জিকা ভাইরাস সংক্রামণঃ প্রেক্ষাপট বাঙলাদেশ

0

জিকা ভাইরাস ক্রমশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এবং শহরে (যেমন, সিঙ্গাপুর, আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি, ফ্লোরিডা), এবং অনেক দেশে ইতিমধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রামণ মহামারী পর্যায়ে চলে গেছে বা যাচ্ছে (যেমন, ব্রাজিল, কলম্বিয়া)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইবোলার পরে এখন জিকা ভাইরাসে সংক্রামণে পরবর্তী মহামারীর সম্ভাবনা আছে বলে ঘোষণা দিয়েছে, এবং অনেক দেশকে বিশেষভাবে সর্তক করে দিয়েছে সংক্রামণের সম্ভাবনা থাকার ব্যাপারে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ অথবা পরিকল্পনার নির্দেশনা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশ জিকা ভাইরাসের সংক্রামণের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি এক গবেষণাপত্র মতে আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশ, বিশেষ করে ভারত, চীন, ফিলিপিনস, ইন্দোনেশিয়া, নাইজিরিয়া, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, এবং বাংলাদেশ, ইত্যাদি দেশের প্রায় ২.৬ বিলিয়ন মানুষের বিশাল অংশ জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে (যদি এইসব দেশে জিকা ভাইরাস ব্রাজিল কিংবা কলম্বিয়ার মতো মহামারী আকার ধারণ করে)।

গবেষকরা উপরে উল্লেখিত দেশগুলোতে জিকা ভাইরাসের সংক্রামণের ঝুঁকি নির্ণয়ের জন্য আকাশপথে মাসিক ভ্রমণের হার, দেশগুলোর গত ৫০ বছরের জলবায়ুর উপাত্ত, জনসংখ্যার পরিসংখ্যান, এবং স্বাস্থাখাতে ব্যয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গাণিতিক মডেল তৈরি করে ঝুঁকি নির্ণয় বা অনুমান করেছেন। এছাড়া তারা জিকা ভাইরাসের সাথে মিল থাকা ডেঙ্গু ভাইরাসের বিস্তার ও সংক্রামণকে-ও মডেল করে জিকা ভাইরাসের বিস্তার ও সংক্রামণ সম্পর্কে ধারণা লাভ করেছেন। গবেষকরা আশা করছেন যে আতংক সৃষ্টি নয়, বরং এই্সব উপাত্ত ও ফলাফল এইসব দেশে মানুষের মাঝে সচেতনা আনবে, এবং দেশগুলোর সরকার ও স্বাস্থাখাতকে উৎসাহ করবে তাদের সীমিত সম্পদ এই রোগ মহামারী রূপ ধারণ করলে কীভাবে কাজে লাগানো যাবে সেটি আগে থেকেই নির্ধারণ ও পরিকল্পনা করতে। যদিও বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) বলছে যে বাংলাদেশে জিকা ভাইরাসের সংক্রামণের সম্ভাবনা কম। তবে তারা এর পেছনে যেসব যুক্তি দিয়েছে (যেমন- বিমানবন্দরে জিকা ভাইরাস-আক্রান্তদের সনাক্ত করার জন্য থারমাল ক্যামেরা বসানো) তা রোগ সংক্রামণ প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট পদক্ষেপ নয়, বরং রোগী সনাক্তকরণের জন্য অতি প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে।

সিঙ্গাপুর কিংবা আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বাংলাদেশে জিকা ভাইরাসের সংক্রামণের সম্ভাবনা বেশি কারণ এখানের গড় তাপমাত্রা অনেক বেশি এবং বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ এমন যে যা জিকা ভাইরাস বহনকারী দুই ধরণের এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য সহায়ক। এছাড়া বাংলাদেশে বাণিজ্য ও বিভিন্ন কারণে আক্রান্ত দেশগুলো থেকে প্রচুর লোক আসেন অথবা বাংলাদেশের জনগণ কর্মসংস্থান ও অন্যান্য কারণে আক্রান্ত দেশগুলো আছেন অথবা ভ্রমণ করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশে জনবসতির হার (গড়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে কতোজন মানুষ বসবাস করেন) অনেক, ফলে যদি সংক্রামণ কিংবা আক্রান্ত হওয়া শুরু হয়ে যায় তবে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ভয়ংকর কথা হচ্ছে যে বড় ধরণের দুর্যোগ বা মহামারী মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, অর্থ, অর্থাৎ স্বাস্থ্য সম্পদ আমাদের নেই। বাঙলাদেশের প্রতিজন মানুষের পেছনে গড়ে মেডিকেল সেবা বাবদ সরকারি খরচ (সবধরণের খরচ মিলিয়ে) ২০১৪ সালে ছিলো মাত্র ৩০.৮৩ ইউএস ডলার বা ২২৫০ টাকা। এই সংখ্যা তুলে ধরে বাঙলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে অপ্রতুল সরকারি বরাদ্দ ও বিনিয়োগ। বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এই ব্যাপারটি সহজে চোখে পড়ে। ১৯৯৯-২০০২ সালে যখন ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রামণ বেড়ে গিয়েছিলো তখনো ব্যাপারটি চোখে পড়েছিলো। অর্থাৎ, উপরে উল্লেখিত কারণগুলো, বিশেষ করে জলবায়ু এবং ভাইরাস বহনকারী মশার উপস্থিতি, এবং কারণগুলোর সমন্বয় বা মিথস্ক্রিয়ার কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ জিকা ভাইরাসের সংক্রামণের জন্য অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।

