Top header

পরমাণুর গহীন নিসর্গে | ৪: নিউক্লিয়াসসমূহ | ৪.৪: বর্ণালী রেখা

0

অধ্যায়-৪: নিউক্লিয়াসসমূহ
অনুচ্ছেদ-৪: বর্ণালী রেখা
[বইয়ের সূচীপত্র তথা প্রকাশিত সবগুলো আর্টিকেলের জন্য এখানে দেখুন]

নিউটন প্রথম বারের মতো আলোক বর্ণালী  প্রদর্শন করার পর অনেক বিজ্ঞানী এটি নিয়ে অনুশীলন করেছেন। যেমন: যদি সূর্যালোককে প্রিজমের মধ্য দিয়ে পাঠানোর আগে একটি সরু চিরের মধ্য দিয়ে পাঠানো হয় তাহলে প্রতিটি তরঙ্গদৈর্ঘ্য কিছু বৈশিষ্ট্যসূচক বর্ণে ওই চিরটির প্রতিবিম্ব তৈরি করে। তরঙ্গদৈর্ঘ্যগুলো খুব কাছাকাছি বিন্যাস্ত থাকে এবং পরিবর্তশীল বর্ণের একটি নিরবচ্ছিন্ন আলোর ব্যান্ড তৈরি করে (রংধনুতে যেমন দেখা যায়)। কিন্তু যদি কিছু কিছু তরঙ্গদৈর্ঘ্য এই ব্যান্ডের মধ্যে অনুপস্থিত থাকে তাহলে বিষয়টি কী হতে পারে? সেই ক্ষেত্রে বর্ণালীর মধ্যে কিছু কিছু জায়গা থাকবে যারা চিরের কোনো প্রতিবিম্ব তৈরি করবে না এবং এর ফলে বর্ণালীর ফাঁকে ফাঁকে অন্ধকার রেখা দেখা যাবে।

১৮০২ সালে ব্রিটিশ রসায়নবিদ উইলিয়াম হেইড ওলাস্টন (William Hyde  Wollaston, ১৭৬৬-১৮২৮) এধরনের অন্ধকার রেখা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি এই বিষয়টি নিয়ে লেগে থাকেননি এবং বেশ কিছু সময়ের জন্য অন্য কেউও উৎসাহ দেখাননি।

সৌর বর্ণালী বিশ্লেষণ করলে বেগুনী থেকে লাল পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বর্ণ পাওয়ার কথা (ক)। কিন্তু বাস্তবে বর্ণালীতে কিছু অন্ধকার রেখা পাওয়া যায় (খ)। এগুলোকে বলা হয় ফ্রনহফার রেখা।

সৌর বর্ণালী বিশ্লেষণ করলে বেগুনী থেকে লাল পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বর্ণ পাওয়ার কথা (ক)। কিন্তু বাস্তবে বর্ণালীতে কিছু অন্ধকার রেখা পাওয়া যায় (খ)। এগুলোকে বলা হয় ফ্রনহফার রেখা।

তবে ১৮১৪ সালে জার্মান আলোকবিদ জোসেফ ভন ফ্রনহফার (Joseph  von Fraunhofer, ১৭৮৭-১৮২৬) চমৎকার কিছু প্রিজম এবং অন্যান্য আলোকযন্ত্র তৈরি করেন এবং এগুলো ব্যবহার করে খুব তীক্ষ্ম বর্ণালী তৈরি করেন যা এর আগে কখনো হয়নি। তিনি সতর্কতার সাথে সেগুলো অবস্থান, মাত্রা এসব নির্ণয় করেন। তিনি আরও দেখান, একই বর্ণের রেখা সর্বদা একই অবস্থানে পাওয়া যায়। তাদের উৎস সূর্যালোক, চন্দ্রালোক কিংবা অন্য গ্রহের আলো যা-ই হোক না কেন (চাঁদ এবং গ্রহগুলো থেকে আসা আলো অবশ্যই প্রতিফলিত আলো তাই, এতে হয়তোবা আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু  নেই।)

তখন থেকেই সেই ফ্রনহফার রেখাগুলো নিয়ে (প্রায়ই এগুলোকে এই নামে ডাকা হয়), সতর্কতার সাথে গবেষণা করা হল। কিন্তু কৌতুহলোদ্দীপকের বাইরে বেশি কিছু বোঝা গেল না যদ্যাবধি না ১৮৫৯ সালে কার্শফ একটি ব্যূহভেদি আবিষ্কার করেন।

