাও প্রতি সেকেন্ডে বিলিয়ন বিলিয়ন হারে। পদার্থবিদরা এই ধরনের ডজন ডজন মৌলিক কণিকা আবিষ্কার করেছেন। সময়ের সাথে সাথে মহাবিশ্ব জটিল বিবর্তন প্রক্রিয়ায় অতিক্রম করার সময় এই কণিকার ভাণ্ডারও বিবর্তিত হয়েছে। কণিকাদের এই বিবর্তনের ফলেই পৃথিবীর মতো গ্রহ এবং আমাদের জীবদের অস্তিত্ত্ব তৈরি হতে পেরেছে।

বিগ ব্যাং এর এক সেকেন্ড পর মহাবিশ্বের প্রসারণ এতটা বেশি হয়েছিল যে এর তাপমাত্রা কমে প্রায় দশ বিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে। এই তাপমাত্রা সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রার দশ গুণ। কিন্তু হাইড্রোজেন বোমার বিস্ফোরণে এত বেশি পরিমাণ তাপমাত্রাও উৎপন্ন হওয়া সম্ভব। এই সময় মহাবিশ্বে প্রধানত ফোটন (প্রোটনের কথা বলছি না), ইলেকট্রন এবং নিউট্রিনো ও তাদের প্রতিকণিকারা ছিল। এর সাথে ছিল কিছু প্রোটন ও নিউট্রন। এ সময় এই কণিকাদের এত বেশি শক্তি ছিল যে এরা মিলিত হয়ে বিভিন্ন ধরনের বহু কণিকা ও প্রতিকণিকা তৈরি করে। যেমন, ফোটনদের সংঘর্ষে ইলেকট্রন ও এর প্রতিকণিকা পজিট্রন তৈরি হতে পারে। নতুন সৃষ্ট এই কণিকাদের কেউ কেউ এদের প্রতিকণিকার সাথে মিলিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। একটি ইলেকট্রনের সাথে পজিট্রনের দেখা হলে দুজনেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কিন্তু উল্টোটা ঘটা এত সহজ কথা নয়। ফোটনদের মতো দুটো ভরহীন কণিকা থেকে ইলেকট্রন ও পজিট্রনের মতো একটি কণিকা ও প্রতিকণিকার জোড় সৃষ্টি হতে হলে মিলিত হওয়া ভরহীন কণিকাদের একটি ন্যূনতম শক্তি থাকা প্রয়োজন। এর কারণ হচ্ছে ইলেকট্রন ও পজিট্রনের ভর আছে। আর এই নতুন ভর আসতে হবে সংঘর্ষে লিপ্ত কণিকাদের শক্তি থেকেই। মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হলে এবং এর তাপমাত্রা কমে গেলে উচ্চ শক্তিসম্পন্ন কণিকাদের সংঘর্ষে যে হারে ইলেকট্রন-পজিট্রন জোড়া তৈরি হচ্ছিল, তার চেয়ে বেশি হারে এরা ধ্বংস হচ্ছিল। ফলে শেষ পর্যন্ত বেশির ভাগ ইলেকট্রন ও পজিট্রনই একে অপরকে ধ্বংস করে আরও বেশি ফোটন তৈরি করে। এর ফলে সামান্য কিছু ইলেকট্রন বাকি থাকে। অন্য দিকে নিউট্রিনো এবং অ্যান্টিনিউট্রিনোরা নিজেদের সাথে এবং অন্য কণিকাদের সাথেও খুব দুর্বলভাবে ক্রিয়া করে। ফলে এরা এতটা দ্রুত একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করে না। আজও এদের উপস্থিতি থাকতে পারে। আমরা যদি এদের দেখতে পাই তবে  মহাবিশ্বের প্রাথমিক উত্তপ্ত অবস্থার ভালো একটি চিত্র পাওয়া যাবে। কিন্তু সমস্যা হল, বিলিয়ন বিলিয়ন বছর পর আজ তাদের শক্তি এত কমে গেছে যে আমরা তাদেরকে সরাসরি দেখতে পাব না (পরোক্ষভাবে খুঁজে পারার সম্ভাবনা আছে যদিও)।

চিত্রঃ ফোটন/ ইলেকট্রন/ পজিট্রন সাম্য। [আদি মহাবিশ্বে ইলেকট্রন ও পজিট্রনের মিলনে ফোটন তৈরি ও উল্টো প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি ভারসাম্য ছিল। তাপমাত্র কমে গেলে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে বেশি বেশি ফোটন তৈরি হওয়া শুরু হয়। শেষে মহাবিশ্বের বেশির ভাগ ইলেকট্রন ও পজিট্রন একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে আজকে উপস্থিত সামান্য কিছু ইলেকট্রনই বাকি থাকে।]

চিত্রঃ ফোটন/ ইলেকট্রন/ পজিট্রন সাম্য। [আদি মহাবিশ্বে ইলেকট্রন ও পজিট্রনের মিলনে ফোটন তৈরি ও উল্টো প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি ভারসাম্য ছিল। তাপমাত্র কমে গেলে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে বেশি বেশি ফোটন তৈরি হওয়া শুরু হয়। শেষে মহাবিশ্বের বেশির ভাগ ইলেকট্রন ও পজিট্রন একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে আজকে উপস্থিত সামান্য কিছু ইলেকট্রনই বাকি থাকে।]

 বিগ ব্যাং এর প্রায় একশ সেকেন্ড পরে মহাবিশ্বের তাপমাত্রা কমে এক বিলিয়ন ডিগ্রিতে নেমে আসে। সবচেয়ে উত্তপ্ত নক্ষত্রদের অভ্যন্তরেও এই তাপমাত্রা থাকে। এ তাপমাত্রায় সবল বল (strong force) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সবল বল নিয়ে একাদশ অধ্যায়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব। এটি স্বল্প পাল্লার একটি আকর্ষণী বল। এর প্রভাবে প্রোটন ও নিউট্রন একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে নিউক্লিয়াস (পরমাণুর কেন্দ্র) গঠন করে। যথেষ্ট উচ্চ তাপমাত্রায় প্রোটন ও নিউট্রনের গতি শক্তি যথেষ্ট পরিমাণে পৌঁছায় (দেখুন পঞ্চম অধ্যায়)। এর ফলে এরা এদের সংঘর্ষ থেকে মুক্ত ও স্বতন্ত্রভাবে বের হয়ে আসতে পারে। কিন্তু এক বিলিয়ন ডিগ্রি তাপমাত্রায় এরা সবল বলের আকর্ষণকে ফাঁকি দিতে পারে না। এর ফলে এরা যুক্ত হয়ে ডিউটেরিয়াম পরমাণুর (ভারী হাইড্রোজেন) নিউক্লিয়াস তৈরি করে। এতে একটি করে প্রোটন ও নিউট্রন থাকে। পরে ডিউটেরিয়ামের নিউক্লিয়াস আরও প্রোটন ও নিউট্রনের সাথে যুক্ত হয়ে তৈরি করে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস। এতে থাকে দুটি করে প্রোটন ও নিউট্রন। এর সাথে লিথিয়াম ও বেরিলিয়ামের মতো অল্প কিছু অপেক্ষাকৃত ভারী মৌলও তৈরি হয়। হিসাব করলে দেখা যাবে, উত্তপ্ত বিগ ব্যাং মডেলে প্রোটন ও নিউট্রনের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ হিলিয়ামে রূপান্তরিত হয়।  অল্প কিছু পরিণত হয় ভারী হাইড্রোজেন ও অন্যান্য মৌলে। বাকি নিউট্রন ক্ষয় হয়ে প্রোটনে পরিণত হয়। আর প্রোটনই হল সাধারণ হাইড্রোজেন পরমাণুর নিউক্লিয়াস।