১৯৪৭ সালে উগান্ডার জিকা বনে প্রথম সনাক্ত করা জিকা ভাইরাস মূলত দিনের বেলায় সক্রিয় দুই ধরণের (Aedes aegypti  ও Aedes albopictus) এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রামণের দিক থেকে এটির ডেঙ্গু, পীতজ্বর, ওয়েস্ট নাইল রোগের ভাইরাসের সাথে মিল রয়েছে। যদিও ১৯৫০ দশক থেকেই এই ভাইরাসে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকলে-ও মূলত ২০০৭ থেকে ২০১৬ সালে এই ভাইরাস প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বদিকের দেশসমূহ ও আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলোতে অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত সংক্রামিত হতে থাকে এবং ২০১৫-১৬ সালে জিকা ভাইরাস সংক্রামণ মহামারী আকার ধারণ করে। যেমন, ব্রাজিলে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষ জিকা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন এবং শুধুমাত্র অক্টোবর ২০১৫ থেকে জানুয়ারি ২০১৬ পর্যন্ত এই চার মাসেই প্রায় ৩৫০০ জন শিশু জন্মগ্রহণ করেছিলো মাইক্রোসেফালি নিয়ে। মাইক্রোসেফালি হচ্ছে স্বাভাবিকের তুলনায় ছোট আকৃতির মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মগ্রহণ করা, জিকা ভাইরাস গর্ভবতী সন্তানের মস্তিষ্ক গঠন ও স্নায়ুকোষের বিন্যাসব্যবস্থাকে ব্যাহত করে, ফলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। এছাড়া ক্ষেত্রবিশেষে পূর্ণবয়ষ্কদের ক্ষেত্রে জিকা ভাইরাস গিলেন-বারে সিন্ড্রোমের (দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রান্তিক স্নায়তন্ত্রকে আক্রমণের ফলে সৃষ্ট পেশি দুর্বলতাজনিত অবস্থা) কারণ হয়। তবে জিকা ভাইরাসের প্রতি পাঁচটি সংক্রামণের চারটিতেই কোনো বিশেষ উপসর্গ বা লক্ষণ দেখা যায় না। যেসব ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা যায় সেইসব উপসর্গসমূহ হচ্ছে জ্বর, হালকা মাথা ব্যথা, অস্থিসন্ধি অথবা কোমরের কাছে ব্যথা, পেশিতে ব্যথা, শরীরে লালচে দাগ বা ফুসকুড়ি হওয়া। উপসর্গগুলো বেশ মৃদু হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হাসপাতালে ভর্তির দরকার হয় না কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর সম্ভাবনা খুবই কম।

তবে প্রশ্ন হতে পারে জিকা ভাইরাস নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কী আছে? প্রথমত, মশা দ্বারা সংক্রামিত অন্যান্য ভাইরাসের (যেমন, ডেঙ্গু) তুলনায় এই ভাইরাসে আক্রান্ত মশা গর্ভবতী মহিলাদের কামড়ালে গর্ভের শিশুর মাইক্রোসেফালি হতে পারে, এবং অন্যান্য মস্তিষ্ক-সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিতে পারে; ফলে এইসব পঙ্গু বা কম বুদ্ধিমত্তার শিশুরা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে না বড় হলে। অর্থাৎ, এই ভাইরাস পরবর্তী প্রজন্মের স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি ভয়ংকর।

