ঘন্টা এবং মিনিট কেন ষাট ভাগে বিভক্ত?

0

আজকের পৃথিবীতে বহুল ব্যবহৃত সংখ্যাগত পদ্ধতিটি হচ্ছে দশমিক (ভিত্তি ১০ এ)। মানুষের হাতের দশটি আঙ্গুল ব্যবহার করে গণনা করা যায় বলেই বোধহয় এই দশভিত্তিক পদ্ধতি চালু হয়েছে। তবে মানব সভ্যতাগুলো বিভিন্ন ধরনের সংখ্যাগত পদ্ধতি যেমন, দ্বাদশমিক (ভিত্তি ১২ তে) এবং ষষ্ঠিক (৬০ এর ভিত্তিতে) ব্যবহার করে প্রথমে দিনকে ক্ষুদ্রতম অংশে বিভক্ত করতে শুরু করে।

সূর্যঘড়ি ব্যবহারের মিশরীয় দলিল খুঁজে পাওয়ার কারণে অধিকাংশ ঐতিহাসিকগণ প্রথম সভ্যতা হিসেবে দিনকে বিভিন্ন ক্ষুদ্রতম অংশে বিভক্ত করার কৃতিত্ব তাঁদের দিয়ে থাকেন। প্রথম সূর্যঘড়িটি ছিল শুধুমাত্র একটি খুঁটি, যা মাটিতে পোতা থাকতো এবং সূর্য থেকে আগত আলো খুঁটিতে আপতিত হয়ে যে ছায়ার সৃষ্টি করতো সেটাই সময় হিসেবে নির্দেশিত হতো। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ সালের শুরুর দিকে মিশরীয়রা আরো উন্নত মানের একটি সূর্যঘড়ির নির্মান করেছিলো। একটি T-আকারের দন্ড মাটিতে স্থাপন করে এই যন্ত্রটি দিয়ে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের মাঝামাঝি ব্যবধানে সময়কে ১২ টি অংশে বিভক্ত করা হয়েছিল।

এই বিভাজনে মিশরীয়দের দ্বাদশমিক পদ্ধতির ব্যবহার প্রতিফলিত হয়েছে। ১২ সংখ্যাটির গুরুত্ব সাধারণত প্রতি বছরের চান্দ্র সংখ্যা বা প্রতিটি হাতের (বৃদ্ধাঙ্গুলসহ হাতের প্রতি চার আঙ্গুলের তিন আঙ্গুল) আঙ্গুলের ভাঁজের সংখ্যার উপর আরোপিত হয়, যা বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে গণনা করার উপযোগী । পরবর্তী প্রজন্মের গঠিত সূর্যঘড়িটিই সম্ভবত এখনকার সময়ে আমাদের ডাকা ঘন্টার প্রতিনিধিত্ব করে। যদিও একটি নির্দিষ্ট দিনে ঘন্টাগুলো প্রায় সমান তবে বছরের বিভিন্ন সময়ে এদের দৈর্ঘ্যে ভিন্নতা ছিল। গ্রীষ্মের ঘন্টা  শীতের ঘন্টা অপেক্ষা অনেক লম্বা ছিল।

কৃত্রিম আলোবিহীন এই সময়ের মানুষগুলো সূর্যের আলো এবং অন্ধকার সময়কে দিনের একই অংশের পরিবর্তে দুটি ভিন্ন রাজ্য হিসেবে মনে করতো। সূর্যঘড়ির সাহায্য ছাড়া সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের মাঝামাঝি অন্ধকার সময়ের বিরতি বিভাজন করা সূর্যের আলো থাকা সময়ে বিভাজন করার চেয়ে জটিল ছিলো। তবে সূর্যঘড়ি প্রথম ব্যবহারের সময়ে মিশরীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো ৩৬ টি তারার একটা গুচ্ছ পর্যবেক্ষণ করেন যা আকাশে সমান ভাগে বৃত্তাকারে বিভক্ত ছিলো। রাত অতিবাহিত হওয়ার সময় এদের মধ্যকার ১৮ টির উপস্থিতি দেখে চিহ্নিত করা  সম্ভব। এদের তিনটা করে আবার দুই গোধূলির সময়ে দেখা যায় যখন অন্যান্য নক্ষত্রসমূহ দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। সমগ্র অন্ধকার সময়টা বাকি ১২ টি তারা দিয়ে চিহ্নিত করা  হয়।