মহাবিশ্বের আদি উত্তপ্ত অবস্থার এই চিত্র প্রথম তুলে ধরেন বিজ্ঞানী জর্জ গ্যামো। ১৯৪৮ সালে তিনি তাঁর এক ছাত্র র‍্যালফ আলফারের সাথে যৌথভাবে একটি গবেষণাপত্রে এটি প্রকাশ করেন। গ্যামোর মধ্যে রসবোধের কোনো কমতি ছিল না। তিনি তাঁর বন্ধু ও নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানী হ্যান্স বেথেকে রাজি করিয়ে গবেষণাপত্রের লেখক তালিকায় তাঁর নামও যুক্ত করে দেন। এতে করে আলফার, বেথে, গ্যামো- এই তিনটি নাম দেখতে গ্রিক বর্ণমালার প্রথম তিনটি অক্ষর আলফা, বিটা, ও গামা এর মতো হল। এদিকে আবার মহাবিশ্বের শুরু সম্পর্কিত একটি গবেষণাপত্রে এমন নাম থাকাটাও একেবারেই সার্থক। এই গবেষণাপত্রে তাঁরা একটি উল্লেখযোগ্য পূর্বাভাস প্রদান করেন। মহাবিশ্বের আদি উত্তপ্ত দশাসমূহের বিকিরণ (ফোটন এর আকৃতিতে) আজও উপস্থিত থাকা উচিৎ। তবে তার তাপমাত্রা হবে পরম শূন্য তাপমাত্রার মাত্র কয়েক ডিগ্রি ওপরে (পরম শূন্য বা মাইনাস ২৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হল সম্ভাব্য সবচেয়ে নিম্ন তাপমাত্রা। এ তাপমাত্রায় বস্তুতে কোনো তাপ শক্তি থাকে না)।

১৯৬৫ সালে পেনজিয়াস ও উইলসন এই মাইক্রোওয়েভ বিকিরণই খুঁজে পেয়েছিলেন। আলফার, বেথে ও গ্যামো যখন তাঁদের গবেষণাপত্র লেখেন, সেই সময় প্রোটন ও নিউট্রনের নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া সম্পর্কে খুব বেশি জানা ছিল না। ফলে আদি মহাবিশ্বের বিভিন্ন মৌলের অনুপাত সম্পর্কে করা অনুমানে কিছুটা ভুল ছিল। কিন্তু আধুনিক জ্ঞানের আলোকে এই হিসাবগুলো বারবার করার পর বর্তমানে তা সাথে পর্যবেক্ষণ মিলে গেছে। তবুও মহাবিশ্বের চার ভাগের এক ভাগ ভর কেন হিলিয়াম হয়ে আছে তা ব্যাখ্যা করা খুব কঠিন।

কিন্তু এই চিত্রেও কিছু সমস্যা আছে। বিগ ব্যাং মডেল অনুসারে আদি মহাবিশ্বের এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে তাপ প্রবাহিত হবার মতো যথেষ্ট সময় ছিল না। এর অর্থ হল, মহাবিশ্বের প্রাথমিক অবস্থায় সব দিকে ঠিক একই পরিমাণ তাপমাত্রা থাকবে। তা না হলে আমরা যে কোনো দিকে তাকিয়ে মাইক্রোওয়েভ পটভূমি বিকিরণকে একই তাপমাত্রায় দেখতে পেতাম না। উপরন্তু প্রাথমিক অবস্থায় প্রসারণের হারকেও হতে হয়েছিল খুব নিখুঁত। না হলে আবার শুরু হয়ে যেত সঙ্কোচন। মহাবিশ্ব ঠিক এভাবেই কেন শুরু হল তার ব্যাখা পাওয়া কঠিন। হতে পারে ঈশ্বর আমাদেরকে সৃষ্টি করার জন্যে এ কাজ করেছেন। বর্তমান মহাবিশ্বের মতো কিছু তৈরি হবার মতো অনেকগুলো আলাদা প্রাথমিক অবস্থা নিয়ে একজন বিজ্ঞানী একটি মডেল তৈরির চেষ্টা করেছেন। ইনি হলেন এমআইটির (ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি) বিজ্ঞানী অ্যালান গুথ। তিনি প্রস্তাব করলেন, প্রাথমিক অবস্থায় মহাবিশ্ব সম্ভবত কিছু সময় ধরে খুব দ্রুত গতিতে প্রসারিত হয়েছিল। এই ধরনের প্রসারণকে বলা হয় স্ফীতি। অর্থ্যাৎ, এ সময় প্রসারণের হার ক্রমশ বাড়ছিল। গুথের মতে, সেই সময় এক সেকন্ডের ক্ষুদ্র একটি ভগাংশ সময়ের মধ্যে মহাবিশ্বের ব্যাসার্ধ একশ কোটি কোটি কোটি কোটি (এক এর পরে ৩০ টি শূন্য) গুণ বেড়ে যায়। এই তীব্র প্রসারণের ফলে যে কোনো বিষমতা (একেক দিকে একেক রকম থাকা) উধাও হয়ে যাবার কথা। যেমন আপনি যদি একটি বেলুনকে ফুলিয়ে বড় করেন, তাহলে এর ভাঁজগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। এ কারণে আদি মহাবিশ্বের অনেকগুলো আলাদা বিষম অবস্থা থেকে কীভাবে বর্তমান মসৃণ ও সুষম (সব দিকে একই রকম) মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে স্ফীতির মাধ্যমে তার ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। এ কারণে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে যে আমরা বিগ ব্যাং ঘটার এক সেকেন্ডের এক বিলিয়ন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন (এক এর পরে ৩৩ টি শূন্য) ভাগের এক ভাগ পরের সময়ের সঠিক চিত্রও বুঝতে পেরেছি।

