Top header

ফুটবল খেলার বিজ্ঞান

0

প্রকৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের সৌন্দর্য। হাঁটাচলা, কথা বলা, খেলাধুলা সব কিছুর মাঝেই বিজ্ঞানের দেখা পাওয়া যায়। এসব খুঁজে নিতে শুধু দরকার একটি পর্যবেক্ষণ সম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। আজকে আমরা ফুটবল খেলায় বিজ্ঞানের উপস্থিতি খুঁজে দেখবো।

পদার্থবিজ্ঞানের সঞ্চারপথ

খেলোয়াড় যখন দূর থেকে ফুটবলকে কিক করে কারো কাছে পাস করে বা গোলপোস্ট লক্ষ্য করে ছুড়ে মারে তখন নিজের অজান্তেই পদার্থবিজ্ঞানের চর্চা করে নেয়। এমন অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কীভাবে কিক করলে বলকে বেশি দূরে নিয়ে ফেলা যাবে। কোন কৌশল ব্যবহার করলে কম শক্তি ব্যয় করেও বলকে বেশি দূরে নিয়ে বল ফেলা যাবে?

কেউ বেশি দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য বেশি জোরে লাথি দিতে পারে। জোর হবে যত বেশি বল যাবে তত দূর। কিন্তু যেখানে গতি বা উড়ার ক্ষেত্রে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম কাজ করে সেখানে শুধুমাত্র জোরের উপর নির্ভর করে থাকলে হবে না, কৌশলের কথাও ভাবতে হবে।

পৃথিবীর অভিকর্ষ বল প্রতিটি বস্তুকে প্রতিনিয়ত আকর্ষণ করে চলছে। ফুটবলের ক্ষেত্রেও সেটা প্রযোজ্য। কেউ যদি সোজা সামনের দিক বরাবর জোরে লাথি মেরে বসে তাহলে সেটা অভিকর্ষ বলের প্রভাবে নীচে নেমে আসবে কিছুক্ষণ পরেই। শূন্যে বেশিক্ষণ থাকবে না। শূন্যে বেশিক্ষণ না থাকলে দূরত্বও অতিক্রম হবে কম। ফলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য মিস হয়ে যেতে পারে অথবা গড়িয়ে গড়িয়ে যাবার সময় প্রতিপক্ষের কাছে চলে যেতে পারে। একজন খেলোয়াড় অবশ্যই চাইবে বলটা যেন প্রতিপক্ষের কাছে চলে না যায়।

খেলোয়াড় যদি মনে করে, ফিজিক্স যেহেতু অভিকর্ষের কথা বলছে তাই নীচের দিক দিয়ে আর বল ছুড়ব না। উপরের দিকে ছুড়ব যেন বলটি দ্রুত নীচে আসতে না পারে। বেশি সময় শূন্যে থাকলেই তো বেশি দূরে যাবে! খেলোয়াড় যদি এই পন্থা অবলম্বন করে তাহলেও ভুল হবে। বরঞ্চ আগের চেয়েও আরো খারাপ হতে পারে। বলকে যদি উপরের দিকে ছুড়ে মারা হয় তাহলে সেটি বেশিক্ষণ সময় শূন্যে থাকবে ঠিকই কিন্তু বেশি দূরে না গিয়ে কাছাকাছি কোনো স্থানে পড়ে যাবে।

Source: howstuffworks.com

Source: howstuffworks.com

দুটো পন্থাই মাঠে মারা গেল। এক্ষেত্রে এমন কিছু করা দরকার যেন বলটা শূন্যে বেশি সময় থাকার পাশাপাশি দূরত্বও অতিক্রম করে বেশি। গাণিতিকভাবে সেটা খুব কঠিন কিছু নয়। এমন একটা কৌণিক অবস্থান বেছে নিতে হবে যেন তা সোজা সমান্তরাল ও সোজা উপরের দিকের মাঝ বরাবর অবস্থান করে। মাঝ বরাবর কৌণিক অবস্থান কোনটা হবে? সোজা সমান্তরালকে শূন্য ডিগ্রী আর সোজা উপরের দিককে ৯০  ডিগ্রী ধরলে শূন্য ও ৯০ ডিগ্রীর মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে ৪৫ ডিগ্রী। যে খেলোয়াড় যত কৌশলে ৪৫ ডিগ্রীর কাছাকাছি কোণে বল ছুড়ে মারতে পারবে সে খেলোয়াড় তত দূরত্ব অতিক্রম করাতে পারবে। এর বেশি হলে অভিকর্ষের টান পড়বে বেশি, আর কম হলে উচ্চতার টান পরবে বেশি।

