নবায়নযোগ্য জ্বলানী কেলেংকারীঃ বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে

0

ইউরোপ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। আর এর ফলশ্রুতিতে ২০২০ সালের মধ্যে মোট শক্তির প্রায় ২০ ভাগ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আহরণ করতে চাচ্ছে। কিন্তু এতে খুব বেশি উৎসাহিত হওয়ার কারণ নেই।

কেন? কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস বায়ু, সৌর এমনকি জল এসবের একটিও না। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ৬০ ভাগের বেশী নবায়নযোগ্য জ্বালানী পাচ্ছে জৈববস্তুপুঞ্জ [ব্যাবহারযোগ্য উদ্ভিদ] থেকে এবং কিছু অংশ উৎপাদিত শস্য থেকে। কিন্তু বেশিরভাগ অংশই সংগ্রহ করা হয় পরিত্যাক্ত কাঠ এবং গাছ কেটে।

এর মানে হচ্ছে, ইউরোপীয়রা তাপ, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে পরিমাণ শক্তি ব্যবহার করছে, দ্রুতই তার দশ ভাগ আসবে বন ও খামার থেকে। অনেকেই ভয় পাচ্ছেন একারণে জৈববস্তুপুঞ্জ বিশাল আকারের ধ্বংশের মুখে চলে যাবে যার ফলে বণ্যপ্রাণী বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে এবং খাদ্য মূল্যের উপর চাপ বৃদ্ধি পাবে।

কিন্তু সবচেয়ে বিপদজনক বিষয়টি হচ্ছে, এই চাপ বৃদ্ধির বিষয়টিও অসম্পূর্ণ ও অনুমানের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। উন্নত দেশগুলো কার্বন ব্যালেন্স শীট লুকিয়ে রাখার মতো প্রতারণায় লিপ্ত। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাব পরতে পারে বিশ্বের জলবায়ুর উপর যা ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মহামন্দার থেকেও বড় আকার ধারণ করবে।

সামগ্রিকভাবে জৈববস্তুপুঞ্জ জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় নির্গমন হ্রাস করলেও, যে পরিমাণ দাবি করা হয় তার চেয়ে অনেক কম। আর এ কারণেই জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম অনুযায়ী জৈববস্তুপুঞ্জ পুরিয়ে ফেলায় যে কার্বন-ডাই অক্সাইড সৃষ্টি হয় তা উল্লেখযোগ্য হারে গণনাযোগ্য হবেনা দেশগুলোর জন্য।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের টিমোথি সারচিন্জার বলেন, “ইউরোপীয়রা নির্গমন হ্রাসের যে সীমা দাবি করে তা বাস্তব সম্মত নয়।”

হিসাবরক্ষণের এই কৌশলের মানে হচ্ছে জৈববস্তুপুঞ্জ কখনও কখনও অন্যান্য নবায়য়ণযোগ্য জ্বালানীর চেয়ে বেশী পরিমাণে নির্গমণ রোধ করে। প্রকৃতপক্ষে কার্যকরিতার দিক থেকে জৈবশক্তি সৌরশক্তির চেয়ে অনেক পিছিয়ে। এটি সৌরশক্তির সর্বোচ্চ ০.৩ ভাগ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়, যেখানে সৌরপ্যানেল সৌরশক্তির ১০ ভাগ গ্রহণ করে থাকে।

কিছুক্ষেত্রে অবস্থা সূচনীয়! প্রকৃতপক্ষে শক্তির জন্য জৈববস্তুপুঞ্জে পরিবর্তীত হওয়ায় জীবাশ্ম জ্বালানীর তুলনায় বেশী নির্গমন সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে, ইউ-র করদাতারা যেসব প্রকল্পে অর্থায়ন করছেন তাতে বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির গতি আরো দ্রুত হচ্ছে।

এটা শুধু ইউরোপীযানদের জন্যই নয়। যুক্তরাষ্ট্রেও একই অবস্থা। সেখানকার নবায়নযোগ্য জ্বালানীর একটি বড় উৎস হচ্ছে জৈবজ্বালানী। বনবিভাগ ইউরোপে কাঠ বিক্রি করে সম্পদশালী হচ্ছে এবং ইউ চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারাও যেন তাদের মতো একই জাল হিসাব পদ্ধতি প্রণয়ন করে। বড় শঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে, ইন্দোনেশীয়া, ব্রাজিল এবং কঙ্গোর মতো দেশগুলোও একই পথ অনুসরণ করবে এবং শক্তি উৎপাদনের জন্য গাছ কাটা শুরু করবে। সারচিন্জারের মতে, এটা এক ধরণের পাগলামি।

সুতরাং এটা কেন ঘটছে? যখন গবেষকগণ বিশ্বব্যাপী কার্বন নির্গমণ যোগ করা শুরু করলেন তখন তাঁরা গাছ কাটার জন্য কি পরিমাণ নির্গমণ হচ্ছে তা হিসাব করতে চাইলেন। দৈত গণনা পরিহার করার জন্য গাছ পোড়ানোর ফলে যে CO2 উৎপন্ন হয় তা বাদ দিলেন।

যদি  ক্রমাগত ভাবে এসব পোড়াতে থাকেন তবে আপনি কয়লা পোড়ানোর চেয়ে বেশি কার্বন নির্গত করছেন

জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনায়ও একই পদ্ধতি গৃহীহ হয়ে থাকে। জৈববস্তুপুঞ্জ নির্গমণ কার্বন নিরপেক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়ে, তাই একটি দেশের মোট গণনার সময় এটা যুক্ত হয়না। যুক্তরাজ্যের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিট স্মিথ বলেন, “জৈববস্তুপুঞ্জ-কে কার্বন নির্গমনে নিরপেক্ষ মনে করা একদম বোকামিপূর্ণ কাজ।”

