‘ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের’ জিন আবিষ্কারের দাবী

1

একটি নরম ব্রাশ যা থেকে কাটার মতো খোঁচা অনুভূত হয়। আবার একটি স্পন্দিত সুরশলাকা যা কোন কম্পনের সৃষ্টি শরীরের জোড়াগুলো কোনদিকে নড়াচড়া করছে সেটা না দেখে বলতে পারছেন। গবেষকের কাছে এরকম অদ্ভুত অনুভূতির কিছু অংশ বর্ণনা করছিলেন ৯ বছর বয়সী মেয় এবং ১৯ বছর বয়সী নারী।

গবেষকগণ বলেন, এই দুজন যে অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেছেন তা অত্যন্ত বিরল একটি জেনেটিক পরিবর্তনের ফলে ঘটতে পারে। যা কথিত ‘ষষ্ঠ ঈন্দ্রিয়’ নামে মানুষের যে উপলব্ধি রয়েছে তার উপর আলোকপাত করতে পারে। এমনকি এই গবেষণার মাধ্যমে হয়তো আমরা জানতে পারবো কেন কিছু কিছু মানুষ অন্য সকলের থেকে আলাদা অনুভূতি প্রকাশ করে থাকে।

রোগীদের যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতির কোন নাম নেই। যা মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল হেলথ ইনস্টিটিউট (NIH) পেডিয়াট্রিক নিউরোলজিস্ট বনম্যান কারস্টেন এক গবেষণায় আবিষ্কার করেছেন। তিনি তরুণদের অজানা জেনেটিক রোগ নির্ণয়ের জন্য বিশেষভাবে পারদর্শী। তিনি লক্ষ্য করেন যে, অংশগ্রহণকারী দুজন তাদের নিতম্ব, আঙ্গুল এবং পা সহ শারীরের মাধ্যমে কিছু উপসর্গ প্রকাশ করেছে যার কোণগুলো অস্বাভাবিক আকারে বাঁকানো। এমনকি তাদের স্কলিয়োসিস বা মেরুদন্ডে একটি অস্বাভাবিক রকমের বক্রতাও ছিল। এবং তাদের চলাফেরার মাঝে উল্যেখযোগ্য রকমের অসুবিধা দৃশ্যমাণ ছিলো। যার মাধ্যমেই বোঝা গেলো তারা শারীরিকভাবে তাদের ত্বকের বিরুদ্ধে কোন বস্তু প্রদত্ত সাড়া প্রদান করতে ব্যার্থ হচ্ছে।

উভয়ের জিনোমগুলোর পরিবর্তনে কোন মিল আছে কিনা তা দেখার জন্য বনম্যান তাদের জিনোমের উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। আর এর মাঝে একটি বিশেষ দিক উঠে আসে। PIEZO2 নামে একটি জিনের আকস্মিক পরিবর্তন ঘটে। এই জিনটি শারীরিক চেতনার সাথে সংযুক্ত রয়েছে এবং স্পর্শের মাধ্যমে সমন্বিত সঞ্চালান ক্ষমতাও বিদ্যমান রয়েছে। এই গবেষণা চলাকালীন সময়ে সৌভাগ্যবশত বনম্যান NIH এর আরেকজন নিউরোলজিস্ট আলেকজ্যান্ডার চেসলারের PIEZO2 এর উপর একটি বকতৃতায় উপস্থিত হন।  তাঁকে তাঁর সদ্যপ্রাপ্ত রোগীদের নিয়ে গবেষণায় সাহায্য করার জন্য আমন্ত্রণ জানান।

রোগীদের সাথে যখন চেসলারের সাক্ষাত হয় তখন এই রোগের অসাধারণত্বের জন্য তিনি বিস্মিত হননি। বিস্মিত হওয়ার কারণ ছিলো পূর্বে বিজ্ঞানীগণ PIEZO2 কে মাউস মডেলগুলোতে পেয়েছিলেন,আর এটা সবসময়ই মারাত্মক প্রমাণীত ছিল। সর্বাধিক অধিকৃত মানুষই এটা ছাড়া বাঁচতে পারেনা।

গবেষকগণ রোগীদের এবং একটি নিয়ন্ত্রিত দলের সমন্বয়ে কিছু পরীক্ষা পরিচালনা করেন। যখন রোগীদেরকে চোখ বাধা অবস্থায় হাঁটতে দেয়া হলো তারা টাল খেতে শুরু করলেন, নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন এবং একসময় পরে গেলেন। যখন চোখের বাধন খুলে দেয়া হলো তখন স্বাভাবিক ভাবেই হাটাচলা করতে পারলেন। রোগীগন আরো একটা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। যেখানে তাদের সামনে থাকা একটি লক্ষ্যবস্তুকে নাক বরাবর তর্জনীর সাহায্যে নির্দেশ করতে বলা হয়েছিলো। চোখ বাধা অবস্থায় তারা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলেন। চোখ খোলা অবস্থায় তা সঠিক ভাবেই করতে পারলেন। গবেষকগণ তাদের বাহুর জোড়াগুলি উপরে নিচে নড়াচড়া করে জিজ্ঞেস করলেন সেগুলো কোন দিক নির্দেশ করছে। চোখ বাধা অবস্থায় তারা বলতে পারলেন না জোড়াগুলো কোন দিক নির্দেশ করছে। চোখ খোলা অবস্থায় সাধারণ ভাবেই দেখে দেখে উত্তর করতে পারলেন।