প্রাথমিক সময়ের এতসব অস্থির কাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হিলিয়াম এবং লিথিয়ামের মতো অন্য কিছু মৌলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর প্রায় কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে মহাবিশ্বের প্রসারণ অব্যাহত থাকে, এ সময়ের মধ্যে বড় তেমন কিছু ঘটেনি। এরপর তাপমাত্রা নেমে হয় কয়েক হাজার ডিগ্রি। এবারে ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াস (যেখানে প্রোটন ও ইলেকট্রন থাকে) একে অপরের প্রতি ক্রিয়াশীল তড়িচ্চুম্বকীয় আকর্ষণকে আর এড়িয়ে যেতে পারে না। এরা মিলিত হয়ে গঠন করে পরমাণু। সামগ্রিকভাগে মহাবিশ্ব প্রসারিত হওয়া অব্যাহতই রেখেছিল, ক্রমশ ঠাণ্ডাও হচ্ছিল। কিন্তু যে অঞ্চলের ঘনত্ব গড় ঘনত্বের চেয়ে কিছুটা বেশি তাতে মহাকর্ষের ফলে প্রসারণে কিছুটা ভাটা পড়ে।

কিছু অঞ্চলে শেষ পর্যন্ত প্রসারণ থেমেই গেল। এটি এর পর গুটিয়ে যেতে থাকবে। গুটিয়ে যাবার সময়  বাইরের অঞ্চলের মহাকর্ষীয় টানের প্রভাবে এটি কিছুটা আবর্তিত হতে শুরু করে। এই গুটিয়ে যাওয়া অঞ্চল আরও ছোট হয়ে গেলে এর ঘুর্ণন প্রবণতা বেড়ে যায়। যেমন, বরফের উপর স্কেটিং করার সময় হাতের বাহুকে ভেতরের দিকে গুটিয়ে নিলে বেশি জোরে ঘোরা যায়। শেষে এই অঞ্চল যথেষ্ট ছোট্ট হয়ে গেলে এটি এত জোরে ঘুরতে থাকে যে তা মহাকর্ষীয় টানের সাথে ভারসাম্য করতে সক্ষম হয়। এভাবেই চাকতির মতো ঘূর্ণনশীল গ্যালাক্সিদের জন্ম হয়। যে অঞ্চলে ঘূর্ণন ছিল না, তা রূপ নেয় উপবৃত্তাকার গ্যালক্সিতে। এ অঞ্চলে সঙ্কোচন থেমে যাওয়ার কারণ হচ্ছে গ্যালক্সির স্বতন্ত্র অংশগুলো এর কেন্দ্রের চারদিকে ভারসাম্য বজায় রেখে ঘুরেই যাচ্ছিল, কিন্তু সামগ্রিকভাবে গ্যালাক্সির নিজের ঘূর্ণন থেমে গিয়েছিল।

সময় পার হবার সাথে সাথে গ্যালাক্সিতে উপস্থিত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস মহাকর্ষের টানে গুটিয়ে গিয়ে ছোট ছোট আলাদা মেঘ গঠন করে। এই মেঘ সঙ্কুচিত হলে এর মধ্যে থাকা পরমাণু একে অপরের সাথে সংঘর্ষ করে করে গ্যাসের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এক সময় এর তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে এতে নিউক্লিয়ার ফিউশন (সংযোজন) বিক্রিয়া শুরু হয়। এই ফিউশনের ফলে হাইড্রোজেন হিলিয়ামে পরিণত হয়। নিয়ন্ত্রিত উপায়ে বিস্ফোরিত একটি হাইড্রোজেন বোমার মতো এই বিক্রিয়ায় নিঃসৃত তাপের কারণেই একটি নক্ষত্র উজ্জ্বল হয়। এই বাড়তি তাপ গ্যাসের চাপও (বাইরের দিকে) বাড়িয়ে তোলে। এক সময় এই চাপ মহাকর্ষীয় টানের (যা কাজ করে ভেতরের দিকে, ঘটাতে চায় সঙ্কোচন) সাথে সেয়ানে সেয়ানে লড়তে পারে। এর ফলে গ্যাসের সঙ্কোচন বন্ধ হয়। এভাবেই এই মেঘ আমাদের সূর্যের মতো নক্ষত্রে পরিণত হয়। এরা হাইড্রোজেন গ্যাস জ্বালিয়ে হিলিয়ামে রূপান্তরিত করে, বিকিরণ করে তাপ ও আলো। এর উদাহরণ অনেকটা বেলুনের মতো- ভেতরে থাকা বাতাসের বাইরের দিকের প্রসারণ চাপ এবং বেলুনের রাবারের নিজস্ব টান (যা বেলুনকে ছোট করে ফেলতে চায়) একে অপরকে স্থির রাখে।

উত্তপ্ত গ্যাসের মেঘ একবার নক্ষত্র হয়ে গেলে তা বহু দিন ধরে স্থিতিশীল থাকে। এ অবস্থায় নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার তাপ ও মহাকর্ষীয় টান একে অপরকে ধরে রাখে। কিন্তু এক সময় নক্ষত্রের হাইড্রোজেন ও অন্যান্য নিউক্লিয়ার জ্বালানি ফুরিয়ে যায়। মজার ব্যাপার হল, শুরুতে একটি নক্ষত্রের যত বেশি পরিমাণ ভর থাকে, এটি তত তাড়াতাড়ি জ্বালানি ফুরিয়ে ফেলে। এর কারণ হচ্ছে, একটি নক্ষত্রের যত বেশি ভর থাকে এর মহাকর্ষীয় টানের সাথে ভারসাম্যে থাকতে একে তত বেশি উত্তপ্ত হতে হয়। আর নক্ষত্রটি যত বেশি উত্তপ্ত হবে তত দ্রুত গতিতে এর মধ্যে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া হবে এবং তত দ্রুত এর জ্বালানি শেষ হবে। আমাদের সূর্যের কাছে যে জ্বালানি আছে তা দিয়ে এটি সম্ভবত আরও প্রায় পাঁচ বিলিয়ন (পাঁচশ কোটি) বছর চলতে পারবে। কিন্তু আরও বেশি ভরের নক্ষত্ররা একশ মিলিয়ন (দশ কোটি) বছরের মধ্যেও জ্বালানি ফুরিয়ে ফেলতে পারে। এই সময়টি আমাদের মহাবিশ্বের বয়সের তুলনায় অনেক ছোট্ট।