তবে খেলোয়াড় তো আর কম্পাস, স্কেল আর চাঁদা নিয়ে খেলতে নামে না যে মেপে মেপে বল ছুড়বে। এদিক সেদিক হতেই পারে। সেক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে মোটামুটি মাঝে রাখতে হবে। ৩০ ডিগ্রী ও ৬০ ডিগ্রীর ভেতরে রাখলে তা স্বাভাবিকভাবে উত্তীর্ণ হয়ে যায়। আর সবসময় তো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করাতে হয় না। তার উপর সামান্য এদিক সেদিক হলেও তো কোনো সমস্যা নেই। সবকিছু মাপমতো হতে হবে এমনও কোনো কথা নেই, এর মাঝে থাকা পদার্থবিজ্ঞানের সঞ্চারপথ সম্বন্ধে খেয়াল রাখা এবং তার সৌন্দর্য উপভোগ করাও অনেক কিছু। পদার্থবিজ্ঞানের ঠিক এই কৌশলটাই প্রচুর ব্যবহার করা হয় কামান থেকে গুলি নিক্ষেপ আর প্রতিপক্ষকে মিসাইল ছোড়ার সময়।

রহস্যময় রাসায়নিক এড্রেনালিন

একটি বিষয় হয়তো সকলেই লক্ষ্য করে থাকবেন, শুকনো মাঠেই হোক আর গঞ্জের কাদাময় মাঠেই হোক, এই খেলায় খেলোয়াড়রা ছোট বড় প্রচুর ব্যথা পায়। কিন্তু হাজার আছার-আঘাত-ব্যথা লাগার পরেও স্বাভাবিকভাবে কোনো অসুস্থতার চিহ্ন ছাড়াই দিব্যি খেলে যেতে দেখা যায় খেলোয়াড়কে। এমন ব্যথা পাবার পরেও কীভাবে খেলে যায়? খেলা চলাকালীন সময়ে ব্যথাটা তেমন অনুভূত হয় না কেন?

Source: Shutterstock

Source: Shutterstock

অথচ এরকম আঘাত যদি অন্য কোনো সময় পায় তাহলে ওষুধ দিয়ে ভরে ফেললেও ব্যথার যন্ত্রণায় থাকা যায় না। ফুটবল খেলায় ব্যথাগুলো তেমন অনুভূত হয় না কারণ এর পেছনে আছে এড্রেনালিন নামে একধরনের রাসায়নিক পদার্থের কারসাজি। উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে এই রাসায়নিক পদার্থটি নিঃসরিত হয়। এটি তরল ও রসীয়। এড্রেনালিন রস খেলোয়াড়ের ব্যথাকে ভুলিয়ে রেখে মূল কাজে অধিক মনোযোগী হতে সাহায্য করে। এর প্রভাব এতই শক্তিশালী যে কোনো কোনো খেলায় দেখা গেছে বেকায়দায় পড়ে হাতের হাড় জোরা বা অস্থি-সন্ধি থেকে ছুটে যাবার পরও খেলোয়াড় খেলা চালিয়ে যাচ্ছে দিব্যি। এটা সম্ভব হয় এড্রেনালিনের শক্তিশালী প্রভাবের ফলে।

পরবর্তীতে উত্তেজনাকর খেলা যখন শেষ হয়ে যায়, খেলোয়াড় যখন ধীরে ধীরে উত্তেজনা কাটিয়ে স্বাভাবিক হয়ে যায় তখন দেহে এড্রেনালিনও ধীরে ধীরে কমে যায়। এটি কমে গেলে আঘাত পাওয়া স্থান হতে অধিক হারে ব্যথার সংকেত পৌছুতে থাকে মস্তিষ্কে। এজন্যই খেলা শেষ হবার পর রাতের বেলা ব্যথাগুলো চাগিয়ে উঠে!