কার্শফ দেখলেন যদি নির্দিষ্ট কোনো মৌলকে উত্তপ্ত করা হয় তাহলে তারা সূর্যের মত নিরবচ্ছিন্ন বর্ণালী তৈরি করে না। এর পরিবর্তে তারা বিচ্ছিন্ন কিছু তরঙ্গ উৎপন্ন করে। ফলে বর্ণালীতে কিছু উজ্জ্বল রেখা পাওয়া যায়, যাদের মাঝে বেশ খানিকটা অন্ধকার অঞ্চল থাকে। যদি সূর্যালোককে ওই নির্দিষ্ট মৌলের অপেক্ষাকৃত শীতল বাষ্পের মধ্য দিয়ে পাঠানো হয় তাহলে তারা সূর্যালোক থেকে ঠিক একই তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে আলো শোষণ করে নেয় যা তারা নিজেরা উত্তপ্ত অবস্থায় বিকিরণ করে। তাছাড়া প্রতিটি মৌল শুধুমাত্র নিজেদের বৈশিষ্ট্যসূচক সুনির্দিষ্ট বর্ণের তরঙ্গদৈর্ঘ্যই বিকিরণ করে (যখন উত্তপ্ত করা হয়) বা শোষণ করে (যখন শীতল করা হয়)। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট কোনো খনিজ পদার্থকে উত্তপ্ত করে তার বিকিরিত তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে সেটি কী উপাদানে গঠিত তা নির্ণয় করা সম্ভব। যদি কোনো জানা মৌলের বর্ণালীর সাথে সেটি না মেলে, তাহলে একটি নতুন মৌলের খোঁজ এই পদ্ধতিতে পাওয়া যেতে পারে। সূর্য এবং অন্যান্য তারকায় কী কী মৌল বিদ্যমান আছে তা তাদের বর্ণালীসমূহের অন্ধকার রেখাগুলো থেকে সনাক্ত করা সম্ভব।

বর্ণালী রেখার এসব জ্ঞান একে রসায়নবিদ এবং জ্যোতির্বিদগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল, কিন্তু কেউ জানতে পারেনি কেন ভিন্ন ধরনের মৌলসমূহ ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিকিরণ বা শোষণ করে। এই ধাঁধাটিকে সমাধানের ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে নিলেন সুইস পদার্থবিদ জোহান জ্যাকব বামার (Johann Jakob  Balmer, ১৮২৫-১৮৯৮)। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে হাইড্রোজেনের বর্ণালী নিয়ে আগ্রহী ছিলেন, যা অন্যান্য মৌলের চেয়ে সরল প্রকৃতির বলে মনে হয়েছিল। হবে না-ই বা কেন, হাইড্রোজেন ছিল সবচেয়ে হালকা এবং ধারণাকৃত সবচেয়ে সরল প্রকৃতির মৌল।

হাইড্রোজেনের বর্ণালী একশ্রেণীর রেখা নিয়ে গঠিত হয় যারা তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমতে থাকার সাথে সাথে অপেক্ষাকৃত ঘন সন্নিবেশিত অবস্থায় থাকে। ১৮৮৫ সালে বামার এই রেখাগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের জন্য একটি সূত্র প্রতিষ্ঠিত করলেন। এই সূত্রে একটি প্রতীক ছিল, যার মান হতে পারে পর্যায়ক্রমিক পূর্ণবর্গ সংখ্যা: ১, ৪, ৯, ১৬ ইত্যাদি। এর মাধ্যমে হাইড্রোজেন বর্ণালীর পর্যায়ক্রমিক রেখাগুলো সংশ্লিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মান গণনা করে বের করা সম্ভব হলো। তবে এখনো পর্যন্ত এই ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না, কেন এই রেখাগুলোকে সুনির্দিষ্ট ভাবে ওখানে পাওয়া যায়। তবে এটুকু বোঝা গেল, এই রেখাগুলোতে এক ধরনের নিয়মানুবর্তিতা আছে যাকে কোনোভাবে পরমাণুর গঠন থেকে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ আছে। পরামাণুর গঠন আরো বিস্তারিত না জানতে পারলে এ বিষয়ে এর চেয়ে বেশিদূর যাওয়া যাবে না। তাহলে দেখা যাক পরবর্তীতে এটি কীভাবে বের করা হলো।

যেই মুহূর্তে পদার্থবিদগণ নিউক্লিয়াস বিশিষ্ট পরমাণুর ধারণা গ্রহণ করলেন, সেই মুহূর্তে তাঁদের এটিও চিন্তা করতে হলো ইলেক্ট্রনগুলো কীভাবে যার যার জায়গায় অবস্থান করে। সর্বোপরি, যদি ইলেক্ট্রনগুলো ঋনাত্মকভাবে চার্জিত হয় এবং নিউক্লিয়াস যদি ধনাত্মক চার্জে চার্জিত হয় এবং যদি বিপরীত ধরনের চার্জ পরস্পরকে বিকর্ষণ করে থাকে, তাহলে কেন ইলেক্ট্রনগুলো নিউক্লিয়াসে পতিত হচ্ছে না? এই প্রশ্নটি বোধহয় পৃথিবীকে নিয়েও করা যায়। সূর্য ও পৃথিবী দুটিই পরস্পরকে আকর্ষণ করছে। কেন পৃথিবী সূর্যের উপর পতিত হচ্ছে না। পৃথিবীর ক্ষেত্রে উত্তরটি হচ্ছে এটি একটি কক্ষপথে আছে। এটি সূর্যের দিকে পতিত হচ্ছে, কিন্তু এর পতনের সাথে সমকোণে একটি গতি আছে যা তাকে চিরস্থায়ীভাবে এর কক্ষপথে ধরে রাখে।