জ্বালনি শেষ হয়ে গেলে নক্ষত্রটি আবার ঠাণ্ডা হতে শুরু করে। মহাকর্ষ আবার বিজয়ী হয়। শুরু হয় সঙ্কোচন। এর ফলে পরমাণুরা একে অপরের সাথে জড়িয়ে যায়। এর ফলে নক্ষত্রটি আবার উত্তপ্ত হতে থাকে। উত্তাপ আরও বাড়লে এবার এতে হিলিয়াম থেকে আরও ভারী [১] মৌল যেমন কার্বন বা অক্সিজেন উৎপন্ন হবে। এরপর কী হবে তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কিন্তু খুব সম্ভব, এর কেন্দ্রীয় অঞ্চল গুটিয়ে গিয়ে অতি ঘন অবস্থা যেমন ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ গহ্বর তৈরি করবে। ব্ল্যাক হোল শব্দটা নতুন। আমেরিকান বিজ্ঞানী জন হুইলার ১৯৬৯ সালে শব্দটি তৈরি করেন। এর মাধ্যমে তিনি অন্তত দুইশ বছর আগের একটি ধারণার চিত্র তুলে ধরেন। এটা সেই সময়ের কথা যখন আলো সম্পর্কে দুটো তত্ত্ব ছিল। একটি মত ছিল নিউটনের পছন্দনীয়। এই মত অনুসারে, আলো কণা দিয়ে তৈরি। আরেকটি মতের বক্তব্য ছিল, আলো তৈরি তরঙ্গ দিয়ে। এখন আমরা জানি, দুটো তত্ত্বই সঠিক। নবম অধ্যায়ে আমরা দেখব, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কণা- তরঙ্গের দ্বৈততায় (দ্বিমুখী আচরণ) আলোকে কণা ও তরঙ্গ দুই- ই মনে করা যায়। কণা ও তরঙ্গের ধারণাগুলো আমরাই বানিয়েছি, এমন না যে প্রকৃতির সব ঘটনা এর কোনো একটির মতো হতেই হবে।

আলোকে তরঙ্গ ধরে নিলে এটি মহাকর্ষের প্রভাবে কীভাবে কাজ করবে তা বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু আলোকে যদি আমরা কণায় তৈরি মনে করি, তাহলে এই কণারা কামানের গোলা, রকেট বা গ্রহদের মতোই মহাকর্ষ দ্বারা আকৃষ্ট হবে বলে আশা করা যায়। যেমন একটি কামানের গোলাকে পৃথিবীর বা কোনো নক্ষত্রের পৃষ্ঠ থেকে উপরে ছুঁড়লে (নিচের ছবিতে দেখুন) এক সময় এটি থেমে যাবে। এর পর এটি আবার নিচে নামতে থাকবে। তবে একে একটি নির্দিষ্ট বেগের চেয়ে জোরে ছুঁড়ে মারলে ভিন্ন কিছু ঘটবে (এটি আর ফিরে আসবে না)। এই ন্যুনতম বেগকে বলে মুক্তি বেগ। কোনো নক্ষত্রের মুক্তি বেগ নির্ভর করে এর মহাকর্ষী টানের উপর। ভর বেশি হলে মুক্তি বেগের মানও হয় বেশি। এক সময় মানুষ ভাবত আলোর গতি হল অসীম।  এর ফলে মহাকর্ষ একে কিছুতেই থামাতে পারবে না। কিন্তু রোমা সাহেব আলোর নির্দিষ্ট গতির কথা আবিষ্কার করলে বোঝা গেল, এর উপর মহাকর্ষের প্রভাব থাকতেও পারে। নক্ষত্রের ভর যথেষ্ট বেশি হলে আলোর বেগও হবে এর মুক্তি বেগের চেয়ে কম। ফলে নক্ষত্র থেকে বের হওয়া যেকোনো আলো আবার এতেই ফিরে আসবে।

 

চিত্রঃ মুক্তি বেগের উপরে ও নিচের বেগে নিক্ষিপ্ত কামানের গোলা। [মুক্তি বেগের চেয়ে জোরে ছুঁড়লে what goes up must come down (উপরে উঠলে নিচেও নামতে হবে) কথাটি আর খাটে না।]

চিত্রঃ মুক্তি বেগের উপরে ও নিচের বেগে নিক্ষিপ্ত কামানের গোলা। [মুক্তি বেগের চেয়ে জোরে ছুঁড়লে what goes up must come down (উপরে উঠলে নিচেও নামতে হবে) কথাটি আর খাটে না।]

এই অনুমানের উপর ভিত্তি করে ক্যামব্রিজের শিক্ষক জন মিচেল ১৭৮৩ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এটি  লন্ডনের ফিলোসফিক্যাল ট্র্যানজেকশান অব দি রয়েল সোসাইটি জার্নালে প্রকাশিত হয়। এতে তিনি বলেন যে একটি নক্ষত্র যথেষ্ট আঁটসাঁট (আকারে ছোট) ও বেশি ভর বিশিষ্ট হলে এর শক্তিশালী মহাকর্ষের কারণে এর ভেতর থেকে আলো বের হয়ে আসতে পারবে না। এর পৃষ্ঠ থেকে বের হওয়া যে কোনো আলো বেশি দূর যাবার আগেই এটার মহাকর্ষ তাকে টেনে ভেতরে নিয়ে আসবে। এ ধরনের বস্তুদেরকে এখন আমরা ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর বলি, কারণ এরা আসলেই তাই: মহাশূন্যের কালো শূন্যতা।

কয়ে বছর পরে ফরাসী বিজ্ঞানী মারকুই দে ল্যাপ্লাসও সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে একই রকম একটি মত প্রকাশ করেন। তিনি এই কথাটি প্রকাশ করেন তাঁর ‘দি সিস্টেম অব দি ওয়ার্ল্ড ‘ বইয়ে।