কাদা লাগা পায়ে ব্যথা নিয়ে রাত কাটিয়ে পরের দিন আবারো সেই ফুটবল খেলাতেই নেমে যায়। জসীম উদ্‌দীনের কবিতার চরিত্রের মতো। পরের দিনই শত ব্যথা ভুলে খালায় নেমে যায় এই এড্রেনালিনেরই প্রভাবে। জসীম উদ্‌দীনের ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ কবিতাটা এতটাই মজার যে এখানে উল্লেখ না করে থাকতে পারছি না।

ফুটবল খেলোয়াড়
– জসীম উদ্‌দীন

আমাদের মেসে ইমদাদ হক ফুটবল খেলোয়াড়,
হাতে পায়ে মুখে শত আঘাতের ক্ষতে খ্যাতি লেখা তার।
সন্ধ্যা বেলায় দেখিবে তাহারে পটি বাঁধি পায়ে হাতে,
মালিশ মাখিছে প্রতি গিঠে গিঠে কাত হয়ে বিছানাতে।
মেসের চাকর হয় লবেজান সেঁক দিতে ভাঙ্গা হাড়ে,
সারা রাত শুধু ছটফট করে কেঁদে কেঁদে ডাক ছাড়ে।
আমরা তো ভাবি ছমাসের তরে পঙ্গু সে হল হায়,
ফুটবল-টিমে বল লয়ে কভু দেখিতে পাব না তায়।

প্রভাত বেলায় খবর লইতে ছুটে যাই তার ঘরে,
বিছানা তাহার শূন্য পড়িয়া ভাঙা খাটিয়ার পরে।
টেবিলের পরে ছোট বড় যত মালিশের শিশিগুলি,
উপহাস যেন করিতেছে মোরে ছিপি- পরা দাঁত তুলি।
সন্ধ্যা বেলায় খেলার মাঠেতে চেয়ে দেখি বিস্ময়ে,
মোদের মেসের ইমদাদ হক আগে ছোটে বল লয়ে!
বাপ পায়ে বল ড্রিবলিং করে ডান পায়ে মারে ঠেলা,
ভাঙা কয়খানা হাতে পায়ে তার বজ্র করিছে খেলা।
চালাও চালাও আরও আগে যাও বাতাসের মত ধাও,
মারো জোরে মারো- গোলের ভেতরে বলেরে ছুঁড়িয়া দাও।
গোল-গোল-গোল, চারিদিক হতে ওঠে কোলাহলকল,
জীবনের পণ, মরণের পণ, সব বাঁধা, পায়ে দল।
গোল-গোল-গোল-মোদের মেসের ইমদাদ হক কাজি,
ভাঙা দুটি পায়ে জয়ের ভাগ্য লুটিয়া আনিল আজি।
দর্শকদল ফিরিয়া চলেছে মহা-কলবর করে,
ইমদাদ হক খোড়াতে খোড়াতে আসে যে মেসের ঘরে।
মেসের চাকর হয়রান হয় পায়েতে মালিশ মাখি,
বে-ঘুম রাত্র কেটে যায় তার চীৎকার করি ডাকি।
সকালে সকালে দৈনিক খুলি মহা-আনন্দে পড়ে,
ইমদাদ হক কাল যা খেলেছে কমই তা নজরে পড়ে।

এড্রেনালিনের প্রভাবেই পরীক্ষার আগের দিন বা আগের মুহূর্তে খুব ভয় লাগলেও পরীক্ষা কেন্দ্রে ভয়টা দূর হয়ে যায়। অপারেশন করার আগে রোগী ভয় পেলেও হাসপাতা গেলে স্বাভাবিক ভাবেই সব মেনে নেয়।

শুধু কি এগুলোই? ফুটবল খেলার কানায় কানায় ছড়িয়ে আছে বিজ্ঞান। আছে নিউটনের তিনটি সূত্র, আছে জ্যামিতি, আছে ভেক্টর, পিথাগোরাসের সূত্র, আছে ঘূর্ণন গতির সূত্র, ভরকেন্দ্র-অভিকর্ষের সূত্র সহ আরো অনেক। এই সৌন্দর্য দেখতে হলে দরকার একটি পর্যবেক্ষণ সম্পন্ন সুন্দর চোখ।

তথ্যসূত্র

  1. Science of the NFL Football, http://www.nbclearn.com/nfl
  2. How the Physics of Football Works, How Stuff Works, http://entertainment.howstuffworks.com/physics-of-football1.htm
  3. The Physics of Football, Physics Buzz, http://physicsbuzz.physicscentral.com/2010/11/physics-of-football.html
  4. Football physics, Khan Academy, https://www.khanacademy.org/partner-content/49ers-steam/science-behind-the-game/force-and-motion/a/football-physics
  5. The Physics of Football, e-Current,  http://blogs.fit.edu/blog/uncategorized/the-physics-of-football/#.UlHTpFAwpa0

-সিরাজাম মুনির শ্রাবন
সহ-সম্পাদক, বিজ্ঞান ব্লগ
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

Share.

মন্তব্য করুন