জিন পুলঃ মিশ্রণের মাধ্যমে প্রজাতির টিকে থাকা

0

একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণের মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রাণিবৈচিত্র্য কেন আছে তা দেখার চেষ্টা করবো। বিজ্ঞানীরা প্রাণিবৈচিত্র্যের ব্যাখ্যায় জিন মিলন বা Gene Pool নামে একটি টার্ম ব্যবহার করে থাকে। জিন পুল বা জিন মিলন শব্দজোড়াকে আক্ষরিক অর্থে যাচাই করলে মনে হবে একাধিক জিন মিলে বুঝি একটি জিন তৈরি করছে। এখানে ইংরেজি pool শব্দটি দিয়ে বোঝানো হচ্ছে একটি তরল ধারণকারী পাত্রে অনেকগুলো জিন আছে এবং এগুলো আলাদা আলাদা না থেকে মিশ্রিত বা এলোমেলো অবস্থায় আছে। কিন্তু বাস্তবে জিন তরলের পাত্রে থাকে না, থাকে জীবের কোষে। আর এটাও মানতে হবে যে, ঢালাওভাবে জিনের একত্রীকরণ অসম্ভব। তাহলে ‘জিন পুল’ শব্দযুগল দ্বারা কী বোঝানো হচ্ছে?

যৌন প্রজননের কথা বিবেচনা করি। প্রত্যেক যৌন প্রজননেই জিন একত্রে অদল-বদল বা মিশ্রিত হচ্ছে। আমরা সকলেই আমাদের বাবা-মায়ের জিনের মিশ্রণে তৈরি। আমাদের বাবা-মা আমাদের দাদা-দাদী ও নানা-নানীর জিনের মিশ্রণে তৈরি। তারমানে আমরাও আমাদের দাদা-দাদী-নানা-নানী চারজনের জিনের মিশ্রণে তৈরি। এই প্রক্রিয়া বিবর্তনের ইতিহাসে যৌন প্রজননের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া সকল প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য প্রযোজ্য। হাজার হাজার বছর ধরে চলে এসেছে এই মিশ্রণ। একদম শুরু থেকে আজকের দিন পর্যন্ত প্রাণীতে জিনের ‘মিশ্রণ’ হতে হতে এমন অবস্থা হয়েছে যে বলা যায় অত্যধিক মাত্রায় মিশ্রিত জিন সম্বলিত প্রজাতি বাস করছে আজকের যুগে। কোনো প্রকার বিকল্প না রেখে ঘটে চলা জিনের এই মিশ্রণই হচ্ছে জিন পুল।

মনে আছে প্রজাতির সংজ্ঞাটা কী ছিল? একদল প্রাণী বা উদ্ভিদ যদি নিজেদের মধ্যে প্রজনন সম্পন্ন করতে পারে তাদেরকে বলা যায় একই প্রজাতির। না পারলে ধরে নিতে হবে তারা ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির সদস্য। যে সকল প্রাণীরা যৌন জননের মাধ্যমে নিজেদের বংশবিস্তার করে তাদের বেলায় সংজ্ঞাটা সহজে দেয়া যায়। প্রাণী দুটি যদি যৌন জননের মাধ্যমে নিজেদের মতো আরো এক বা একাধিক প্রাণী উৎপন্ন করতে পারে তাহলে তারা একই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে তাদের মাঝে যদি যৌন প্রজনন সম্ভব না হয় কিংবা সম্ভব হলেও এর ফলে যদি তাদের তাদের মতো কোনো প্রাণীর জন্ম না হয় তাহলে তারা ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির সদস্য। এখানে দেখা যাবে প্রজাতির সংজ্ঞাটা কেন গুরুত্বপূর্ণ।

যদি একটি দলের ভেতর দুটি প্রাণী একই প্রজাতির সদস্য হয় তাহলে এর দ্বারা এটা বোঝায় যে, তারা একইরকম জিন পুলের অন্তর্গত। তাদের মিশ্রণে সামান্য পার্থক্য থাকলেও বিরাট একটা অংশে ঠিকই মিল রয়েছে। অর্থাৎ তারা জিন পুলের একই লাইনে আছে। যদি দুটি প্রাণী ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির হয় তাহলে তারা একই রকম জিন পুলের অন্তর্গত নয়। তাদের DNA-তে এমন পরিমাণ পার্থক্য আছে যে সন্তান উৎপাদনের সময় তা মিশ্রণ বা অদল বদল করতে পারবে না। এমনকি তারা সবসময় একই এলাকায় অবস্থান করলে এবং একসাথে দিনের পর দিন থাকলেও এটা সম্ভব নয়।