এই অবস্থায়, পরমাণুকে একধরনের ছোটখাটো সৌরজগৎ ধরে নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেল, যাতে ইলেক্ট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঘোরে। কিন্তু এর একটি সমস্যা আছে, যদিও তড়িৎ-চৌম্বক তত্ত্ব অনুযায়ী জানা ছিল যখন একটি বৈদ্যুতিক ভাবে চার্জিত বস্তু এই পদ্ধতিতে ঘূর্ণায়মান থাকে, এটি ক্রমাগত তড়িৎচৌম্বক বিকিরণ উৎপন্ন করতে থাকে এবং এই পদ্ধতিতে শক্তি হারাতে থাকে। যেহেতু শক্তি হারাচ্ছে তাই এটি ক্রমান্বয়ে সর্পিলাকার পথে কেন্দ্রের দিকে ধাবিত হবে এবং একসময় নিউক্লিয়াসে পতিত হবে।

একই ভাবে, পৃথিবীও সূর্যের  চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বিকিরণ করে এবং এই প্রক্রিয়ায় শক্তি হারায় এবং সর্পিলাকারে সূর্যের দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু মহাকর্ষ, তড়িৎ-চৌম্বকত্বের চেয়ে এতোই দূর্বল, পৃথিবী যে পরিমাণ শক্তি হারায় তা মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ের ক্ষুদ্র যা তাকে সর্পিলাকারে সূর্যের  কাছাকাছি গমনের আগে কয়েকশো কোটি বছর পার করে দিতে পারবে।

একটি ইলেক্ট্রনের তড়িৎ-চৌম্বক ক্ষেত্র অনেক বেশি তীব্র। এই প্রক্রিয়ায় সে এতো বেশি শক্তি হারাবে, এর নিউক্লিয়াসে পতিত হতে বেশি সময় লাগার কথা নয়। তবুও এই ঘটনাটি ঘটে না। পরমাণু অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থিতিশীল থাকে এবং তাদের ইলেক্ট্রনগুলো বহিঃস্থ অংশে বিরাজমান থাকে।

এই সমস্যার মোকাবেলা করলেন ড্যানিশ পদার্থবিদ নীলস হেনরিক ডেভিড বোর (Niels Henrik  David  Bohr, ১৮৮৫-১৯৬২)। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এই কথা বলা অর্থহীন যে একটি ইলেক্ট্রন যখন নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঘোরে তখন তা শক্তি বিকিরণ করে। কারণ স্পষ্টতই এ ধরনের কিছু ঘটে না। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত একটি ইলেক্ট্রন তার কক্ষপথে থাকে ততক্ষণ এটি কোনো শক্তি বিকিরণ করে না।

তারপরও হাইড্রোজেন যখন উত্তপ্ত হয়, শক্তি বিকিরণ করে এবং যখন শীতল হয়, তা শোষণ করে। এটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিকিরণ করে, যা বামারের সমীকরণে বসে যায় এবং একই তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করে। এই বিষয় ব্যাখ্যার জন্য ১৯১৩ সালে বোর ধরে নিলেন, হাইড্রোজেন পরমাণুতে ইলেক্ট্রন বেশ কতগুলো কক্ষপথের একটি গ্রহণ করতে পারে যেগুলো নিউক্লিয়াস থেকে বিভিন্ন দূরত্বে থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত এটি একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে থাকে, সেটির আকার যা-ই হোক না কেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এটি শক্তি শোষণ বা বিকিরণ করে না। যখন ইলেক্ট্রন কক্ষপথ পরিবর্তন করে তখন এটি হয় শক্তি শোষণ করে, (যদি নিউক্লিয়াসের কাছ থেকে দূরবর্তী কোনো কক্ষপথে সরে যায়) কিংবা শক্তি বিকিরণ করে (যদি নিউক্লিয়াসের কাছাকাছি কোনো কক্ষপথে পৌঁছায়)।

কিন্তু কেনই বা ইলেক্ট্রন একটি সুনির্দিষ্ট কক্ষপথে বিরাজ করবে, তারপর হঠাৎ করে বাইরের একটি কক্ষপথে নিক্ষিপ্ত হবে? কখনোই দুই কক্ষপথের মাঝামাঝি কোথাও প্রদক্ষিণ করতে পারবে না? বোর দেখলেন, এই বিষয়টির সাথে কোয়ান্টাম তত্ত্বের কোথাও না কোথাও সম্পর্ক থাকতে হবে। যদি পরমাণু শুধুমাত্র একটি সুনির্দিষ্ট আকৃতির কোয়ান্টাম নিয়ে কাজ করতে পারে, তাহলে সে শুধুমাত্র একটি সুনির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করতে পারবে এবং এই ঘটনা ইলেক্ট্রনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাহিরের পরবর্তী কক্ষপথে পাঠিয়ে দেবে।
বোর দেখালেন, শুধুমাত্র চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের আলোকে একটি পরমাণুর গঠনকে ব্যাখ্যা করা যাবে না, বরং এই কাজ করার জন্য কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যবহার করতে হবে। এই কাজের জন্য তিনি ১৯২২ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করলেন।

বোর মডেল অনুযায়ী একটি হাইড্রোজেন পরমাণু। ইলেক্ট্রন শুধু নির্দিষ্ট কিছু অনুমোদিত শক্তিস্তরেই (হ = ১, ২, ৩ ...) থাকতে পারবে। এর মাঝামাঝি কোথাও থাকতে পারবে না। এক শক্তিস্তর থেকে অপর শক্তিস্তরে গমন করতে হলে ইলেক্ট্রনকে সুনির্দিষ্ট শক্তি (Δঊ) শোষণ বা বিকিরণ করতে হবে। এর মাঝামাঝি শক্তি শোষণ বা বিকিরণ করতে পারবে না।