ইউরোপীয়ান এনভাইরনমেন্ট এজেন্সির জন ভ্যান এ্যার্ডেন বলেন, “তত্ত্ব অনুযায়ী জৈবজ্বালানীর জন্য যদি কোন বনের গাছ কাটা হয় তবে এটা ইউর গ্রিনহাউজ গ্যাস তালিকায় ভূমী ব্যবহারের পরীবর্তে নির্গমন হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হবে।”

কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী ভূমি ব্যবহারের পরবর্তন বিবরনী দিতে হয়না। এমনকি উন্নত দেশগুলোর নির্গমন এবং আরও সমস্যাদি রয়েছে যা সঠিকভাবে গণনা করা হয়না।

এসব দেশগুলো তাদের আশানুরূপ পরিবর্তনের বেশী হলে তা কার্বন তহবিলে প্রকৃত নির্গমনের পরিবর্তন বিবরনীতে দাখিল করেনা। বেশিরভাগ উন্নত দেশই ইতমধ্যে তাদের প্রকল্পগুলোতে জৈবশক্তি অন্তর্ভূক্ত করেছে। সুতরাং এই নির্গমন ঘটনা তাদের দাখিল করতে হবেনা।

hidden-renewable-energy

সারচিন্জার বলেন, “এটা গণনার মৌলিক ত্রুটি। আপনি আমাজন বন কেটে তাকে পার্কিং লটে পরিবর্তন করে ফেললেন এবং গাছগুলো কয়লার বিপরীত হিসেবে ইউরোপের জন্য জাহাজ বোঝাই করলেন। আর ইউরোপ এটাকে নির্গমণ হ্রাস করার কারণ হিসেবে দাবি জানাতে পারবে।”

এটা একটি মারাত্মক ভুলের ফলাফল। জৈববস্তুপুঞ্জ পোড়ানো কার্বন নিরপেক্ষ এই ধারণাটির সত্যতা যাচাই করা ইইউর ২০২০ সালের নবায়ণযোগ্য জ্বালানীর লক্ষ্য। এর ফলশ্রুতিতে প্রচুর পরিমাণে জৈবজ্বালানীর সম্প্রসারণের লক্ষ্যে করদাতাদের লক্ষ লক্ষ ইউরো ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা বায়ু শক্তি কিংবা সৌর শক্তির ব্যাপারে অনেক আলোচনা করলেও এগুলো ইইউর নবায়ণযোগ্য শক্তির মাত্র ২০ ভাগেরও কম প্রদান করছে।

যুক্তরাজ্যের জলবায়ু পরিবর্তন কমিটির সদস্য ডেভিড জেফ বলেন, “নবায়ণযোগ্য শক্তির লক্ষ্য জৈবশক্তি দ্বারা কি পরিমাণ পূরণ করা যাচ্ছে সে তথ্যের কোন স্বীকৃতি নেই। এই বিধিটি খুব একটা শক্তিশালী নয় যা এর টেকসইয়ের মাত্রা নিশ্চিত করবে।”

এই অবস্থা পরিবর্তনের একটা প্রচেষ্টা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইইউ একটি নিয়ম চালু করছেন যে জৈবজ্বালানীর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে নির্গমণ কমানোর মাত্রা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এই নিয়ম কাঠের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অথচ এই কাঠ জৈববস্তুপুঞ্জ শক্তির বড় একটি উৎস। আর এটাই নির্গমণ হিসাব করার ক্ষেত্রে বড় রকমের ত্রুটি সৃষ্টি করে।

[জৈব জ্বালানী ক্ষতিকর হবে কেন?

ধরুণ কারো বাগানে ৫০ বছর পুরনো ওক রয়েছে এবং পরে তা কেটে ফেলল এবং সেটা দিয়ে তাদের ঘর উষ্ণ রাখার জন্য পুরিয়ে ফেলল।

কয়লার তুলনায় কাঠ অনেক খারাপ জ্বালানী, প্রতি ইউনিট তাপ তৈরীতে বেশি পরিমাণে কার্বন-ডাই অক্সাইড উৎপাদন করে। ভূমিতে যে শিকর অবশিষ্ট থাকবে সেটাও পচে গিয়ে অতিরিক্ত CO2 করবে সুতরাং একই পরিমাণ তাপ উৎপন্ন করতে যতটুকু কয়লা পুরতে হয় সেই পরিমাণ কাঠ পুরলে আবহাওয়ায় CO2 নিঃস্বরণ হচ্ছে

যদি পরিবর্ত্ন হিসেবে একটি গাছ রোপন করা হয় তবে অর্ধ শতাব্দীতে নিঃস্বরণকৃত CO2 শোষন করে নেবে ঠিকি কিন্তু যদি পূর্বের গাছটি বেঁচে থাকতো তবে কয়লা থেকে নির্গত সকল CO2 শোষন করে নিত এর মানে হচ্ছে, কয়লার পরিবর্তে কাঠ পুড়ানোর সুবিধা শতাব্দী থেকেও দূরে

সুতরাং আগামী কয়েক দশকে যদি আপনি কার্বন নির্গমনের পরিমাণ কমাতে চান তবে কাঠ পুরিয়ে তা অর্জন করাটা হবে খুবই খারাপ একটা পদক্ষেপ]

-শফিকুল ইসলাম

Share.

মন্তব্য করুন