মজার ব্যাপার হল, তিনি কথাটি বইটির প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণে উল্লেখ করলেও পরে তা মুছে ফেলেন। হয়ত ভেবেছিলেন চিন্তাটা পাগলামি ছাড়া কিছু নয়। ঊনিশ শতক যেতে যেতে আলোর কণা তত্ত্ব পরাজিত হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, তরঙ্গ তত্ত্ব দ্বারাইতো সব কিছু ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে। সত্যি বলতে, নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব অনুসারে আলোকেও কামানের গোলার মতো ধরে নেওয়া যুক্তিসংগত নয়। আলোর বেগতো নির্দিষ্ট। পৃথিবী থেকে উপরে নিক্ষিপ্ত কামানের গোলা অভিকর্ষের ফলে গতি হারিয়ে ফেলবে এবং শেষমেশ থেমে গিয়ে নিচে নেমে আসবে। কিন্তু আলোতো একটি নির্দিষ্ট বেগে উপরের দিকে যেতেই থাকবে। ১৯১৫ সালে আইনস্টাইন সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রকাশ করলে বোঝা গেল আলো কীভাবে মহাকর্ষ দ্বারা ক্রিয়াশীল হল। বেশি ভরের নক্ষত্রের কী পরিণতি ঘটবে তা প্রথম সমাধান করেন তরুণ আমেরিকান বিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহাইমার। তিনি ১৯৩৯ সালে সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব কাজে লাগিয়ে কাজটি করেন।

ওপেনহাইমারের গবেষণা থেকে বর্তমানে যে ধারণা আমরা পাচ্ছি তা হল: নক্ষত্রের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের প্রভাবে স্থান- কাল ভেদ করে আসা আলোর গতিপথ মূল পথ থেকে সরে যায়। সূর্যগ্রহণের সময় দূরের নক্ষত্রের আলো একারণেই বেঁকে যেতে দেখা যায়। নক্ষত্রটি সঙ্কুচিত হলে এর ঘনত্ব আরও বেড়ে যায়। এর ফলে এর পৃষ্ঠের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র আরও শক্তিশালী হয় (মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে নক্ষত্রটির কেন্দ্র থেকে বাইরে ছড়িয়ে থাকে। নক্ষত্রটি ছোট হয়ে গেলে এর পৃষ্ঠ কেন্দ্রের আরও কাছে চলে আসে। ফলে আকর্ষণ হয় আরও তীব্র)। ক্ষেত্র শক্তিশালী হলে পৃষ্ঠের কাছাকাছি অঞ্চলে আলো ভেতরের দিকে আরও বেশি করে বেঁকে যায়। শেষে নক্ষত্রটি একটি নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধ্য পর্যন্ত ছোট হয়ে গেলে পৃষ্ঠের মহাকর্ষ এত বেশি শক্তিশালী হয় যে আলোর পথ ভেতরের দিকে এমনভাবে বেঁকে যায়, যা আর বের হয়ে আসতে পারে না।

 

চিত্রঃ ব্ল্যাক হোলের আশেপাশে স্থান- কাল এভাবেই বেঁকে গিয়ে আলোকে ভেতরে টেনে নেয়। ছবিঃ অনুবাদক (ইন্টারনেট অবলম্বনে)

চিত্রঃ ব্ল্যাক হোলের আশেপাশে স্থান- কাল এভাবেই বেঁকে গিয়ে আলোকে ভেতরে টেনে নেয়। ছবিঃ অনুবাদক (ইন্টারনেট অবলম্বনে)

আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে কোনো কিছুই আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে চলতে পারে না। অতএব আলো বের হতে না পারার অর্থ হচ্ছে ওখান থেকে আসলে কোনো কিছুই বের হতে পারবে না। সবকিছুই মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কবলে পড়ে ভেতরে পড়ে থাকবে। সঙ্কুচিত নক্ষত্রটি এর চারপাশে স্থান- কালের এমন একটি অঞ্চল তৈরি করবে যা থেকে আলো বের হয়ে দূরের কোনো দর্শকের চোখ পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব নয়। এই অঞ্চলের নাম ব্ল্যাক হোল। ব্ল্যাক হোলের বাইরের সীমানার নাম ঘটনা দিগন্ত (event horizon)। বর্তমানে হাবল স্পেস টেলিস্কোপসহ আরও কিছু টেলিস্কোপের কল্যাণে আমরা অহরই আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ব্ল্যাক হোল খুঁজে পাচ্ছি। এই টেলিস্কোপগুলো দিয়ে দৃশ্যমান আলোর বদলে এক্স-রে ও গামা রশ্মিতে পর্যবেক্ষণ করা হয়। একটি স্যাটেলাইট আকাশের একটিমাত্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে পনেরশ ব্ল্যাক হোল খুঁজে পেয়েছে। আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রেও একখানা ব্ল্যাক হোল পাওয়া গেছে। এর ভর সূর্যের ১০ লাখ গুণের চেয়ে বেশি। এই সুপারম্যাসিভি [২] ব্ল্যাক হোলটিকে কেন্দ্র করে একটি নক্ষত্র আলোর ২ শতাংশ  গতি নিয়ে ঘুরছে। একটি নিউক্লিয়াসকে (পরমাণুর কেন্দ্র) কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা একটি ইলেকট্রনের গড় গতিও এর চেয়ে কম।

একটি বিশাল ভরের নক্ষত্র গুটিয়ে ব্ল্যাক হোল তৈরি হবার সময় কী দেখা যাবে? এটা জানতে হলে মাথায় রাখতে হবে যে আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে পরম সময় বলতে কিছু নেই। অন্য কথায়, প্রত্যেক দর্শক তার নিজের মতো করে সময় মাপবেন। নক্ষত্রের পৃষ্ঠে অবস্থান করলে যে সময় পাওয়া যাবে, দূরে অবস্থান করা কেউ তার চেয়ে ভিন্ন সময় পাবেন। এর কারণ হল, নক্ষত্রের পৃষ্ঠে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র বেশি শক্তিশালী।

এখন ধরুন, একটি নক্ষত্র ভেতরের দিকে গুটিয়ে যাওয়ার সময় এক অকুতোভয় নভোচারী এর পৃষ্ঠে চেপে বসে আছেন। কোনো এক সময় হয়ত তার ঘড়িতে দেখা গেল ১১:০০ বাজে। ঠিক এই সময় নক্ষত্রটি সঙ্কট ব্যাসার্ধ [৩] পার হয়ে আরও ছোট হয়ে গেল। এখন এর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র এতটা শক্তিশালী হল যে কিছুই আর বের হতে পারবে না। এখন ধরুন, তাকে বলা হয়েছিল যে ঘড়ি দেখে প্রতি সেকেন্ডে একটি করে সঙ্কেত পাঠাতে হবে। সঙ্কেত গ্রহণ করার জন্য একটু দূরে একটি মহাকাশযান নক্ষত্রটিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। তিনি যখন সঙ্কেত পাঠানো শুরু করেন তখন সময় ১০:৫৯:৫৮। অর্থ্যাৎ, ১১: ০০ টা বাজতে আর দুই সেকেন্ড বাকি। এখন মহাকাশযানে বসে তার সাথীরা কী দেখতে পাবেন?