বোর মডেল অনুযায়ী একটি হাইড্রোজেন পরমাণু। ইলেক্ট্রন শুধু নির্দিষ্ট কিছু অনুমোদিত শক্তিস্তরেই (হ = ১, ২, ৩ …) থাকতে পারবে। এর মাঝামাঝি কোথাও থাকতে পারবে না। এক শক্তিস্তর থেকে অপর শক্তিস্তরে গমন করতে হলে ইলেক্ট্রনকে সুনির্দিষ্ট শক্তি (Δঊ) শোষণ বা বিকিরণ করতে হবে। এর মাঝামাঝি শক্তি শোষণ বা বিকিরণ করতে পারবে না।

বোরকে তাঁর সূত্রের একটি টার্মের জন্য পূর্ণসংখ্যা ব্যবহার করতে হয়েছিল। প্রতিটি সংখ্যা একগুচ্ছ পৃথক বর্ণালী রেখার প্রতিনিধিত্ব করে। পূর্ণসংখ্যার ব্যবহার এটিই প্রতিষ্ঠিত করে যে, এই প্রক্রিয়ায় পূর্ণসংখ্যক কোয়ান্টাম জড়িত। কেউ চাইলেও কোয়ান্টামের ভগ্নাংশ পাওয়া সম্ভব নয়। এই কারণে এই সূত্রে যে সংখ্যা ব্যবহার করা হয়েছে সেটিকে কোয়ান্টাম সংখ্যা বলা হয়।

যদিও বোরের সূত্র বর্ণালীরেখাগুলোর একটি চিত্র দেয়, কিন্তু এটি সবকিছুকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। যদি বর্ণালী রেখাগুলোকে আরো সূক্ষ্ম বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারা বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যায় যে প্রতিটি রেখা আরো কিছু সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মরেখায় বিভক্ত। দেখে মনে হয় যেন, বোরের প্রতিটি কক্ষপথ আসলে একগুচ্ছ কক্ষপথ নিয়ে গঠিত যাদের মধ্যে পার্থক্য খুবই সামান্য।

১৯১৬ সালে জার্মান পদার্থবিদ আর্নল্ড জোহানেস উইলিয়াম সমারফেল্ড (Wilhelm  Sommerfeld, ১৮৬৮-১৯৫১) দেখালেন, বোরের কক্ষপথগুলো বৃত্তাকার। কিন্তু এই কক্ষপথগুলোকে বিভিন্ন মাত্রার উপবৃত্তাকারও ধরে নেওয়া যায়। এই নতুন কক্ষপথগুলোকে আমলে নেওয়ার জন্য দ্বিতীয় একটি কোয়ান্টাম সংখ্যা চালু করা হলো। এর মান হতে পারে শূন্য থেকে শুরু করে বোরের কোয়ান্টাম সংখ্যার চেয়ে এক কম যেকোনো পূর্ণ সংখ্যা।

যদি বোরের কোয়ান্টাম সংখ্যা (অথবা প্রধান কোয়ান্টাম সংখ্যা) হয় ১ (সবচেয়ে ছোট এই মানই হতে পারে), তাহলে সমারফেল্ডের কোয়ান্টাম সংখ্যা বা অরবিটাল কোয়ান্টাম সংখ্যা হতে পারবে কেবল ০। যদি বোরের কোয়ান্টাম সংখ্যার মান হয় ২, তাহলে অরবিটাল কোয়ান্টাম সংখ্যার মান হতে পারবে ০ অথবা ১ এবং এভাবেই চলতে থাকবে। যদি দুধরনের কোয়ান্টাম সংখ্যাকেই আমলে নেওয়া হয় তাহলে বর্ণালী রেখাগুলোর পূণর্বিভাজন ব্যাখ্যা করা যায়।

বোর-সমারফেল্ড মডেল। সমারফেল্ডের মতে একই শক্তিস্তরকে আবার বিভিন্ন উপবৃত্তাকার উপস্তরে বিভক্ত করা যায়।

বোর-সমারফেল্ড মডেল। সমারফেল্ডের মতে একই শক্তিস্তরকে আবার বিভিন্ন উপবৃত্তাকার উপস্তরে বিভক্ত করা যায়।

জটিলতার শেষ হলো না অবশ্য। যদি পরমাণুকে কোনো চৌম্বকক্ষেত্রে স্থাপন করা হয়, তাহলে এই সূক্ষবর্ণালীরেখাগুলো আরো সূক্ষ্মভাগে ভাগ হয়ে যায়। বোর এবং সমারফেল্ড বৃত্তাকার বা উপবৃত্তাকার উভয়েই কক্ষপথগুলোকে একই তলে অবস্থিত ধরে নিয়েছিলেন, যার ফলে নিউক্লিয়াস এমন সকল সম্ভাব্য কক্ষপথ একটি কাগজের মত সমতলে অবস্থান করে। এমন হওয়াও সম্ভব ছিল, কক্ষপথগুলো যদি সমতল থেকে বেরিয়ে থাকে, তাহলে সবগুলো কক্ষপথ মিলে একটি প্রতিসম গোলাকার আকৃতি তৈরি করতে পারে। এটি গ্রহণযোগ্য, কেননা পরমাণুসমূহকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে একেকটি ক্ষুদ্র গোলকের মতোই মনে হয়।