গবেষকগণ দি নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন কে বলেন, গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলগুলো এই নির্দেশ করছে যে, রোগীদের মাঝে প্রোপ্রিওশেপশন [নিজের অঙ্গ থেকে অনুভূতি গ্রহণ করার ক্ষমতা] এর ঘাটতি রয়েছে।বনম্যান বর্ণনা করেন, সুস্থ্য ব্যক্তিরা বিয়ানো বাজানো, গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ কিংবা কীবোর্ড দিয়ে টাইপ করার মতো বিভিন্ন কাজে ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভর করে থাকে। এসব কাজ করার সময় একজন ব্যক্তির অঙ্গের সচতনতার প্রয়োজন পরে। এই রোগীদের অনুরূপ সাড়া বা সচেতনতার অভাব রয়েছে। কিন্তু তারা পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করে উক্ত অভাব পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে।

গবেষকগণ এই রোগীদের স্পর্শের প্রতিক্রিয়ার পরীক্ষাও নিয়েছেন। এক পরীক্ষায়, একটি কম্পিত স্বণশুল তাদের গায়ে স্পর্শ করা হয়েছিলো। কিন্তু তারা এর কোন কম্পন অনূভব করেনি। অন্য আরেকটি পরীক্ষায়, তাদের পায়ের তালুতে কিংবা হাতের তালুতে নরম ব্রাশ ঘষা হয়েছে। এতে তাদের খোঁচা খোঁচা অনুভূতি হয়েছে। আর এটাই বনম্যান এবং চেসলারের কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছে, কারণ অধিকাংশ মানুষই ব্রাশের ব্যাপারে আরামদায়ক অনুভূতির কথা প্রকাশ করেছেন।

বিজ্ঞানীগণ তাঁদের পরীক্ষাগুলো পূনরায় এমআরআই মেশিনের মাধ্যমে যাচাই করেন। তাঁরা দেখেন যে, যদিও সুস্থ্য মানুষের মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল শরীরের সংবেদনশীলত প্রকাশের সঙ্গে সংযুক্ত এবং সক্রিয়, কিন্তু এই রোগীদের মস্তিষ্কে এসব সক্রিয়তা অনুপস্থিত ছিলো। যখন গবেষক তাদের শরীরে ব্রাশ স্পর্শ করেন। এর পরিবর্তে তারা একরকম মানসিক প্রতিক্রিয়া অনুভব করেন। চেসলার বর্ণনা করেন, তারা ব্রাশের স্পর্শে শারীরিক অনুভূতির পরিবর্তে একপ্রকার মানসিক অনুভূতির অভিজ্ঞতা লাভ করেন।

সবশেষে, গবেষগণ তাদের একটি যন্ত্রে আটকে রাখেন যা ধীরে ধীরে বেদনাদায়ক এবং ঠান্ডা বা গরম হয়ে যায়। আশ্চর্যজনক ভাবে রোগীরা তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং ব্যথা অনুভবে সঠিক ভাবে প্রতিক্রিয়া করলেন।

পরীক্ষার ফলাফল গণনার পর চেসলার এবং বনম্যান নির্ধারণ করলেন যে, প্রোপ্রিয়োশেপসনের জন্যই জিনটি জটিল হয়েছে। যদিও তাঁদের গবেষণার নমুনার আকার অত্যন্ত ছোট, তবুও চেসলার বলেন, তাঁদের পরীক্ষার ফলাফল সাধারণ মানুষের জিনের ভূমিকার উপর আলোকপাত করবে। “প্রাণীদের মডেলে আমরা যা দেখতে পেয়েছি তার সবই সামঞ্জস্যপূর্ণ।”

বনম্যান বলেন, এই পরিবর্তন কতোটা বিরল তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আমরা এরকম আরো মানুষ খুঁজে পাবো যাদের এমন শারীরিক এবং জেনেটিক কাঠামোর বিশৃংখলা রয়েছে।

কিন্তু PIEZO2 কিভাবে রোগীর কঙ্কাল বিকৃতির সাথে সম্পর্কিত তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। একটি সম্ভাবনা হতেপারে প্রোটিন জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় যা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা এখনো অজানা রয়ে গিয়েছে। বনম্যান ও চেসলার অন্য যে বিষয়টি যোগ করেন তা হলো, প্রোপ্রিয়োশেপসন নিজেই স্বাভাবিক কঙ্কাল সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে। এটা ছাড়া দেহ সঠিকভাবে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবেনা অথবা তার জোড়াগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকে। যার দরুণ সময়ের সাথে সাথে একটি অস্বাভাবিক কঙ্কাল বেড়ে উঠতে পারে।

ক্যালিফোর্ণিয়ার স্ক্রিপস রিসার্চ ইন্সটিটিউট থেকে একজন গবেষক যিনি পূর্বে PIEZO2 এর মাউস মডেলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বলেন,  “আমি মনে করি তাঁদের এই দাবি অনেকটা উত্তেজক হলেও প্রকৃতপক্ষে এটা সম্ভব। হাড় গঠনে স্পর্শ কিংবা প্রোপ্রিয়োশেপসন একটি পরোক্ষ ভূমিকা থাকার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।”

এমনকি হতে পারে যে, একট সক্রিয় PIEZO2 জিন ভালো মানের খেলোয়ার হতে সাহায্য করে অথবা, একটি দুর্বল PIEZO2 জিন আনাড়িপনা হতে অবদান রাখে। বনম্যান বলেন,“আমি মনেকরি এটা হতে পারে, অসম্ভব কিছু নয়।”

-শফিকুল ইসলাম

Share.

1 Comment

  1. Pingback: camiseta del liverpool

মন্তব্য করুন