এর আগে আমরা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে দেখেছিলাম মহাকর্ষের কারণে রকেটের ভেতরে সময় ধীরে চলে। মহাকর্ষ শক্তিশালী হলে এই প্রভাবও হয় বেশি। নক্ষত্রের পৃষ্ঠে থাকা নভোচারীর কাছে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মান তার সাথীদের চেয়ে শক্তিশালী। এর ফলে তার কাছে যেটা এক সেকেন্ড সেটাই তার সাথীদের কাছে আরও বেশি সময় মনে হবে। নক্ষত্র গুটিয়ে যাবার সময় তিনিও যখন ভেতরের দিকে চলে যাচ্ছেন, মহাকর্ষ ক্রমেই তত শক্তিশালী হচ্ছে। এর ফলে মহকাশযানের যাত্রীদের কাছে তার পাঠানো বিভিন্ন সঙ্কেতের মধ্যবর্তী সময় ক্রমেই লম্বা মনে হতে থাকবে। সময়ের এই প্রসারণ ১০:৫৯:৫৯ এর আগে খুব ক্ষুদ্র হবে। তাই মহকাশযানের যাত্রীদেরকে ১০:৫৯:৫৮ এবং ১০:৫৯:৫৯ সময়ে পাঠানো সঙ্কেত দুটি পেতে এক সেকেন্ডের চেয়ে সামান্য বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু ১১:০০ টার সময় পাঠানো সঙ্কেত পেতে তাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে চিরকাল [৪]

১০:৫৯:৫৯ ও ১১:০০ টার মধ্যবর্তী সময়ে নক্ষত্রের পৃষ্ঠে যা কিছু ঘটবে তা মহাকাশযান থেকে দেখতে অসীম সময়ের প্রয়োজন হবে। ১১:০০ টা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে নভোচারীর পাঠানোর সঙ্কেতের মতোই আলোর তরঙ্গের পর্যায়ক্রমিক খাঁজ ও চূড়ার পার্থক্য লম্বা হতে থাকবে। আমরা জানি, প্রতি সেকেন্ডে সৃষ্ট চূড়া ও খাঁজের সংখ্যাকেই আলোর কম্পাঙ্ক বলে। অতএব, মহকাশযানের দর্শকদের কাছে নক্ষত্রের আলোর কম্পাঙ্ক কমে যেতে থাকবে। এই আলো তাই ধীরে ধীরে লাল (এবং ঝাপসা) হতে থাকবে। এক সময় নক্ষত্রটি এত অনুজ্জ্বল হয়ে যাবে যে একে আর যান থেকে দেখা যাবে না। সামনে শুধুই পড়ে থাকবে মহাশূন্যের এক কালো গহ্বর। তবে যানের উপর এর মহাকর্ষীয় টান চলতেই থাকবে এবং যানটিও একে ঘিরে চলতে থাকবে।

এই দৃশ্য অবশ্য পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নয়। এতে একটু সমস্যা আছে। নক্ষত্র থেকে দূরের দিকে মহাকর্ষ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে আমাদের নির্ভীক নভোচারীর পায়ের কাছে মহাকর্ষ সব সময় তার মাথার চেয়ে বেশি হবে। মহাকর্ষের এই পার্থক্য তাকে সেমাইয়ের মত টেনে লম্বা করে দিবে। এর ফলে নক্ষত্রটি সঙ্কট ব্যাসার্ধে পৌঁছে ঘটনা দিগন্ত তৈরি করার আগেই তিনি ছিন্ন- বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। অবশ্য আমাদের বিশ্বাস, মহাবিশ্বে আরও বড় বড় বস্তুও আছে। যেমন গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় অঞ্চলেও মহাকর্ষীয় সঙ্কোচনের ফলে ব্ল্যাক হোল তৈরি হতে পারে। আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রেই এ রকম একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল আছে। এ ধরনের কোনো ব্ল্যাক হোল অভিযানে গেলে নভোচারীকে আগের মত বিপদে পড়তে হবে না। সঙ্কট ব্যাসার্ধে পৌঁছেও তার বিশেষ কোনো অনুভূতি হবে না। তিনি নিজের অজান্তেই পয়েন্ট অব নো রিটার্ন (point of no return, অর্থ্যাৎ যা থেকে আর ফিরে আসা যাবে না) পার হয়ে যাবেন। অবশ্য বাইরে থেকে দেখতে আগের মতোই তার পাঠানো সঙ্কেত দীর্ঘস্থায়ী হতে হতে এক সময় হারিয়ে যাবে। আর নভোচারীর ঘড়ি অনুসারে আরও কয়েক ঘণ্টা পরে ঠিকই বিপদ দেখা দেবে। মহাকর্ষের ফলে সঙ্কোচন অব্যাহত থাকায় এক সময় তার মাথা ও পায়ের কাছে মহাকর্ষীয় বলের পার্থক্য এত বেশি হবে যে তিনি আগের মতোই ছিন্ন- বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন।    

চিত্রঃ মহাকর্ষীয় টান। [দূরত্বের সাথে সাথে মহাকর্ষ দুর্বল হতে থাকে বলে পৃথিবীর আকর্ষণ আপনার পায়ের চেয়ে মাথায় মহাকর্ষীয় টান কম। এখানে পার্থক্য এক মিটার বা তার কাছাকাছি, তাই এখানে মহাকর্ষের পার্থক্য খুব সামান্য বলে তা আমরা টের পাই না। কিন্তু ব্ল্যাক হোলের কাছে থাকা একজন নভোচারী ঠিকই ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়বেন।]

চিত্রঃ মহাকর্ষীয় টান। [দূরত্বের সাথে সাথে মহাকর্ষ দুর্বল হতে থাকে বলে পৃথিবীর আকর্ষণ আপনার পায়ের চেয়ে মাথায় মহাকর্ষীয় টান কম। এখানে পার্থক্য এক মিটার বা তার কাছাকাছি, তাই এখানে মহাকর্ষের পার্থক্য খুব সামান্য বলে তা আমরা টের পাই না। কিন্তু ব্ল্যাক হোলের কাছে থাকা একজন নভোচারী ঠিকই ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়বেন।]