দ্বিতীয়ত, এখনো পর্যন্ত এই ভাইরাসের জন্য কোনো টিকা অথবা ওষুধ নেই। তাই প্রতিরোধই এক মাত্র ভরসা। মশার কামড় না খাওয়া (মশারি ব্যবহার করা এবং দীর্ঘ পোষাক পরা), মশার বংশবিস্তার রোধ করা (জমাট পানি যেমন টবে জমানো পানিতে মশা বংশবিস্তার করতে পছন্দ করে) প্রয়োজন। এই ভাইরাস বাতাসবাহিত নয়, অর্থাৎ বাতাসের মাধ্যমে অথবা আক্রান্ত ব্যক্তির পাশাপাশি বা সংস্পর্শে এলেই ভাইরাস সংক্রামিত হবে না, তবে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তগ্রহণ অথবা আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে যৌনমিলনের ফলে সংক্রামিত হয় (যা ডেঙ্গু ভাইরাসের ক্ষেত্রে হয় না)।

সাধারণত ৫-১২ দিনের মাঝে উপসর্গগুলো আপনিতেই সেরে যায়, তবে ভাইরাসটি দীর্ঘদিন (প্রায় ৭২-৯০ দিন পর্যন্ত) আক্রান্তের শরীরে টিকে থাকতে পারে। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির উচিত পর্যাপ্ত বিশ্রামের, প্রচুর পানি ও সুষম খাবার খাওয়া। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন-ও করা যায় উপসর্গের জন্য।

জিকা ভাইরাসের সংক্রামণের সাথে ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রামণের মিল রয়েছে। তাই ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রামণের উপাত্ত ও অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জিকা ভাইরাস থেকে কিছু অনুমান করতে পারি। বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রামণ ঘটে (বলা যায় মহামারী আকার ধারণ করে) ১৯৯৯-২০০২ সালের দিকে। তৎকালীন সরকার ও স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তখন ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রামণের ঝুঁকিকে কমিয়ে দেখেছিলো (এখন যেমন জিকার ভাইরাসের ক্ষেত্রে হচ্ছে), এবং সরকার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ কর্মসূচির অভাব ছিলো। এক গবেষণা মতে, সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে রিপোর্ট করা উপাত্ত মতে, শুধুমাত্র ঢাকা, চট্রগ্রাম ও খুলনাতে ২০০০ সালে ৫৫৫১ জন ব্যক্তি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তাদের ১.৭% মানুষ মৃত্যুবরণ করেন, এই হার ২০০২ সালে বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৬১৩২ জন ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়াতে এবং আক্রান্তদের ১.০% জন মৃত্যুবরণ করেন; যদিও গবেষকরা ধারণা করছেন যে সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে রিপোর্ট না করা সংক্রামণ মিলিয়ে এবং সারা বাংলাদেশে আক্রান্তদের সংখ্যা যোগ করলে এইসব সংখ্যা কয়েক গুণ হতে পারে। অর্থাৎ, যেসব এলাকাতে অবকাঠামো ও জনবল নেই, তথ্যউপাত্ত সংগ্রহের (যেমন, গ্রামীণ কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চল) সুযোগ ও সামর্থ্য নেই কিংবা যারা দায়িত্বাধীন সংস্থাতে রিপোর্ট করেন না তাদের সংখ্যা যোগ করলে ডেঙ্গু মহামারীর পরিসংখ্যান আরো ব্যাপক হবে। ডেঙ্গু সংক্রামণের এই ইতিহাস আমাদের ভাবিয়ে তোলে যে সরকার যদি এবার-ও ঝুঁকির সম্ভাবনা কমিয়ে হিসাব করে কিংবা সংক্রামণ ব্যাপক আকার ধারণ করলে কী করা হবে সেইসব পরিকল্পনা না করে অথবা প্রয়োজনীয় বিকল্প ব্যবস্থা না রাখে তবে আমরা আরেকটি মহামারীর সম্মুখীন হতে পারি।

অন্য আরেকটি গবেষণা মতে, ডেঙ্গু ভাইরাসের সময়ে জলবায়ু ও আবহাওয়া সংক্রান্ত বিভিন্ন কারণ, যেমন, বৃষ্টির পরিমাণ, সর্বোচ্চ তাপমাত্রা, এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতা ইত্যাদি কারণগুলো ব্যাপক প্রভাব রেখেছিলো। বাংলাদেশের জলবায়ু ও আবহাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো এই বিষয়গুলো সত্য, তাই ধারণা করা যায় জিকা ভাইরাসের সংক্রামণ যদি হয় তবে এই ব্যাপারগুলো আবার-ও প্রভাব ফেলবে। ডেঙ্গু ভাইরাসের সময়ে প্রাথমিক দিকে এই ভাইরাস, রোগ, উপসর্গ ইত্যাদি বিষয়ে জনগণের, বিশেষ করে গ্রামীণ ও শিক্ষা ও তথ্য পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিতদের সচেতনার অভাব ছিলো; ফলে মশার বংশবিস্তার রোধে এবং ভাইরাসের সংক্রামণ রোধে যেসব দায়িত্ব ব্যক্তি নিজে পালন করতে পারেন সেইসবে যথেষ্ট পদক্ষেপ ছিলো না। তাই জিকা ভাইরাসের সংক্রামণ রোধে এবং আক্রান্তদের জীবনমান যেনো বিঘ্নিত না হয় সেজন্য আমাদের জিকা ভাইরাস ও রোগ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। মনে রাখা দরকার যে সচেতনার অভাব ও নিয়ন্ত্রণহীনতা বোধ থেকেই ভয় ও অসহায়ত্বের সৃষ্টি। তাই জিকা ভাইরাস সম্পর্কে আমাদের ভীত নয় বরং সচেতন হয়ে তথ্যভিত্তিক উপায়ে একে মোকাবিলা করতে হবে।