কক্ষপথগুলোর ত্রিমাত্রিক ব্যবস্থাকে আমলে নেওয়ার জন্য একটি তৃতীয় কোয়ান্টাম সংখ্যা প্রণয়ন করতে হলো। এর নাম দেওয়া হল চৌম্বকীয় কোয়ান্টাম সংখ্যা। এর মান হতে পারে ০ থেকে শুরু করে প্রধান কোয়ান্টাম সংখ্যা পর্যন্ত যেকোন পূর্ণসংখ্যা। এমনকি এটি ঋনাত্মকও হতে পারে। যদি প্রধান কোয়ান্টাম সংখ্যার মান হয় ৩, তাহলে চৌম্বক কোয়ান্টাম সংখ্যার মান হতে পারে -৩, -২, -১, ০, ১, ২, ৩।

তিনটি মাত্রাকে অন্তুর্ভুক্ত করার পর মনে হলো, আর নতুন করে কিছু করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তারপরও, বর্ণালী রেখাগুলোর মধ্যে এখনো কিছু রয়ে গেছে, যা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে এবং এই জন্য অস্ট্রীয়-সুইস পদার্থবিদ উলফগ্যাং পাউলি (Wolfgang  Pauli, ১৯০০-১৯৫৮) আরো একটি কোয়ান্টাম সংখ্যা যুক্ত করেন এতে। এই কোয়ান্টাম সংখ্যাটিকে ইলেক্ট্রনের অক্ষ বরাবর ঘূর্ণনের দিকের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা ঘড়ির কাঁটার দিকে বা ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে হতে পারে। পর্যবেক্ষণলব্ধ বাস্তবতাকে গাণিতিক সূত্রের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য এর মান হতে হয় +১/২ অথবা -১/২।

পাউলি দেখালেন যে, একটি পরমাণুর মধ্যে দুটি ইলেক্ট্রনের চারটি কোয়ান্টাম সংখ্যা একই রকম হতে পারবে না। এটিকে বর্জন নীতি বলা হয়। কেননা একবার একটি ইলেক্ট্রন চারটি কোয়ান্টাম সংখ্যার কোনো মান নিয়ে নিলে অন্য কোনো ইলেক্ট্রন একই মান চারটি ক্ষেত্রেই নিতে পারবে না। অন্তত একটি ক্ষেত্রে মান ভিন্ন হতে হবে। এই নীতির জন্য পাউলি ১৯৪৫ সালে নোবেল পুরস্কার পেলেন। (মাঝে মাঝে একজন বিজ্ঞানীকে নোবেল গ্রহণের জন্য দীর্ঘ সময়, যেমন ২০ বছর এমন কি বিরল ক্ষেত্রে ৫০ বছর পর্যন্তও অপেক্ষা করতে হয়। একটি আবিষ্কার সত্যিই তাৎপর্যপূর্ণ কিনা তা খতিয়ে দেখার জন্য সময় লাগে। যদি একটি আবিষ্কারের সাথে সাথেই পুরস্কার দিয়ে দেওয়া হতো, তাহলে এমন অনেক আবিষ্কারই পুরস্কার পেয়ে যেত যেগুলো পরবর্তী নগণ্য বা এমনকি ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে।)

চারটি কোয়ান্টাম সংখ্যা ব্যবহার করে পরমাণুর অভন্তরে একটি ইলেক্ট্রনের বিন্যাসকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে তার একটি বিস্তারিত গাণিতিক ব্যবস্থা ১৯২৬ সালে ইতালিয় পদার্থবিদ এনরিকো ফার্মি (Enrico Fermi, ১৯০১-১৯৫৪) এবং ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ পদার্থবিদ পল আড্রিয়েন মরিস ডিরাক (Paul  Adrien  Maurice  Dirac, ১৯০২-১৯৮৪) উপস্থাপন করেন। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ফার্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান, যা সেই সব কণিকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা +১/২ অথবা -১/২ ঘূর্ণন প্রদর্শন করে। ফার্মির নাম থেকে এধরনের কণিকাকে একত্রে ফার্মিয়ন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ইলেক্ট্রন এই কারণে একটি ফার্মিয়ন, প্রোটনও।

এমনও কণিকা আছে যাদের ঘূর্ণন ০, ১, অথবা ২। (উদাহরণস্বরূপ: ফোটনের ঘূর্ণন ১ এবং গ্র্যাভিটনের ঘূর্ণন ২) বর্জন নীতি এধরনের ঘূর্ণন বিশিষ্ট কণিকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, যাদের পারমাণবিক বিন্যাস ১৯২৪ সালে উপস্থাপন করেছিলেন ভারতীয় পদার্থবিদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু (Satyendra  Nath Bose, ১৮৯৪-১৯৮৪)। আইনস্টাইন বোসের কাজের প্রশংসা করেছিলেন এবং ১৯২৫ সালে এর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। এই ব্যবস্থাটিকে বলা হয় বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান। যেসব কণিকা এ ধরনের পরিসংখ্যান মেনে চলে অর্থাৎ ০ বা কোন পূর্ণসংখ্যক ঘূর্ণন প্রদর্শন করে বসুর নাম অনুসারে সেগুলোকে বলা হয় বোসন।