 অনেক সময় একটি বড় ভরের নক্ষত্র গুটিয়ে যাওয়ার সময় এর বহিস্থ অঞ্চল তীব্র বিস্ফোরণের মাধ্যমে বাইরে ছিটকে পড়তে পারে। একে বলা হয় সুপারনোভা। এই বিস্ফোরণ এত শক্তিশালী যে এটি একাই পুরো গ্যালাক্সির বাকি সব নক্ষত্রের চেয়ে উজ্জ্বল হতে পারে। এ রকম একটি সুপারনোভার অবশিষ্টাংশকেই আমরা এখন কাঁকড়া নীহারিকা (Crab nebula) নামে চিনি। চীন দেশে ১০৫৪ সালে একে দেখার কথা লেখা আছে। এক্ষেত্রে বিস্ফোরিত নক্ষত্রটির দূরত্ব ছিল পাঁচ হাজার আলোকবর্ষ। এর পরেও বহু মাস ধরে একে খালি চোখে দেখা গিয়েছিল। এটি এত বেশি উজ্জ্বল ছিল যে একে দিনের বেলায়ও দেখা যেত। রাতের বেলায় এর আলোতে বই পড়া যেত। এটি যদি এর দশ ভাগের এক ভাগ অর্থ্যাৎ, পাঁচশ আলোকবর্ষ দূরে থাকত তবে এটি একশ গুণ উজ্জ্বল হত। সেক্ষেত্রে রাত আর দিনের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকত না। এই বিস্ফোরণের তীব্রতা পৃথিবীতে আলো প্রদানের ক্ষেত্রে সূর্যের সাথে পাল্লা দিতে পারত, যদিও সূর্য এর চেয়ে কোটি কোটি গুণ কাছে। মনে আছে নিশ্চয়ই, আমাদের সূর্যের দূরত্ব কিন্তু মাত্র ৮ আলোক-মিনিট। এত কাছে যদি কোন সুপারনোভা থাকত, পৃথিবী নিজে ঠিকই থাকত, কিন্তু বিকিরণের কারণে সব প্রাণী ধ্বংস হয়ে যেত।

সম্প্রতি কেউ কেউ বলেছেনও যে প্রায় ২০ লাখ বছর আগে প্লাইস্টোসিন ও প্লায়োসিন যুগের মাঝখানে যে সামুদ্রিক প্রাণীরা মারা পড়েছিল তাতেও একটি সুপারনোভা থেকে আসা মহাজাগতিক বিকিরণের ভূমিকা ছিল। এই সুপারনোভাটি ছিল আমাদের খুব কাছেই বৃশ্চিক- সেন্টোরাস নক্ষত্রপুঞ্জে (star cluster)। কিছু বিজ্ঞানীর বিশ্বাস, উন্নত প্রাণের উদ্ভব ঘটে গ্যালাক্সির সেই অঞ্চলের দিকে যেখানে তারকার সংখ্যা খুব বেশি থাকে না। একে বলা হয় জোন অব লাইফ। কারণ বেশি তারকাময় অঞ্চলে নিয়মিত সুপারনোভাদের হানায় প্রাণের বিকাশে বাধা পড়ে। মহাবিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে প্রতি দিন লাখ লাখ সুপারনোভা বিস্ফোরিত হয়। একটি গ্যালাক্সিতে প্রায় প্রতি শতাব্দীতে একটি করে সুপারনোভার বিস্ফোরণ ঘটে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দূর্ভাগ্য যে জানা তথ্য মতে, মিল্কিওয়েতে সর্বশেষ সুপারনোভার বিস্ফোরণ ঘটেছিল ১৬০৪ সালে, যখনও টেলিস্কোপ আবিষ্কৃতই হয়নি।

আমাদের গ্যালাক্সিতে পরবর্তী সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে রো ক্যাসিওপিই নক্ষত্র। ভাগ্য ভাল যে এটি আমাদের থেকে দশ হাজার আলোকবর্ষ দূরে আছে, যা আমাদের জন্যে নিরাপদ দূরত্ব। এটি একটি হলুদ হাইপারজায়ান্ট (yellow hyper giant) শ্রেণির তারকা। মিল্কিওয়েতে আবিষ্কৃত মাত্র সাতটি হলুদ হাইপারজায়ান্টের মধ্যে এটি একটি। ১৯৯৩ সালে একদল আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিদ এটি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। পরের কয়েক বছরে তাঁরা দেখলেন, এর তাপমাত্রা পর্যায়ক্রমে কয়েকশ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠা- নামা করছে। এর পর ২০০০ সালের গ্রীষ্মে এর তাপমাত্রা হঠাৎ করে সাত হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে চার হাজারে নেমে আসে। একই সময় তাঁরা এর বায়ুমণ্ডলে টাইটেনিয়াম অক্সাইড খুঁজে পান। তাঁদের মতে একটি প্রচণ্ড শক ওয়েভের মাধ্যমে নক্ষত্রটি থেকে এই পদার্থ বাইরের দিকে চলে এসেছে।

নক্ষত্রের জীবনের শেষের দিকে তৈরি কিছু ভারী পদার্থ সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে গ্যালাক্সিতে ছড়িয়ে পড়ে। নতুন নক্ষত্র তৈরিতে এই পদার্থগুলো ভূমিকা রাখে। আমাদের সূর্যেই এ রকম দুই শতাংশ ভারী মৌল রয়েছে। আমাদের সূর্য হল দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের নক্ষত্র। প্রায় পাঁচ বিলিয়ন বছর আগে এর জন্ম। এর আগে বিস্ফোরিত সুপারনোভার ধ্বংসাবশেষের ঘূর্ণনশীল গ্যাসীয় মেঘ থেকে এর সৃষ্টি। সেই মেঘের বেশির ভাগ অংশই হয় সূর্য তৈরিতে কাজে লেগেছে অথবা আরও দূরে ছিটকে গেছে। অল্প কিছু পরিমাণ ভারী মৌল জড় হয়ে আমাদের পৃথিবীর মতো গ্রহদের জন্ম হয়েছে, যারা সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। আমাদের অলঙ্কার তৈরির স্বর্ণ এবং নিউক্লিয়ার চুল্লির ইউরেনিয়াম- দুটোই সৌরজগতের জন্মের আগে কোনো সুপারনোভা বিস্ফোরণের ফসল!

