কোয়ান্টাম ফিজিক্স -১৬ : আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া

1

[বইটির সূচীপত্র এবং সব খন্ডের লিংক একত্রে দেখুন এখানে]

৪র্থ পর্বে আমরা দেখেছিলাম আলো ও বিদ্যুৎকে একীভূত করলেন ম্যাক্সওয়েল। এজন্য তিনি গণিতের নিলেন আশ্রয়। জন্ম হলো তড়িচ্চুম্বকীয় তরেঙ্গর। কিন্তু সেটা বাস্তবে আভিষ্কার করে দেখানোর বাকি ছিল। সেটিই তড়িচুম্বকীয় তরঙ্গ আবিষ্কার করলেন জার্মান বিজ্ঞানী হেররিখ হার্জ। বিশেষ করে ছোট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে বিদ্যুৎচম্বকীয় তরঙ্গের হদিস মিলল হার্জের গবেষণাগারেই। আগের অধ্যায় আমরা দেখেছিলাম, ক্যাথোড টিউব নিয়ে কাজ করেছিলেন হার্জ। তিনি ক্যাথোড রশ্মিকে তিনি আলোক তরঙ্গই মনে করতেন। কথোড রশ্মিকে মানতেই পারেনি কণা হিসেবে। সেই হার্জই  আলোক তড়িৎক্রিয়ার প্রথম পর্যবেক্ষক বলে মনে করেন অধিকাংশ পন্ডিত।

হার্জই প্রথম নন। আলোক তড়িৎ ক্রিয়া প্রথম লক্ষ করেন বিট্রিশ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার উইলাফবি স্মিথ (Willoughby Smith)। পেশায় তিনি টেলিফোন অপারেটের। তাঁর দায়িত্ব ছিল ট্রান্স আটলাণ্টিক টেলিফোন ক্যাবলের রোধ পরীক্ষা করা। এজন্য তিনি রোধক পরিমাপের একটা যন্ত্র ব্যবহার করতেন। স্মিথ তাঁর যন্ত্রে ব্যবহার করেন সেলিনিয়াম রোধক। একদিন তিনি অবাক হয়ে একটা বিষয় লক্ষ করলেন। বৈদুতিক রোধকের নতুন এক ধর্ম। আগে কেউ জানতেন না এ ব্যাপারটা। সেলিনিয়াম রোধকের উপর সূর্যের আলো পড়লে বেড়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ প্রবাহ। অর্থাৎ কমে যাচ্ছে রোধকের মান। অনেক ভাবতে পারেন, সূর্যের তাপের কারণে এমনটা হচ্ছে। তড়িৎগতিবিদ্যা কিন্তু উল্টো কথা বলে, তাপ বাড়লে বেড়ে যায় রোধেকের রোধকত্ব। ফলে বিঘ্ন ঘটে স্বাভাবিক তড়িৎ প্রবাহে। তাহলে স্মিথের এ ঘটনার ব্যাখ্যা কী? তাপ এখানে মূল ফ্যাক্টর নয়। মূল ফ্যাক্টর আলো। কিন্তু কেন, কীভাবে এই ঘটনা ঘটছে সে ব্যাখ্যা ছিল না স্মিথের কাছে। স্মিথের এই ঘটনা কিন্তু ১৮৭৩ সালে। এরপর দ্বিতীয়বার এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন হেররিখ হার্জ। তবে স্মিথের পর্যবেক্ষণ থেকে হার্জের পর্যবেক্ষণ একেবারে আলাদা।