বোরের ইলেক্ট্রন কক্ষপথগুলো যদিও পরমাণু ব্যাখ্যায় বড় ধরনের অগ্রগতি তথাপি এটি পুরোপুরি সন্তোষজনক কখনোই ছিল না। এখনো ইলেক্ট্রনের এমন ছবিই বিদ্যমান যা একটি কণা হিসেবে তার কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান। যদি এমনই হয়, তাহলে এখনো এর ব্যাখ্যাটি পরিষ্কার হলো না কেন ইলেক্ট্রন শক্তি বিকিরণ করতে করতে সর্পিলাকারে নিউক্লিয়াসে পতিত হয় না। যখন একটি ইলেক্ট্রন এর কক্ষপথে থাকে তখন এটি বিকিরণ করে না; কিন্তু কেন করে না? এটিও একটি ভাসা ভাসা যুক্তি যে, এটি একটি নির্দিষ্টি আকৃতির কোয়ান্টামই কেবল নিঃসৃত করতে পারে। কিন্তু কেন? কিছু একটা আড়ালে রয়ে যাচ্ছে।

জার্মান পদার্থবিদ ওয়ার্নার কার্ল হাইজেনবার্গ (Werner Karl Heisenberg, ১৯০১-১৯৭৬) বলেন, কেউ যদি আমাদের প্রাত্যহিক জীবন-যাপনের আলোকে পরমাণুকে চিত্রায়িত করতে চায়, তাহলে সমস্যায় পড়তে হবে। আমরা যে বিষয়গুলোতে অভ্যস্ত, যেমন: সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহের গতি কিংবা কিংবা বিলিয়ার্ড বলের ঠোকাঠুকি ইত্যাদি এগুলো পরমাণুর তুলনায় এতোই প্রকান্ড যে, এগুলোর গাঠনিক উপাদান থেকে যদি কোনো ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম আদান-প্রদান হয় যার শক্তির পরিমাণ অত্যন্ত ক্ষুদ্র তাতে এগুলোতে কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে না। তাই আমাদের সকল মানসিক চিত্র হচ্ছে অ-কোয়ান্টায়িত জগতের ছবি। পরমাণু, ইলেক্ট্রন কিংবা বিকিরণ নিয়ে আমরা যখন আলোচনা করব আমরা এমন একটি দুনিয়াতে থাকব যাতে কোয়ান্টাম প্রভাব হবে উল্লেখযোগ্য এবং আমাদের মনে রাখা ছবি দিয়ে তা ব্যাখ্যা করতে গেলে বিফলে যাবে। (কোয়ান্টাম তত্ত্ব  সম্বন্ধে বলা যায়, এটি আমাদের মহাবিশ্বকে মসৃণ হিসেবে না দেখে দানাদার হিসেবে দেখতে শেখায়। এটি একটি খবরের কাগজে ছাপানো ছবির মতো যেটিকে দূর থেকে বেশ মসৃণ দেখায়। কেননা এর ছোট ছোট কালির ফোঁটাগুলো আলাদাভাবে বোঝার জন্য যথেষ্ট বড় নয়। আমরা যদি ছবিটিকে যথেষ্ট পরিমাণে বিবর্ধিত করি তাহলে সাধারণ দুনিয়ায় দৃশ্যমান অবস্থার মতো আর দেখা যাবে না। বিবর্ধিত অবস্থায় আমরা শুধুমাত্র কিছু কালির ফোঁটা দেখব। তা আর সামগ্রিকভাবে কোনো বোধগম্য ছবি বলে মনে হবে না।

হাইজেনবার্গের কাছে মনে হলো, দৃশ্যমান জগতের আদলে পরমাণুর চিত্র ধরে না নিয়ে বর্ণালী বিশ্লেষণ করে আমাদের বিভিন্ন সংখ্যাবাচক লব্ধ বিষয় নিয়ে সেগুলোকে গাণিতিক ভাবে মোকাবেলা করা উচিত। বৃত্ত, উপবৃত্ত, হেলানো, ঘুর্ণন ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে নয়। এই লক্ষ্যে ১৯২৫ সালে হাইজেনবার্গ “ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যা” প্রকাশ করলেন। এটিকে ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যা বলা হয়, কারণ এই কাজে একটি গাণিতিক ব্যবস্থা ‘ম্যাট্রিক্স’ ব্যবহার করা হয়।

কোয়ান্টাম প্রভাবসমূহ অতি জোরালো, এমন দুনিয়ায় আমাদের গতানুগতিক সব ছবি ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমরা যদি ইলেক্ট্রনকে কণার বদলে তরঙ্গ হিসেবে ধরে নিই, তাহলে এটিকে নিউক্লিয়াসের চারদিকে একটি তরঙ্গায়িত আংটা হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

অবশ্য একই বছর ডেভিসন ইলেক্ট্রন তরঙ্গের উপস্থিতি প্রমাণ করলেন এবং এ থেকে অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ এরভিন শ্রডিঞ্জারের (Erwin  Schrodinger, ১৮৮৭-১৯৬১) কাছে মনে হলো, এই তরঙ্গগুলো ইলেক্ট্রনের কক্ষপথের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে পারে।