নতুন অবস্থায় যখন পৃথিবী ঘনীভূত হয়েছিল, তখন এর উত্তাপ ছিল খুব বেশি, ছিল না কোনো বায়ুমণ্ডল। আস্তে আস্তে এটি ঠাণ্ডা হল। বিভিন্ন পাথর থেকে নির্গত গ্যাস গড়ে তুলল বায়ুমণ্ডল। প্রাথমিক এই বায়ুমণ্ডল নিয়ে আমরা কিন্তু বাঁচতে পারতাম না। এতে কোনো অক্সিজেন ছিল না। তবে এতে অন্য গ্যাস ঠিকই ছিল, কিন্তু তা ছিল বিষাক্ত। যেমন, এতে ছিল হাইড্রোজেন সালফাইড (পঁচা ডিমে এই গ্যাস থাকার কারণেই তা গন্ধ ছড়ায়)। তবে প্রাণের কিছু আদি রূপ এই পরিবেশেও টিকতে পারত। ধারণা করা হয় এদের উৎপত্তি সাগরে। দৈব প্রক্রিয়ায় পরমাণু থেকে এদের বড়ো কাঠামো বা বড়ো অণু (macromolecule) তৈরি হয়। এটিও আবার অন্য পরমাণুকে যুক্ত করে একই ধরনের কাঠামো গঠন করে। এতে পুনরুৎপাদিত হতে হতে সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে পুনরুৎপাদনের সময় থেকে যায় ত্রুটি। এই ত্রুটিগুলো এমন যে নতুন বড় অণু নিজে নিজে তৈরি হতে না পেরে নষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু কিছু ত্রুটি থেকে এমন কিছু বড় অণু তৈরি হত যা আগের চেয়ে ভালোভাবে পুনরুৎপাদিত হতে পারে। এরা একটু সবিধাজনক জায়গায় থাকায় আগের বড় অণুদের জায়গা দখলে নিত। এইভাবে বিবর্তনের মাধ্যমে জটিল থেকে জটিলতর স্ব-উৎপাদনশীল প্রাণীর সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক যুগের প্রাণীরা হাইড্রোজেন সালফাইডসহ বিভিন্ন পদার্থ গ্রহণ করত এবং অক্সিজেন ছেড়ে দিত। ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলের উপাদান পাল্টাল। উন্নত ধরনের প্রাণী যেমন মাছ, সরসৃপ, স্তন্যপায়ী এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের আবির্ভাব ঘটল।

বিংশ শতকে এসে মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণা পাল্টে যায়। আমরা বুঝতে পারি যে বিশাল মহাবিশ্বে আমাদের স্থান অতি নগণ্য, বুঝতে পারি সময় ও স্থান বক্র ও অবিচ্ছেদ্য, মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে এবং এর একটা শুরু আছে।

মহাবিশ্ব শুরুতে উত্তপ্ত ছিল এবং পরে প্রসারিত হয়ে ধীরে ধীরে শীতল হয়- এই তথ্য আমরা পাই আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব- সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে। আজ পর্যন্ত এর সব অনুমান পর্যেবেক্ষণের সাথে মিলে গেছে, যা এই তত্ত্বের এক বড় বিজয়। কিন্তু গণিত অসীম সংখ্যা নিয়ে কাজ করতে ব্যর্থ। অথচ বিগ ব্যাং থিওরি অনুসারে এক সময় মহাবিশ্বের ঘনত্ব ও স্থান-কালের বক্রতা ছিল অসীম। ফলে মহাবিশ্বের একটি বিন্দুতে গিয়ে সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব নিজেই নিজের অকার্যকরতা ও ব্যর্থতার কথা ঘোষণা করছে। গণিতে এ ধরনের বিন্দুকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি। কোন তত্ত্ব যখন অসীম ঘনত্ব, বক্রতা ইত্যাদির মতো সিঙ্গুলারিটির কথা বলে, বুঝতে হবে তত্ত্বে কিছু ভুল আছে। সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব একটি আংশিক তত্ত্ব, কারণ মহাবিশ্বের শুরু কীভাবে হয়েছিল এটি আমাদেরকে তা বলতে অক্ষম।

সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব ছাড়াও বিংশ শতকে আমরা প্রকৃতি সম্পর্কে আরেকটি আংশিক তত্ত্ব পেয়েছি। এটি হল কোয়ান্টাম মেকানিক্স। খুবই ক্ষুদ্র মাপের জগতের ঘটনাবলী নিয়ে এর কাজ। বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে আমরা জানি যে মহাবিশ্ব এক সময় এত ক্ষুদ্র ছিল যে সেই অবস্থায় এর বড় মাপের গঠন নিয়ে চিন্তা করতে গেলেও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্ষুদ্র প্রতিক্রিয়াও মাথায় রাখতে হবে। আমরা পরের অধ্যায়ে দেখব যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্বকে পুরোপুরি বুঝতে আমরা এই দুটি তত্ত্বের ওপরই নির্ভর করছি। এই দুটো আংশিক তত্ত্বকে জোড়া লাগিয়ে কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি নামে একটিমাত্র তত্ত্ব তৈরি করতে হবে। এতে বিজ্ঞানের সাধারণ সব সূত্র সর্বত্র কাজ করবে, এমনকি সময়ের শুরুতেও। কোনো সিঙ্গুলারিটির প্রয়োজন হবে না।

[অনুবাদকের নোটঃ

১। ভারী বলার অর্থ হচ্ছে এতে প্রোটন, ইলেকট্রন ও নিউট্রনের সংখ্যা বেড়ে যায়। প্রথমে এক প্রোটনের হাইড্রোজেন থেকে দুই প্রোটনের হিলিয়াম হতে থাকে। পরে আরও বেশি প্রোটন বিশিষ্ট পরমাণুরা গঠিত হয়।

২। সূর্যের কয়েক লাখ থেকে শুরু করে কয়েক বিলিয়ন বা তারও বেশি ভরের ব্ল্যাক হোলদের সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল বলে। এরা সাধারণত বিভিন্ন গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকে।

৩। সঙ্কট ব্যাসার্ধ হল নক্ষত্রের সেই ব্যাসার্ধ, যাতে পৌঁছলে এর ঘটনা দিগন্ত নামক অঞ্চল তৈরি হতে পারে। অর্থ্যাৎ, এটি ব্ল্যাক হোল হবার জন্যে তৈরি হয়।

৪। অর্থ্যাৎ, সেই সঙ্কেত আর কোনো দিনই পাওয়া যাবে না, কারণ ততক্ষণে নক্ষত্রটি ব্ল্যাক হয়ে গেছে এবং কিছুই আর এখান থেকে বের হবে না।]

[সব পর্বের তালিকা ও লিংক পাবেন এখানে]

মূলঃ Stephen Hawking এবং Leonard Mlodinow
অনুবাদঃ আব্দুল্যাহ আদিল মাহমুদ
শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

Share.

মন্তব্য করুন