বাংলাদেশে সম্প্রতি জিকা ভাইরাস সনাক্ত করা হয়েছে কখনো অন্যত্র ভ্রমণ করেননি এমন এক লোকের রক্তে, ফলে ধারণা করা যায় যে তিনি অন্যজনের মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছেন অথবা জিকা ভাইরাস বাংলাদেশে রয়েছে। দুটো ক্ষেত্রেই সংক্রামণের সুযোগ থাকে। সিঙ্গাপুরে ইতিমধ্যে আক্রান্তদের ১৯ জন বাংলাদেশি রয়েছেন। তাই সরকার ও স্বাস্থ্যসংস্থাগুলোকে শুধুমাত্র দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নয়, বহিরাগত উৎস অথবা মাধ্যম দ্বারা জিকা ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। এছাড়া যেহেতু জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রতি পাঁচজনের চারজনই কোনো উপসর্গ দেখায় না তাই আক্রান্তের সংখ্যা তাই অনেক বেশি হতে পারে রিপোর্ট করা সংখ্যা থেকে। সিঙ্গাপুর, যে দেশটি তাদের প্রাত্যহিক জীবন ও অবকাঠামো ইত্যাদি দিকে শৃঙ্খলা ও পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতার জন্য বিখ্যাত, সেই দেশটিতে জিকা ভাইরাসের সংক্রামণ বেড়ে যাওয়া নির্দেশ করে যে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, জনবল থাকলে-ও অনেক সময় ঘটনা অপ্রত্যাশিত দিকে বাঁক নিতে পারে। এইসব ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে। নিত্যনতুন দেশ, যেগুলোতে আগে সংক্রামণের কোনো ইতিহাস নেই, এমনকি জিকা ভাইরাসের অস্তিত্বের হদিস ছিলো না, সেইসব দেশে (যেমন, মালেশিয়া) এর নতুন সংক্রামণ নির্দেশ করে যে বাংলাদেশ-ও ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশের জনগণ যেসব দেশে জিকা মহামারী আকারে বিস্তারিত (যেমন, ব্রাজিল, কলম্বিয়া ইত্যাদি) সেসব দেশে ভ্রমণ বেশি হারে না করলে-ও সিঙ্গাপুর, মালেশিয়া ইত্যাদি দেশ ভৌগলিক দিক থেকে অনেক কাছেই এবং এইসব দেশে জনগণের ভ্রমণ কম নয়, বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিক ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে। সরকারী সংস্থা থেকে বলা হচ্ছে যে বেনাপোল ও বিভিন্ন বিমানবন্দরে যাত্রীদের পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, এখানে বলা দরকার যে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যেনো এতে যাত্রীরা (সে যাত্রী আক্রান্ত হলে-ও) যেনো ভোগান্তির শিকার না হন, কিংবা অন্যান্য যাত্রীরা অসুবিধার সম্মুখীন না হন। কারণ, যেকোন রোগ ও দুর্যোগ মোকাবিলার একটি বড় অংশ হচ্ছে সহমর্মিতা ও মানবিকতা।

এমন-ও হতে পারে যে বাংলাদেশ বা কিছু দেশের মানুষের মাঝে ইতিমধ্যে জিকা ভাইরাসের বিরুদ্ধে অনাক্রম্যতা রয়েছে, তাই এইসব দেশে বিস্তারের প্রচুর সম্ভাবনা থাকলে-ও ব্যাপারটি মহামারী আকার ধারণ করবে না। আমরা এটি আশা করতে পারি। কিন্তু একই সাথে আমাদের সচেতন থাকবে হবে অন্যান্য সম্ভাবনা সম্পর্কে এবং সেইসব ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেয়া দরকার সেই সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন।

আশরাফ মাহমুদ
গবেষক, কবি ও লেখক।
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

Share.

মন্তব্য করুন