আমরা যদি ইলেক্ট্রনকে কণার বদলে তরঙ্গ হিসেবে ধরে নিই, তাহলে আমরা নিউক্লিয়াসের চতুর্দিকে এমন কক্ষপথের ছবি কল্পনা করতে পারি, যা পূর্ণসংখ্যক তরঙ্গদৈর্ঘ্য নিয়ে গঠিত হতে হবে। এরপর আমরা যদি এই তরঙ্গটিকে নিউক্লিয়াসের চারপাশ ধরে পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে একসময় তরঙ্গটির আদি প্রান্তে ফিরে আসব এবং তরঙ্গের ‘পথ’টি নিউক্লিয়াসের চারপাশে একটি তরঙ্গায়িত আংটার মতো মনে হবে। সবচেয়ে ছোট কক্ষপথ কেবল একটি মাত্র তরঙ্গদৈর্ঘ্য নিয়ে গঠিত হবে। তা উপরে-নীচে বিস্তৃত থাকবে। ইলেক্ট্রন সর্পিলাকারে প্রোটনের মধ্যে পতিত হতে পারবে না। কেননা এটি এমন কোনো কক্ষপথ নিতে পারবে না যার দৈর্ঘ্য একটি তরঙ্গের চেয়ে ক্ষুদ্র হবে। অন্যান্য কক্ষপথগুলো এমন আকৃতির এবং নিউক্লিয়াস হতে এমন দূরত্বে হতে হবে যাদের মধ্যে পূর্ণসংখ্যক তরঙ্গ সমগ্র কক্ষপথটিতে মাপ অনুযায়ী বসে যায়। এই কারণেই কক্ষপথগুলো কেবলমাত্র নির্দিষ্ট দূরত্বে, নির্দিষ্ট উপবৃত্তে, নির্দিষ্ট বাঁকে এবং নির্দিষ্ট ঘূর্ণনে বিদ্যমান থাকবে।

প্রথম ক্ষেত্রে পূর্ণসংখ্যক তরঙ্গেও মাপ মেলে নি, তাই ইলেক্ট্রন এই আকারে কক্ষপথে থাকতে পারবে না। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে পূর্ণ সংখ্যক তরঙ্গ আবদ্ধ পথে এঁটে যায়। ইলেক্ট্রন কেবল এ ধরনের কক্ষপথেই থাকতে পারবে। তরঙ্গের পরিমাণ বেশি হলে উচ্চতর এবং নির্দিষ্ট ব্যবধানের কক্ষপথ তৈরি হবে।

প্রথম ক্ষেত্রে পূর্ণসংখ্যক তরঙ্গেও মাপ মেলে নি, তাই ইলেক্ট্রন এই আকারে কক্ষপথে থাকতে পারবে না। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে পূর্ণ সংখ্যক তরঙ্গ আবদ্ধ পথে এঁটে যায়। ইলেক্ট্রন কেবল এ ধরনের কক্ষপথেই থাকতে পারবে। তরঙ্গের পরিমাণ বেশি হলে উচ্চতর এবং নির্দিষ্ট ব্যবধানের কক্ষপথ তৈরি হবে।

শ্রডিঞ্জার একটি গাণিতিক অভিব্যক্তি তৈরি করলেন, যা ইলেক্ট্রন তরঙ্গ আমলে নিয়ে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে পারে যেটি তিনি ঘোষণা করলেন ১৯২৬ সালে। তার ব্যবস্থাটিকে বলা হলো তরঙ্গ বলবিদ্যা। ডিরাকও এই কাজে তাঁকে সাহায্য করলেন এবং এই কাজের জন্য ডিরাক এবং শ্রডিঞ্জার ১৯৩৩ সালে নোবেল পুরস্কার ভাগাভাগি করে নিলেন।

পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠিত হলো, তরঙ্গ বলবিদ্যা এবং ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যা সমতুল্য; তারা একই ফলাফল দেয়। গাণিতিক ব্যাবস্থাটিকে তাই সহজ করে বলা হয় কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। পর্যাক্রমিক উন্নতি এবং পরিমার্জনের মাধ্যমে যেই ব্যবস্থাটি দাঁড়ালো তা সাধারণভাবে ইলেক্ট্রন এবং অন্যান্য সাব-অ্যাটমিক কণিকাকে সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হলো।

১৯৩৯ সালে আমেরিকান রসায়নবিদ লিনাস কার্ল পাউলিং (Linus Carl Pauling, ১৯০১-) কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মূলনীতিকে পরমাণুর ইলেক্ট্রন আদান-প্রদান এবং শেয়ারের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলেন। এটি পূর্বেকার লুইস এবং ল্যাংমুয়্যারের কণা ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করল। এটি তুলনামূলক আরো সূক্ষ্মভাবে এবং আরো অনেক কিছুকে ব্যাখ্যা করল যা পুরোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভব ছিল না। এই কাজের জন্য পাউলিং ১৯৫৪ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করলেন।