আলোক তড়িৎ ক্রিয়া প্রথম লক্ষ উইলাফবি স্মিথ

আলোক তড়িৎ ক্রিয়া প্রথম লক্ষ উইলাফবি স্মিথ

১৮৮৭ সাল। হার্জ একটা যন্ত্রের সাহায্যে সর্বপ্রথম বেতার তরঙ্গ শনাক্ত করেন। হার্জের যন্ত্রটি ছিল আসলে একটা বায়ুশূন্য ক্যাথোড টিউব। ক্যাথোড টিউবের ভেতরে একদিন এক স্কুলিঙ্গ দেখতে পান হার্জ। সেটা যে কি তা হার্জের জানা ছিল না। আগের অধ্যায়েই আমরা দেখেছি, ক্যাথোড রশ্মিকে কণা হিসেবে মানতে নারাজ ছিলেন হার্জ। হার্জের পরীক্ষায় ক্যাথোড নল ছিল। ক্যাথোড টিউবের ক্যাথোড দন্ডে অতি বেগুনি রশ্মি দিয়ে আঘাত করেছিলেন তিনি। এর ফলেই আলোর ঝলকানি দেখা দেয়। হ্যাঁ। এটাও ছিল ফটো-তড়িৎ ক্রিয়া। মানে স্ফুলিঙ্গটা আসলে ইরেক্ট্রনের ঝলকানি। এ ঘটনার ব্যাখ্যা ছিল না হার্জের কাছে। তাছাড়া তিনি ক্যাথোড টিউবের ভেতরে ক্যাথোড রশ্মি নিয়ে ধন্ধে ছিলেন। আগের অধ্যায়েই আমরা দেখেছি, ক্যাথোড রশ্মিকে ইলেক্টন কণার স্রোত বলে মানতে রাজি ছিলেন না হার্জ। সুতরাং ক্যাথোর্ড রশ্মিতে অতি বেগুনি রশ্মির আঘাতের ফলে ইলেক্ট্রন নির্গত হতে পারে, এ চিন্তা তাঁর মাথায় আসেনি। আসার কথাও নয়।

উইলহেম হলওয়াকস

উইলহেম হলওয়াকস

হার্জের ঘটনাটা ১৮৮৭ সালের। পরের বছর আরেকটু এগুলো আলোক তড়িৎ-ক্রিয়ার পরীক্ষা। এবারের পর্যবেক্ষক, জার্মান বিজ্ঞানী উইলহেম হলওয়াকস। তিনি দেখলেন আরেক আশ্চর্য ঘটনা। হার্জ যে আলোর ঝলকানি দেখেছিলেন তার একটা ধর্মের হদিস পেলেন হলওয়াক। তিনি দেখলেন, ক্যাথোডের ওপর অতি বেগুনি রশ্মি দিয়ে আঘাত করলে ক্যাথোড দ্রুত চার্জ হারিয়ে ফেলে অর্থাৎ ক্যাথোডের ধনাত্মক চার্জ দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যায়। যতক্ষণ ক্যাথোডে চার্জ থাকে ততক্ষণ আলোর ঝলকানি দেখা যায়। কিন্তু অ্যানোডের ওপর বেগুনি রশ্মি দিয়ে আঘাত করলে কোনো ঘটনা ঘটেনা। অর্থাৎ আন্যোডের ধনাত্মক চার্জের কোনো নড়চড় হয় না। এই ঘটনা থেকে কিছু সিদ্ধান্তে আসা যায়। দেখা যায়। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেনি ঝলকানিটা তো অতি বেগুনি রশ্মিও হতে পারে। হ্যাঁ, মনে হতেই পারে। তবে সেটা ভুল ধারণা। অতিবেগুনি রশ্মি খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু সে ঝলকানিটা দেখা যায় সেটা দৃশ্যমান আলোর।

যে ঝলকানি ক্যাথোড রশ্মি থেকে নির্গত হয়, তা নিশ্চয়ই ঋণাত্মক চার্জে চার্জিত। তা না হলে ক্যাথোড দ্রুত চার্জহীন হয়ে পড়ে কেন? আসলে ক্যাথোডের ঋণাত্মক চার্জই বেরিয়ে যায় আলোর ঝলকানির রূপে।