পরবর্তি রাজত্বকালে (খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫০ থেকে ১০৭০) এই পরিমাপ পদ্ধতিকে ২৪ টি তারার একটি গুচ্ছে সহজতর করা  হয় যার ১২ টি রাত অতিবাহিত হওয়াকে চিহ্নিত করতো। জলযন্ত্র বা জলঘড়িও রাতের সময় সংরক্ষণ করার কাজে ব্যবহৃত হতো। সম্ভবত এটাই ছিল প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভুল গণনাযন্ত্র। খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ সালে কর্নাকের আম্মেন মন্দিরে টেবিল ঘড়ির একটি নমুনা পাওয়া গিয়েছিলো। এটি একটি পাত্রের আকারে ছিলো এবং ক্রমশ সরু হয়ে ভেতরের পৃষ্ঠতল পর্যন্ত গিয়ে পানির চাপকে কমিয়ে দিতো। সেখানে বিভিন্ন মাসে রাতকে ১২ টি ভাগে বিভক্ত করার করে ক্রমপর্যায়ে অঙ্কিত করা হয়েছিলো।

প্রাচীনকালের ব্যবহৃত জলঘড়ি

প্রাচীনকালের ব্যবহৃত জলঘড়ি

পরবর্তীতে আলো এবং অন্ধকার উভয়ের ঘন্টাগুলোকে একত্র করে ১২ টি ভাগে বিভক্ত করে ২৪ ঘন্টায় একদিনের ধারণা প্রতিষ্ঠিত করা হয় । ঘন্টার সুনির্দিষ্ট ধারণা হেলেনীয় যুগের আগে উদ্ভব হয়নি। হেলেনীয় যুগে গ্রিসের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তাঁদের তাত্ত্বিক গণনার জন্য নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের ঘন্টার পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করেছিলেন। হিপ্পারকাস (যিনি প্রথমিকভাবে ১৪৭ থেকে ১২৭ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত কাজ করেছেন)দিনরাত সমান হিসেবে ২৪ ঘন্টায় ভাগ করার প্রস্তাব করেছিলেন, যেখানে ১২ ঘন্টা দিবালোক এবং বাকি ১২ ঘন্টা অন্ধকারের জন্য রাখা হয়েছিলো। এটা মহাবিষুব দিনগুলো পর্যলোচনার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিলো। এই পরামর্শ থাকা সত্যেও চার্চের সদস্যরা বহু শতাব্দী পর্যন্ত ঋতু অনুযায়ী নানারকম ঘন্টা ব্যবহার করা অব্যাহত রেখে যাচ্ছিলেন।(১৪ শতকে ইউরোপে প্রথম যান্ত্রিক ঘড়ি আসার পর নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের ঘন্টার প্রচলন হয়)।

হিপ্পারকাস এবং অন্যান্য গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সেইসব জোতির্বিদ্যা কৌশল নিযুক্ত করেছিলেন যেগুলো পূর্বে মেসোপটেমিয়ায় বসবাসরত ব্যাবিলনীয়দের দ্বারা বিকাশ লাভ করেছিলো। ব্যাবিলনীয়রা ষষ্ঠিক (৬০ এর ভিত্তিতে) পদ্ধতিতে জ্যোতির্বিদ্যার গণনা পদ্ধতি তৈরী করেছিলেন যা তাঁরা উত্তরাধিকার সূত্রে সুমেরীদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। যদিও কেন ৬০ কেই নির্বাচন করা হয়েছিলো এটা এখন অজানা। তবে এটা ভগ্নাংশ প্রকাশের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে সুবিধাজনক।

যদিও এটা এখন আর গণনার কাজে ব্যবহৃত হয়না তবে ষষ্ঠিক ব্যবস্থায় এখনও কোণ, ভৌগলিক স্থানাঙ্ক এবং সময় পরিমাপে ব্যবহৃত হয়। বস্তুত একটি ঘড়ির বৃত্তাকার মুখ এবং একটি ভূগোলক উভয়েরই বিভাজন এখনও ব্যবিলনবাসীর ৪০০০ বছর আগেকার সাংখ্যিক পদ্ধতির কাছে ঋণী।

