পদার্থবিদগণ তরল পানির দ্বিতীয় অবস্থা আবিষ্কার করেছেন

0

পানি পৃথিবীর অপরিহার্য বস্তুগুলোর মাঝে অন্যতম এবং মানুষের শরীরের প্রায় ৬০ ভাগই তৈরী করেছে এর মাধ্যমে। কিন্তু এখন পর্যন্তও এটি আমাদের ধারনার বাইরেই অদ্ভুত রয়ে গেছে।

গবেষগণ পানির ভৌত অবস্থার উপর অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছিলেন এমন সময় দেখলেন, যখন একে ৪০-৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয় এটি একটি ‘সমন্বয় তাপমত্রায়’ আঘাত করে। এবং এই সময় দুটি তরল অবস্থার মধ্যে পরির্তিত হতে দেখা যায়।

একটি রাসায়নিক যৌগ হিসেবে, পৃথিবীতে পানি অত্যাবশ্যকীয়। তবুও আমরা এর বৈধ অদ্ভূত অবস্থাকে অবমূল্যায়ন করে যাচ্ছি। কঠিন, তল এবং গ্যাসীয় এই তিনটি (খুব বিরল পরিস্থিতে প্লাসমার মতো অবস্থারও সৃষ্টি হয়) মৌলিক অবস্থাতেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, এর বাইরের কোন অবস্থাকে চিন্তা করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে বলা চলে।

বুধ গ্রহ বাদে, অন্যান্য তরলের চেয়ে পানির সবচেয়ে বেশি পৃষ্ঠ টান রয়েছে। এটাও পরিচিত পদার্থের মধ্যে অন্যতম একটি যা কঠিন অবস্থায় তার তরল অবস্থার মাঝে ভাসতে পারে। এবং অন্য সব পরিচিত পদার্থের সাথে অসদৃশ কারণ পানি যখন জমে যায় তখন এর আকার বৃদ্ধি পায়।

পানির একটি উদ্ভট স্ফুটনাঙ্ক অবস্থাও রয়েছে। যদিও অন্যান্য হাইড্রাইডগুলো স্ফুটনাঙ্ক অবস্থায় যেমন, হাইড্রোজেন টেলুরাইড এবং হাইড্রোজেন সালফাইড তাদের অণু হিসেবে হ্রাস পায় সেখানে H2O এর একটি আশ্চর্যজনক স্ফুটনাঙ্ক অবস্থা রয়েছে।

ফিলিপ বল নেচার সাময়িকী তে বলেন, “কেউ ই পানিকে সঠিক ভাবে চিনতে পারেনি এটা স্বীকার করাটা লজ্জাজনক। কিন্তু যে পদার্থটি আমাদের পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে এটা এখনও রহস্য হিসেবেই আছে। যতই এর দিকে তাকাচ্ছি ততই নতুন নতুন সমস্যার স্তুপ জমছে। নতুন প্রযুক্তিতে দেখা তরল পানির আণবিক কাঠামো আমাদের আরও এক গোলক ধাঁধাঁয় ফেলে দিচ্ছে।”

এখন পদার্থবিদগণ পানিকে ৪০-৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ এবং ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করার কোন এক পর্যায়ে দেখতে পারলেন তরল পানি তার অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে যা একদম নতুন একটি বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে। এই অবস্থাকে নির্ণয় করতে, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানী লরা মায়েষ্ট্রার নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক দল পানির নির্দিষ্ট বৈশিষ্টের অনুসন্ধান করছেন।

তাঁরা তাপ পরিবাহিতা, প্রতিসরাংক, পরিবাহিতা, পৃষ্ঠের টান এবং অন্তরক ধ্রুবকের মতো বিষয়গুলোর দিকে নজর দেন এবং একটি পদার্থের মধ্যে কিভাবে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র ছড়িয়ে পড়ে তা উপলব্ধি করেন। এবং সেই সাথে তারা ০ এবং ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উঠানাম করতে কেমন সাড়া প্রদান করে সেটাও লক্ষ্য করেন।

পানি একবার ৪০ ডিগ্রিতে পৌছুলে স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি শুরু হয় এবং ১০০ ডিগ্রি তাপমাত্রা পর্যন্ত এর বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হতে থাকে। প্রত্যেকটা বৈশিষ্টেরই সূত্রপাতের কিছু জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন ‘সমন্বয় তাপমাত্রা’ ছিল। আর গবেষণাটি এটাই ইঙ্গিত করছে যে, এর কারণ হচ্ছে তরল পানিটির একটি ভিন্ন দশা সে সময় জাগ্রত ছিল।

দলটি এই সমন্বয় তাপমাত্রার কয়েকটি তালিকা প্রস্তুত করেছেন। যেখানে প্রায় ৬৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপ পরিবাহিতার জন্য, প্রতিসরাঙ্কের জন্য ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াস, ৫৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস পরিবাহিতার জন্য এবং ৫৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস পৃষ্ট টানের জন্য।

তাঁরা উপসংহারে বলেন, “এই ফলাফল নিশ্চিত করেছে যে, ০-১০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার সীমার মধ্যে ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের কাছাকাছি সময়ে তরল পানিতে সমন্বয় তাপমাত্রার উপস্থিতি থাকে।”

তাহলে এই অবস্থায় কি হচ্ছে? এটা এখনও পরিষ্কার নয় তবে সত্যিটা হচ্ছে, পানি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় তরলের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থায় পরিবর্তিত হয়।

পানির অণু একে অপরের সাথে শুধুমাত্র স্বল্পস্থায়ী যোগাযোগ রক্ষা করে থাকে। এবং এই হাইড্রোজেনের বন্ধন আসলে অণুর ভেতর থাকা হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের পরমাণুর সাথে সম্পৃক্ত বন্ধনের চেয়ে দূর্বল। এই কারণেই হাইড্রোজেনের বন্ধন যা পানির অণুর সাথে একত্রে সম্পৃক্ত থাকে তা ক্রমাগত ভাঙ্গতে ও পুনরায় গঠিত হতে থাকে।

বল নেচারে লিখেছেন, “একটা বিষয়ে সবাই একমত যে পানির আণবিক কাঠামো অন্যান্য তরল থেকে আলাদা। দ্রুতগামী হাইড্রোজেনের দূর্বল বন্ধন। এই দূর্বল বন্ধন যা অণুর ক্রমাগত ভগ্নতা এবং পানির গলনাংক পর্যায়ের সাথে সংযুক্ত এবং এখানকার আণবিক বিশৃংখলায় একটি মাত্রা প্রদান করে। আর এখানেই ঐক্যমত শেষ হয়।”

মায়েষ্ট্রা এবং তাঁর দলের ফলাফল অন্য একটি স্বাধীন দল দ্বারা প্রতিলিপি হওয়ার প্রয়োজন হবে। তারও আগে আমাদের পাঠ্যবইয়ে নতুন করে পানির চারটি (অথবা সাড়ে তিনটি) অবস্থার উপস্থিতির কথা পুনরায় লিখতে পারি। তাঁরা বলছেন তাঁদের আবিষ্কার ন্যানো এবং জৈব পদ্ধতি বোঝার ক্ষেত্রে বড় ধরণের পরিবর্তন আনবে।

-শফিকুল ইসলাম

Share.

মন্তব্য করুন