পাঠক, কিছু অনুমান করতে পারছেন? আগের অধ্যায়টির কথা ভাবুন তো। ক্যাথোড নলের ভেতর আমরা এমনই এক আলোর ¯্রােত দেখেছিলাম। সেই স্রোত ছিল ঋণাত্মক চার্জবাহী। পরে থামসন দেখালেন, সেই স্রোত আসলে ইলেক্ট্রন কণিকার স্রোত। ইলেক্টন ঋণাত্মক চার্জ বহন করে। থমসনের আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা ভাবতে শুরু করলেন, ক্যাথোড নলের ওপর অতি বেগুনি রশ্মির আঘাতের কারণেই সে ঝলকানি দেখা যাচ্ছে, সেটা কি ক্যাথোড রশ্মির মতোই ইলেক্টন কণার ঝলকানি। তাহলে পরীক্ষা করে দেখতে হয় ব্যাপারটা। এই পরীক্ষায় নামলেন স্বয়ং থমসন। ১৮৯৯ সালে। সত্যিই তিনি দেখলেন ক্যাথোড দন্ডে অতিবেগুনি রশ্মি আপতিত হলে ইলেক্ট্রন নির্গত হয়। ১৯০২ সালে ফিলিপ লেনার্ড আলোক-তড়িৎক্রিয়ার পরীক্ষাটি আরো ভালোভাবে করেন। থমসন ও লেনার্ডের পরীক্ষার ধরন একই। এখন আমরা দেখে নেব পরীক্ষাটি আসলে কেমন?

ফটো-তড়িৎ ক্রিয়ার পরীক্ষা

ফটো-তড়িৎ ক্রিয়ার পরীক্ষা

এই পরীক্ষায় একটা বায়ুশূন্য কাচের টিউব নিতে হয়। টিউবের সাথে আটকানো থাকে দুটো ধাতব দন্ড। সত্যি বলতে, আগের অধ্যায়ের ক্যাথোড টিউবই ব্যবহার হয় এই পরীক্ষায়। ধাতব দন্ডের একটা ক্যাথোড আরেকটা অ্যানোড হিসেবে কাজ করে। একটা ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্ত যুক্ত করা হয় টিউবের অ্যানোড দ-ের সাথে। আর ঋণাত্মক প্রান্ত যুক্ত হয় ক্যাথোডের সাথে। সাথে থাকে একটা গ্যালভানোমিটার। অ্যানোড আর ক্যাথোডের মধ্যে তড়িৎ প্রবাহ তৈরি হলে গ্যালভানোমিটরের কাঁটা সেটার সংকেত দেবে। বাইরের কোনও উৎস থেকে অতিবেগুনি রশ্মির ঝাঁক নিক্ষেপ করা হয় ক্যাথোড দন্ডের ওপর। দেখা যায়, গ্যালভানোমিটার কাঁটায় বিক্ষেপ দিচ্ছে। অর্থাৎ ক্যাথোড দন্ড থেকে ধনাত্মক চার্জ প্রবাহিত হচ্ছে অ্যানোডের দিকে। থমসন ও লেনার্ড বললেন, ধনাত্মক চার্জের প্রবাহ আসলে ইলেক্ট্রনের প্রবাহ। এই পরীক্ষা থেকে আলোক তড়িৎ ক্রিয়ার কিছু বৈশিষ্ট্য ও বেরিয়ে আসে। যেকোনো কম্পাঙ্কের আলো আঘাত করলেই ক্যাথোড থেকে ইলেক্টন নির্গত হয় না। তারমানে সব রংয়ের আলো আলোক তড়িৎ ক্রিয়া ঘটাতে পারে না। এর জন্য একটা নূন্যতম কম্পাঙ্কের আলোক রশ্মির দরকার হয়। এটাই হলো সূচন কম্পাঙ্ক। সূচন কম্পাঙ্ক কিন্তু সব পদার্থের ক্ষেত্রে এক নয়। ক্যাথোড দন্ডে কী ধাতু ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে এই কম্পাঙ্ক। কোনো ধাতু হয়তো অতি বেগুনি রশ্মিতেই ইলেক্ট্রন নির্গত করে। কোনো কোনো ধাতুর জন্য হয়তো নূন্যতম গামা রশ্মির দরকার হবে। কোনো কোনো ধাতুর জন্য X- রশ্মির কম্পাঙ্কই সূচন কম্পাঙ্ক।