গ্রিক জ্যোতির্বিদ এরাটোসথেনিস (২৭৬ থেকে ১৯৪ খ্রিস্টপূর্ব) অক্ষাংশের একটি প্রাথমিক ভৌগলিক পদ্ধতি হিসেবে পৃথিবীর সুপরিচিত স্থানের মধ্য দিয়ে চলমান সমতল রেখা দিয়ে ৬০ ভাগে বিভক্ত একটি চক্র উদ্ভাবন করার উদ্দেশ্যে ষষ্ঠিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। এর এক শতাব্দী পর, হিপ্পারকাস অক্ষাংশের রেখাগুলোকে স্বাভাবিক করেন এবং এদের সমান্তরাল করে পৃথিবীর জ্যামিতির আয়ত্বে আনেন। এছাড়াও তিনি দ্রাঘিমাংশ রেখাকে ৩৬০ ডিগ্রীতে বেষ্টন করেন, যা মেরু থেকে মেরু এবং উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত ছিলো। আলমাজেস্ট গ্রন্থে(প্রায় ১৫০ খ্রিস্টাব্দ) কুডিয়াস টলেমি, হিপ্পারকাসের উদ্ভাবনের উপর ভিত্তি করে অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশকে ৩৬০ ডিগ্রীর ছোট খন্ডের উপবিভাগে বিভক্ত করার মাধ্যমে বিশ্লেষণ ও প্রসারিত করেন। প্রতি ডিগ্রীকে ৬০ টি অংশে ভাগ করার পর প্রতিটি অংশকে আবার ৬০ টি উপভাগের ছোট অংশে ভাগ করেন। প্রথম ভাগটি প্রথম মিনিট বা ‘মিনিট’ হিসেবে পরিচিত এবং দ্বিতীয় ভাগটি দ্বিতীয় মিনিট বা ‘সেকেন্ড’ হিসেবে পরিচিত হয়।

আলমাজেস্ট এর বহু শতাব্দী পরেও দৈনন্দিন গণনার কাজে মিনিট এবং সেকেন্ড ব্যবহার করা হয়নি। ঘড়ির ঘন্টাগুলো অর্ধেক, তৃতীয়াংশ, সিকি বা এক চতুর্থাংশ এমনকি কখনো কখনো ১২ অংশে বিভক্ত ছিলো কিন্তু কখনো ৬০ ভাগে বিভক্ত ছিলনা। বস্তুত ৬০ মিনিটের সময়কালের ঘন্টা প্রচলিতভাবে বোধগম্য ছিলোনা। ১৬ শতকের শেষ নাগাদ প্রথম যান্ত্রিক ঘড়ি প্রদর্শিত হওয়ার আগে সাধারণ জনগনের কাছে  মিনিটের সূক্ষতা বিবেচ্য ছিলো না। বর্তমানেও অনেক ঘড়ি এবং হাতঘড়ি শুধুমাত্র মিনিটে ভাগ করা রয়েছে, এতে সেকেন্ড দেখা যায়না।

প্রাচীন সভ্যতাগুলো সময়কে সংজ্ঞায়িত ও বিভাজন করে সংরক্ষিত করার জন্য ধন্যবাদ পাওনা রয়েছে। মূলত এদের জন্যই আধুনিক সমাজে এখনও ২৪ ঘন্টায় এক দিন, ৬০ মিনিটে এক ঘন্টা এবং ৬০ সেকেন্ডে এক মিনিট কল্পনা  করা যাচ্ছে। যদিও গণনা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে একককে সংজ্ঞায়িত করার পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়েছে। সেকেন্ডকে এক সময় জ্যোতির্বিদ্যার কাজে ছোট অংশে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলো, এসময় এককের আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে (এসআই) সেকেন্ডকে গড় সৌর দিনের একটি ভগ্নাংশ হিসেবে  সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিলো পরে এটি ক্রান্তীয় বছরের সাথে সম্পর্কিত হয়। ১৯৬৭ সালে সিজিয়াম পরমাণুর ৯,১৯২,৬৩১,৭৭০ টি কম্পনের সময়কালকে সেকেন্ডে হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে সেকেন্ডকে পুনরায় নির্ধারণ করা হয়। এই পুনঃবৈশিষ্ট্যপ্রদান পারমাণবিক গণনা এবং সমশ্রেণীভুক্ত সর্বজনীন সময় (UTC) যুগের সুচনা করে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, পারমাণবিক সময়ের সাথে জ্যোতির্বিদ্যাগত সময়ের সাথে মিল রাখার জন্য মাঝে মাঝে অবশ্যই অতিরিক্ত সেকেন্ড UTC-র সাথে যোগ করতে হবে। সুতরাং সব মিনিটই ৬০ সেকেন্ডে হয় না, ৬১ সেকেন্ডের কিছু বিরল মিনিট প্রায় আট দশক পর পর হয়ে থাকে।

-শফিকুল ইসলাম

Share.

মন্তব্য করুন