১৯২৭ সালের প্রথম  দিকে হাইজেনবার্গ পরীক্ষা করে দেখিয়েছিলেন যে, কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ধারণা অনুযায়ী আমরা এই মহাবিশ্বের কোনো একটি প্রকারের পরিমাপ যথার্থ সূক্ষ্মভাবে নির্ণয় করতে পারি না। এই মহাবিশ্ব কোয়ান্টাম বলবিদ্যার আলোকে প্রতিষ্ঠিত। উদাহরণস্বরূপ, ধরুন আপনি একটি কণার অবস্থান যথাযথভাবে নির্ণয় করার চেষ্টা করলেন, এবং একই সাথে তার ভরবেগও (কণাটির ভর ও বেগের গুণফল) যথাযথভাবে নির্ণয়ের চেষ্টার করলেন। যেকোনো যন্ত্র যা আপনি কণাটির অবস্থান নির্ণয়ের জন্য ব্যবহার করবেন, তা এর গতি তথা ভরবেগ বদলে দেবে। যে যন্ত্র আপনি এর ভরবেগ নির্ণয়ের জন্য ব্যবহার করবেন, তা কণাটির অবস্থান বদলে দেবে। আপনি একই সাথে কিছুটা অস্পষ্টভাবে এবং কিছুটা অযথার্থতার সাথে কণাটির অবস্থান ও ভরবেগ নির্ণয় পারবেন। সম্ভাব্য সবচেয়ে নির্ভুল অবস্থায় পরিমাপকৃত অবস্থানের অনিশ্চয়তা এবং সবচেয়ে নির্ভুল অবস্থায় পরিমাপকৃত ভরবেগের অনিশ্চয়তার গুণফল থেকে এমন একটি পরিমাপ পাওয়া যায় যা কোয়ান্টাম তত্ত্বের একটি মৌলিক ধ্রুবক।

হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্র আরো বলে, সময় এবং শক্তির পরিমাণ একই সাথে যথাযথভাবে নির্ণয় করা যাবে না। এই কাজের জন্য হাইজেনবার্গ ১৯৩২ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করলেন। অনিশ্চয়তাসূত্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং পরমাণুর অভ্যন্তরীণ পদার্থবিদ্যার এমন বহু বিষয়কে ব্যাখ্যা করে যা এটি না হলে রহস্যময় থেকে যেত। তথাপি অনেক বিজ্ঞানী নিজেদেরকে এই তত্ত্ব থেকে দূরে রাখলেন, কেননা এই তত্ত্ব গ্রহণ করতে হলে ধরে নিতে হয়, এই মহাবিশ্বে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বিক্ষিপ্ততা আছে যা কখনো ধরা-ছোঁয়া বা জানা যাবে না। যেমন, আইনস্টাইন কখনো অনিশ্চয়তাসূত্র স্বীকার করেননি এবং এটির কারণে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা একটি অসম্পূর্ণ তত্ত্ব বলে সর্বদা মনে করতেন।
তবুও, সার্বিকভাবে গ্রহণযোগ্যতার অভাব অনিশ্চয়তা নীতিটিকে মুছে ফেলতে পারেনি। তাছাড়া অনিশ্চয়তাসূত্র এই মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে পারে এবং এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করারও অবকাশ নেই।

ইলেক্ট্রন কক্ষপথ বিষয়ক বোরের চিত্র অনুযায়ী মনে হয়, একটি ইলেক্ট্রনের অবস্থান এবং গতি যেকোনো মুহূর্তে একই সময় নির্ণয় করা যায়। শ্রডিঞ্জারের ব্যবহৃত তরঙ্গের আলোকে এটি সম্ভব নয়। একটি ইলেক্ট্রন তরঙ্গ উপর-নিচে ওঠানামা করে এবং এর মাঝে কোনো এক স্থানে ইলেক্ট্রন কণা অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। আমরা কখনো বলতে পারি না কণাটি কোথায় বিদ্যমান থাকে। একভাবে দেখলে, এটি তরঙ্গের সাথে সর্বত্র বিরাজ করে। তরঙ্গের উচ্চতা আমাদের এই সম্ভাব্যতা সম্বন্ধে ধারণা দেয় যে, এটি সেখানে থাকার কথা, কিন্তু এটিকে সেথানে না থাকলেও চলে। এভাবে কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্ভাব্যতা এবং অনিশ্চয়তা ধারণ করে এবং এভাবেই এটিকে মহাবিশ্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে হয়।

যেহেতু কোয়ান্টাম তত্ত্ব এমন বিষয়সমূহ নিয়ে কাজ করে, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে মেলে না। তাই বিজ্ঞানীরা একে “কোয়ান্টাম খেয়াল” বলে ডাকলেন। এর এমন অনেকগুলো দিক আছে যা স্ববিরোধীতাপূর্ণ বলে মনে হয়, তাই বিজ্ঞানীরা এর সবকিছুর সাথে একমত পোষণ করার সুযোগ পেলেন না। হয়তোবা কোনোদিন নতুন আবিষ্কার, নতুন ধারণা এবং নতুন চিন্তাভাবনা এই বিষয়গুলোকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরবে যা এখন ‘হতাশাজনকভাবে রহস্যময়” মনে হচ্ছে।

[বইয়ের সূচীপত্র তথা প্রকাশিত সবগুলো আর্টিকেলের জন্য এখানে দেখুন। বিজ্ঞান পত্রিকায় সম্পূর্ণ বইটিই পড়া যাবে, তবে মুদ্রিত সংস্করণটি সংগ্রহ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন: ছায়াবিথী প্রকাশনী, ফোন: ০১৯১৫৯৩৯৬৬৮]

-ইমতিয়াজ আহমেদ
সম্পাদক, বিজ্ঞান পত্রিকা
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

Share.

মন্তব্য করুন