ফিলিপ লেনার্ড

ফিলিপ লেনার্ড

সূচন কম্পাঙ্কের চেয়ে বেশি কম্পাঙ্কের যেকোনো আলোই ফটো তড়িৎ ক্রিয়া ঘটতে পারে। কম্পাঙ্ক মত বেশি হবে, ধাতু থেকে নির্গত ইলেক্ট্রনের বেগ ততো বেশি হবে। বেশি কম্পাঙ্কের আলোর শক্তিও বেশি। তাই তার আঘাতের জোরও অনেক বেশি। সুতরাং কম্পাঙ্ক বেশি হলেই ইলেক্ট্রন ততো বেশি বেগে ছুটে বেরিয়ে যেতে পারে। আলোর তীব্রতা (উজ্জ্বলতা) বেশি হবে যত, তত বেশি হারে ধাতু থেকে নির্গত হবে ইলেক্ট্রন। এখানে আরেকটা কথা বলে রাখা জরুরি, আলোক তড়িৎক্রিয়া একেবারে তাৎক্ষণিক ঘটনা। ধাতুর ওপর আলো ফেলার সাথে সাথে ইলেক্ট্রন নিঃস্বরণ করবে। এক মুহূর্ত মাত্র সময় নেয়। থমসন ও লেনার্ডের পরীক্ষার ফল সবাই মেনে নিলেন। ইলেকট্রন কণার অস্তিত্ব নিয়ে যাদের মনে ধোঁয়াসা ছিল, নিশ্চিত হলেন তাঁরাও।

কিন্তু সমস্যা একটা দেখা দিল। আলোক-তড়িৎ ক্রিয়ার গাণিতিক ব্যাখ্যা কী? নিটনের গতিতত্ত্বের পক্ষে এর ব্যাখ্যা দেওয়া একেবারেই অসম্ভব। ম্যাক্সওয়েল তড়িচুম্বকীয় তত্ত্ব ও এর ব্যাখ্যা দিতে পারে না। তাহলে?

তখনো পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা আলোকে শুধুই তরঙ্গই ভাবতেন। কণাতত্ত্ব বহু আগেই বাতিল হয়ে গেছে। তাছাড়া আলোক তড়িৎ ক্রিয়া আলোর কম্পাঙ্কের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। সুতরাং আলোক-তড়িৎ ক্রিয়ার ব্যাখ্যা তরঙ্গ-তত্ত্বের ভেতরেই খুঁজতে হবে। মুশকিল হলো, তরঙ্গের পক্ষে কীভাবে সম্ভব একটা কণাকে ধাতুর ভেতর থেকে আলাদা করা?

লাল আলোর পক্ষে সম্ভব নয় ধাতু থেকে ইলেক্ট্রন বের করা। সম্ভব নয় দৃশ্যমান কোনো আলোর পক্ষেই। কখনো-সখনো দৃশ্যমান অতি বেগুনি রশ্মির আঘাতে ইলেক্ট্রন বেরিয়ে আসে বটে, কিন্তু সেসব ইলেক্টনের গতি খুবই কম। দেখা যায়। যে ধাতু থেকে ওই ইলেক্ট্রন নির্গত হয়েছে, তাতে ইলেক্ট্রনগুলো বেশ ঢিলেঢালাভাবে অবস্থান করছিল। কিন্তু আলোর কম্পাঙ্ক বাড়ালে অর্থাৎ অতি বেগুনি রশ্মির চেয়েও বেশি কম্পাঙ্কের আলোর আলো ব্যবহার করলে নিঃসৃত ইলেক্টনের বেগ অনেক বেশি হয়। আবার কতগুলো ইলেক্টন একবারে বের হয় সেটা নির্ভর করে আলোর তীব্রতা বা উজ্জ্বলতার ওপর। এই বিষয়গুলো নিয়ে লেনার্ড ও থমসন অনেক ভাবলেন। ব্যাখ্যা দাঁড় করারও চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোনো সমাধান বেরুলো না।

[বইটির সূচীপত্র এবং সব খন্ডের লিংক একত্রে দেখুন এখানে]

-আব্দুল গাফফার রনি
বিজ্ঞান লেখক
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

Share.

1 Comment

মন্তব্য করুন