যদি একই প্রজাতির দুটি দল পরিবেশগত কারণে কোনো বাধা দ্বারা বিচ্ছিন্ন থাকে তাহলে তাদের জিন পুলের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা চলে আসার সুযোগ থাকে। ভিন্ন হতে হতে যদি এমন অবস্থায় আসে যে, এরা পুনরায় জৈবিকভাবে মিলিত হলে তাদের দ্বারা আর বংশবৃদ্ধি সম্ভব হয় না তখন তারা পরস্পর ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি বলে গণ্য হয়। এই পরিস্থিতিতে তাদের জিন পুলের ধারাতে এমন পরিমাণ পার্থক্য তৈরি হয় যে এদের মাঝে পারস্পরিক DNA মিশ্রণ আর কখনোই সম্ভব হয় না। এবং এভাবেই আজীবন ধরে চলতে থাকে। একবার আলাদা হয়ে গেলে পরে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর একত্রে থাকলেও পরস্পর একই প্রজাতিতে একীভূত হওয়া সম্ভব হয় না।

দলের প্রাণীর জিনের মধ্যে খুব বেশি ভিন্নতা চলে আসলে তারা স্বতন্ত্র প্রজাতি বলে গণ্য হয়। Credit: Dave McKean

দলের প্রাণীর জিনের মধ্যে খুব বেশি ভিন্নতা চলে আসলে তারা স্বতন্ত্র প্রজাতি বলে গণ্য হয়। Credit: Dave McKean

মোটা দাগে বিবর্তন শব্দটির মানেই হচ্ছে জিন পুলের মধ্যে পরিবর্তন। জিন পুলের মধ্যে পরিবর্তন বলতে বোঝায় প্রয়োজনের তাগিদে কিছু কিছু জিন বেশি গুরুত্ব পায় আবার প্রয়োজন না থাকলে কিছু কিছু জিন গুরুত্বহীন হয়ে যায়। যে জিনগুলো স্বাভাবিক বা ‘কমন’ জিন হিসেবে ব্যবহৃত হতো সেগুলো হয়ে যায় দুর্লভ। বছরের পর বছর প্রয়োজন না পড়লে সে জিন হয়ে যায় বিলুপ্ত। আবার যে জিনগুলো দুর্লভ অবস্থায় থাকে সেগুলো হয়ে যেতে পারে ‘কমন’। সবই প্রয়োজনের উপর নির্ভর করে। এবং জিনের এই কমন-আনকমন-দুর্লভ-বিলুপ্তি প্রভাব রাখ প্রজাতির আকার, রঙ আচরণ খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি গুণাবলীতে। ধীরে ধীরে প্রাণী বিবর্তিত হয় কারণ তার জিন পুলের মধ্যে জিনের পরিবর্তন হয়। বিবর্তন বলতে আসলে ঠিক এই জিনিসটাকেই বোঝায়।

