পানির দূর্বল ব্যবস্থাপনাই মায়া সভ্যতার পতনের কারণ

0

দূর্বল পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং ক্রমাগত বাড়তে থাকা জনসংখ্যার চাপে সমগ্র মায়া সভ্যতার পতন হয়েছিলো বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন। একটি গাণিতিক মডেল ব্যবহারে করে মানব সভ্যতার সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী এই সভ্যতার পরিসমাপ্তির সূচনা অনুকরণ করা হচ্ছে।

এই মডেলটি ‍শুধু আমাদেরকে ৯০০ খ্রিষ্টাব্দে ভেঙ্গে পরা মায়া সভ্যতা [একটি রহস্য যা নিয়ে শতাব্দি ধরে বিজ্ঞানীদের মাঝে বিতর্ক চলে আসছে] সম্পর্কে জানতেই সাহায্য করবেনা বরং এটা আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে কিভাবে আমাদের বিদ্যমান পানি সংকট সমস্যার মোকবিলা করতে পারি। অষ্ট্রিয়ার ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি থেকে দলের এক সদস্য লিন্ডা কুইল বলেন, “পানি সমাজকে প্রভাবিত করে এবং সমাজ পানিকে প্রভাবিত করে। পানি সরবরাহের পরিমাণ নির্ধারণ করে কি পরিমাণ খাদ্য মজুদ রয়েছে আর এটি জনসংখ্যার বৃদ্ধিতে প্রভাব বিস্তার করে। অপরদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির উদাহরণ স্বরূপ জলাধার সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষ প্রাকৃতিক পানি চক্রের উপর হস্তক্ষেপ করে।”

দলটির এই নতুন গাণিতিক মডেলটি বিশেষকরে বৃষ্টিপাত ও পানি সরবরাহকে প্রাধান্য দিয়ে জনসংখ্যার ঘণত্ব, জন্মহার এবং খাদ্য সরবরাহের মতো প্রধান বিষয়গুলিতে মানুষ কিভাবে উন্নতি করছে তার বর্ণনা করে।

গবেষকগণ সোসিও-হাইড্রোলজি-র অধ্যয়ন করছেন, যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কিভাবে পানি সরবরাহ এবং ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি জনসংখ্যার উপর প্রভাব বিস্তার করে তা জানা। আর এই পদ্ধতির মাধ্যমে তাঁরা বিভিন্ন পরিস্থিতি পছন্দ ও নির্বাচন করতে পারেন এবং বিভিন্ন অবস্থার পর্যালোচনা করে ফলাফল সংগ্রহ করেন। বস্তুত এটি একটি গাণিতিক কৌশল।

যেহেতেু পানির অভাবকেই মায়া সভ্যতা পতনের প্রধান কারণ হিসেবে ভাবা হচ্ছে তাই গবেষক দলটি তাঁদের মডেলের মাধ্যমে সভ্যতাটির বিভিন্ন উপাদানসমূহ পরিচালনা করে দেখতে চাচ্ছেন। তাঁরা মায়া সভ্যতা থেকে পাওয়া খাদ্যের প্রাপ্যতা, জনসংখ্যার ঘণত্বের মতো ঐতিহাসিক উপাদানসমূহ এই মডেলে আরোপ করতে শুরু করেছেন। পরবর্তীতে তাঁরা অনাবৃষ্টি বা জলাভাব সৃষ্টির সম্ভাবতার দিকে নজর দিয়ে এবং তারা কিভাবে এর মোকাবেলা করেছেন সেটা দেখবেন।

লিন্ডা কুইল বলেন, “শুষ্ক মৌসুমের প্রস্তুতি হিসেবে জলাধার নির্মাণের জন্য মায়ানরা সুপরিচিত। আর এখন আমরা আমাদের মডেলের মাধ্যমে মায়ান সমাজে পানি প্রকৌশলের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে পারি। এছাড়াও এতে জলাধারসহ এবং জলাধার ছাড়া উভয় পরিস্থিতি তৈরী করে এদের মাঝে তুলনা করা ও সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব।”

পরবর্তীতে দলটি যদি এসব জলাধার তৈরী করা না হতো তবে কি ঘটতো তা নির্ধারণ করার জন্য গণনা শুরু করেন। আপনি সম্ভবত অনুমাণ করতে পারবেন যদি শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ না করা হতো তাহলে জনসংখ্যার পতন ঘটবে। যেহেতেু আমরা জানি মায়ানরা জলাধার তৈরী করেছিলো তাই এই মডেলে অনুরূপ পরিবেশে তাদের জনসংখ্য প্রত্যাশিত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

গবেষকগণ এই একই জলাধার এলাকাতে তাঁদের গণনা চালিয়ে যেতে থাকেন এবং তাঁরা দেখতে পান দীর্ঘ মেয়াদে জনসংখ্যার আকার জলাধারের আকারের চেয়ে বেড়ে যায়। আর এর ফলে সভ্যতাটি আরেকটা খড়া আসার আগেই ভয়াবহ পানিশূণ্য পরিস্থিতিতে পতিত হয়।

দলটি বলেন, “পানি ব্যববস্থাপনার পকৃতি একই রকম থাকতে পারে কিন্তু জনপ্রতি পানির চাহিদা হ্রাস পায়নি এবং জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। আর এর ফলাফল এতটাই মারাত্মক হয় যে আরেকটা খড়া একটি জাতিকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে যায়।”

গবেষকরা বলেন, কেন মায়া সভ্যতার পতন এত দ্রুত হয়েছিলো তার প্রধান কারণ নিশ্চিত করার জন্য তাদের আরো গবেষণার প্রয়োজন হবে। যদি দলটির আবিষ্কার এই প্রাচীন রহস্যের কোন সমাধান করতে নাও পারেন তবুও মডেলটি ইঙ্গিত করছে যে, বিশ্বের পরিবেশগত সমস্যার ক্ষেত্রে জোড়াতালি দেয়া সমাধানগুলি দীর্ঘ মেয়াদে ফলাফল দিচ্ছেনা। এসব সমাধানের ব্যাপারে আমাদের এখনি মনোযোগ দেয়া উচিৎ।

কুইল বলেন, “প্রশ্নটা যখন দূর্লভ সম্পদের তখন সহজতর সমাধান কখনও সেরা হতে পারেনা এবং কোন কাজেও আসবেনা। এক্ষেত্রে আপনার দরকার হবে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা, এ সম্পদের উপর সমাজের নির্ভশীলতা পুনর্মূল্যায়ন এবং খরচ কমাতে হবে। অন্যথায়, চালাকিপূর্ণ প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে সমাজ নিরাপদ হওয়ার চেয়ে বিপর্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।”

শফিকুল ইসলাম

Share.

মন্তব্য করুন