প্রজন্মের পরিবর্তনের সাথে জিন পুলের পরিবর্তন কেন হয়? হুম, ভালো প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি আসলে পাল্টা প্রশ্ন চলে আসবে- প্রজন্ম বয়ে চলার সাথে সাথে জিন পুলের পরিবর্তন কেন হবে না? ভাষার মধ্যে শব্দের কথা চিন্তা করলেই তো হয়। আজকের যুগের বাংলা ভাষার অস্থির, ফাটাফাটি, চরম জটিল, পাঙ্খা ইত্যাদি শব্দগুলো খেয়াল করলে হয়ে যায়, এরা একসময় কী শব্দ হিসেবে ছিল আর আজকে তারা কী অর্থ প্রকাশ করছে। আরেকটা উদাহরণ না দিয়ে আমি (শ্রাবণ) একদমই এগুতে পারছি না। ‘মামা’ সাধারণত আমরা মায়ের ভাইকে বুঝি। কিন্তু এই যুগে ঘরে-বাইরে-রাস্তায়-দোকানে-অনলাইনে সবখানে সবাইকে সম্বোধনের একটাই শব্দ, সেটা হচ্ছে ‘মামা’। বাবা-চাচা-বন্ধু-বান্ধব সবাই মিলে বাসের হেল্পার, রিকশাওয়ালা, দোকানদার, সিগারেট ব্যাপারী, পান ব্যাপারী সবাইকেই মামা বলে সম্বোধন করে। অর্থাৎ আজকের যুগের প্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে দেখা যায় মামা শব্দটি তার মূল অর্থ ‘মায়ের ভাই’ থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছে অর্থাৎ বিবর্তিত হয়েছে। আজ থেকে ৩০ বছর পর এই শব্দের কী অবস্থা হবে? মূল অর্থটি প্রধান অর্থ হিসেবে থাকবে নাকি পরিবর্তিত অর্থটি প্রধান হয়ে যাবে? দেখা যাক সময় কী বলে। [ভাষাও অনেকটা প্রাণিবৈচিত্র্যের মতো। নতুন প্রাণী উৎপত্তির ক্ষেত্রে যে যে উপাদানগুলো প্রভাবক হিসেবে কাজ করে, একইভাবে তারা নতুন ভাষার উৎপত্তির ক্ষেত্রেও কাজ করে। ভাষার বৈচিত্র্য ও ভাষার বিবর্তন তথা ধীর রূপান্তর নিয়ে বিজ্ঞান পত্রিকায় প্রকাশিত “প্রাণিবৈচিত্র্য বনাম ভাষাবৈচিত্র্য” নামের লেখাটি দেখুন।] 

বাধা বা বিচ্ছিন্নতার কারণে জিন পুলের মধ্যে পরিবর্তন সাধিত হয়। তবে বিবর্তন মানে শুধুই পরিবর্তন সাধিত হওয়া নয়, বিবর্তন বলতে এর চেয়েও বেশি কিছু, এর চেয়েও গঠনগত কিছুকে বোঝায়। শুধু যদি জিন পুলের পরিবর্তনই মুখ্য হতো তাহলে বিবর্তন প্রক্রিয়া হতো এলোমেলো, বিবর্তন হতো প্রজাতির জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে এই প্রক্রিয়ায় খুব সন্দর একটি প্রভাবক কাজ করে। এটি হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচন। অর্থাৎ প্রকৃতির প্রয়োজনের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য নিজেদের মাঝে পরিবর্তন। প্রকৃতি যদি পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং প্রজাতি যদি তার সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত না হয় তাহলে তার বিলুপ্ত হয়ে যাবার সম্ভাবনা প্রবল। আবার প্রকৃতির সাথে তাল না মিলিয়ে বেখাপ্পাভাবে পরিবর্তিত হলেও এতে বিলুপ্তির সম্ভাবনা প্রবল। তবে সৌভাগ্যক্রমে প্রাণিজগৎ তাল মিলিয়েই প্রাকৃতিক নির্বচনের মাধ্যমে  পরিবর্তিত হয়। এই ব্যাপারটা আবিষ্কার করাই ছিল চার্লস ডারউইনের অসাধারণ কাজ।

প্রাকৃতিক নির্বাচন ছাড়া জিন পুলের পরিবর্তন হলে সেই পরিবর্তন হতো উদ্দেশ্যহীন। প্রাকৃতিক নির্বাচন বিবর্তনকে একটি নির্দিষ্ট দিকে ও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে পরিচালিত করে। এই নির্দিষ্ট দিক ও উদ্দেশ্যই হচ্ছে প্রকৃতিতে টিকে থাকার দিক, প্রকৃতিতে টিকে থাকার লড়াই।

পরিবর্তিত জিন পুলে সেই জিনগুলোই গুরুত্ব পাবে এবং টিকে থাকবে যেগুলো পরিবর্তিত পরিবেশে প্রজাতিকে টিকে থাকতে সাহায্য করে। জিনের কোন জিনিসটা প্রজাতিকে টিকে থাকার জন্য বাড়তি সুযোগ প্রদান করে? এসকল জিন পরিবর্তিত পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেবার জন্য উপযুক্ত শারীরিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ তৈরি করতে অন্য জিনকে সাহায্য করে। এসকল জিন পরিবর্তিত পরিবেশের জন্য উপযুক্ত সন্তান সন্ততি উৎপাদনে অন্য জিনকে সাহায্য করে। প্রজাতি ভেদে উপযুক্ত পরিবেশের ধরণ ভিন্ন হয়। বাদুড় বা পাখির মধ্যে সে সকল জিনিসগুলোই বেশি গুরুত্ব পাবে যেগুলো ডানা তৈরি করে কিংবা ডানা তৈরিতে সাহায্য করে। সিংহের দেহে সেই জিনগুলো গুরুত্ব পাবে যেগুলো দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতার জন্য দায়ী কিংবা যেগুলো লম্বা থাবা বা লম্বা দাঁতের জন্য দায়ী। কারণ লম্বা নখ বা থাবা এবং লম্বা দাঁত শিকার ধরতে ও খেতে সাহায্য করে। আর লম্বা পা ও দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা তো সাহায্য করেই।

সৌজন্যে: pcwallart.com

সৌজন্যে: pcwallart.com

হরিণের মধ্যেও সে সকল বৈশিষ্ট্যগুলোই গুরুত্ব পাবে যেগুলো লম্বা পা ও দ্রুত গতিতে দৌড়ানোর ক্ষমতার জন্য দায়ী। কারণ এই ক্ষমতা তদেরকে বাঘ ও সিংহের মরণ থাবা থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। হরিণের লম্বা পায়ের পাশাপাশি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তি ও তীক্ষ্ণ শ্রবণশক্তি গুরুত্ব পাবে। কারণ এই বৈশিষ্ট্যগুলো দূরে অবস্থান করা শিকারির উপস্থিতি টের পেতে সাহায্য করে। যার শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি বেশি সে দ্রুত শত্রুর উপস্থিতি টের পাবে এবং আগে আগে দৌড়াতে পারবে যা নিঃসন্দেহে তাকে টিকে থাকতে সাহায্য করবে। পাতার মধ্যে থাকা পোকা-বিছাদের কোষে সেসকল বৈশিষ্ট্যগুলোই প্রাধান্য পাবে যেগুলো পাতার রঙের সাথে মিলিয়ে নিজের গায়ের রঙ তৈরি করতে সাহায্য করে। পাতার রঙের সাথে মিশে থাকলে ক্ষতিকর প্রাণীরা সহজে তাদের শনাক্ত করতে পারবে না, যা পোকা-বিছাদের টিকে থাকতে সাহায্য করবে।

পোকা-বিছাদের কোষে সে জিনগুলোই প্রাধান্য পাবে যেগুলো তাদেরকে পাতার সাথে মিশে থাকতে সাহায্য করে। Credit: Pinterest

পোকা-বিছাদের কোষে সে জিনগুলোই প্রাধান্য পাবে যেগুলো তাদেরকে পাতার সাথে মিশে থাকতে সাহায্য করে। Credit: Pinterest

প্রজাতি নিজেও জানে না তার কোন বিবর্তন কোন দিকে হচ্ছে। এ এক আশ্চর্য অবচেতন প্রক্রিয়া যা প্রতিনিয়তই চালু আছে, যা প্রতিনিয়তই বিদ্যমান আছে। এই ব্যাপারটা অনুধাবন করার পর কেউ যদি কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদের দিকে তাকায় তাহলে বিজ্ঞানের চোখে দেখলে মনে হবে এ এক আশ্চর্য জিনের মেশিন। এ এক আশ্চর্য পরিবর্তনশীল মেশিন। মনে হবে আমি তাকিয়ে আছি এমন এক প্রজাতির দিকে যে টিকে থাকার জন্য প্রাণপণে নিজের অজান্তেই নানা কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে। এমনকি কেউ যদি আয়নার দিকে তাকায় তখনো মনে হবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুই পায়ের প্রাণীটিও জিনের এক মেশিন পরিবর্তনশীল জিনের আশ্চর্য মেশিন। [রিচার্ড ডকিন্স এর বই The Magic of Reality-র ৩য় অধ্যায়ের শেষ অংশ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা।]

-সিরাজাম মুনির শ্রাবন
সহ-সম্পাদক, বিজ্ঞান ব্লগ
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

Share.

মন্তব্য করুন