রহস্যময় ব্ল্যাক হোল

2

Hole শব্দটির অর্থ গর্ত । কিন্তু ব্ল্যাক হোল শব্দটি দ্বারা কোন গর্ত বোঝায় না। ব্ল্যাক হোল এমন একটি জায়গা যেখানে খুবই অল্প জায়গায় অনেক অনেক ভর ঘনীভূত হয়ে রয়েছে। এই অতি বিশাল ভরের কারণে ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণ বলও অত্যন্ত বেশী। এতই বেশী যে কোন কিছুই এর কাছ থেকে রক্ষা পায় না এমনকি সর্বোচ্চ গতি সম্পন্ন আলোও নয়!

অবশেষে আপনার ছিন্নভিন্ন শরীর ব্ল্যাক হোলের একটি বিন্দুতে পতিত হবে। এবং এরপর আপনার ভাগ্যে কি হবে তা বিজ্ঞানীদের জানা নেই! তবে সুখের বিষয় ব্ল্যাক হোল কিভাবে আচরণ করে তা জানার জন্যে আপনার ওখানে যাওয়ার দরকার নেই। বিজ্ঞানীদের বহু বছরের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিরাপদ দূরত্ব থেকে তা আপনি জানতে পারেন।

অবশেষে আপনার ছিন্নভিন্ন শরীর ব্ল্যাক হোলের একটি বিন্দুতে পতিত হবে। এবং এরপর আপনার ভাগ্যে কি হবে তা বিজ্ঞানীদের জানা নেই! তবে সুখের বিষয় ব্ল্যাক হোল কিভাবে আচরণ করে তা জানার জন্যে আপনার ওখানে যাওয়ার দরকার নেই। বিজ্ঞানীদের বহু বছরের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিরাপদ দূরত্ব থেকে তা আপনি জানতে পারেন।

আচ্ছা আপনি যদি ব্ল্যাক হোলের কাছে যান কি হতে পারে! প্রত্যেকটি ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্ত আছে যেটির সীমানায় কোন কিছু আসলে ব্ল্যাক হোল সেই জিনিসকে গ্রাস করে। এখন যদি আপনি ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তে চলে আসেন তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ব্ল্যাক হোল আপনাকে গ্রাস করবে। কিন্তু ঘটনাটা কিভাবে ঘটবে দেখা যাক। ধরা যাক, আপনার পা ব্ল্যাক হোলের দিকে আছে। ফলে আপনার কি ঘটছে তা দেখতে পাবেন! পা ব্ল্যাক হোলের দিকে থাকার কারণে আপনার শরীরের নিচের অংশ বেশী আকর্ষণ অনুভব করবে। আকর্ষণের টানে আপনার শরীর চুইং গামের মত হয়ে যাবে। তারপর একসময় আপনার শরীর নুডুলসের মত হয়ে যাবে।

 

সূর্যের চেয়ে কমপক্ষে দশগুণ বড় নক্ষত্রদের জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে এরা সঙ্কুচিত হতে হতে অতি খুদ্র অন্ধকার বিন্দুতে পরিণত হয়। এধরণের ব্ল্যাক হোলকে বলা হয় স্টেলার মেস (Stellar Mass) ব্ল্যাক হোল। বেশীরভাগ ব্ল্যাক হোলই এধরণের। কিন্তু নক্ষত্রের সঙ্কুচিত হয়ে ব্ল্যাক হোলে পরিণত হওয়ার পরও ব্ল্যাক হোলে নক্ষত্রের সমান ভর ও অভিকর্ষ টান থাকে। আমাদের গ্যালাক্সিতে সম্ভবত ১০০ মিলিয়ন ব্ল্যাক হোল রয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে প্রতি সেকেন্ডে একটি ব্ল্যাক হোল সৃষ্টি হয়। আরেক ধরণের ব্ল্যাক হোল হল সুপার মেসিভ (Super massive) ব্ল্যাক হোল। তাদের এক মিলিয়ন তারার ভর এমনকি এক বিলিয়ন তারার ভরও থাকতে পারে। সুপার মেসিভ ব্ল্যাক হোলরা কোন গ্যালাক্সির মিলিয়ন বা বিলিয়ন তারাকে একত্রে ধরে রাখে। আমাদের গ্যালাক্সিতেও কিন্তু একটি সুপার মেসিভ ব্ল্যাক হোল আছে। সেটির নাম Sagittarius A* (উচ্চারণ জানি না!), যা আবিষ্কৃত হয়েছিল ৪০ বছর আগে।

আগেই বলেছি ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণ এতই বেশী যে এর থেকে দৃশ্যমান আলো, এক্স রে, অবলোহিত রশ্মি কিছুই রক্ষা পায় না। এজন্যই ব্ল্যাক হোল আমাদের কাছে অদৃশ্য। বিজ্ঞানীরা তাই ব্ল্যাক হোল নিয়ে গবেষণা করার সময় খেয়াল করেন ব্ল্যাক হোল তার আশপাশকে কিভাবে প্রভাবিত করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্ল্যাক হোল থেকে প্রায়ই উজ্জ্বল গ্যাস ও তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ফোয়ারা নিক্ষিপ্ত হয়। এধরণের পর্যবেক্ষণ থেকে বিজ্ঞানীরা অতি বৃহৎ ও দারুণ শক্তিশালী ব্ল্যাক হোল আবিস্কার করলেন।

খুব কাছাকাছি চলে আশা তারার গ্যাস ব্ল্যাক হোল নিজের দিকে টানছে। ছবিসুত্রঃ NASA E/PRO , Sonoma State University , Aurore Simonnet

খুব কাছাকাছি চলে আশা তারার গ্যাস ব্ল্যাক হোল নিজের দিকে টানছে। ছবিসুত্রঃ NASA E/PRO , Sonoma State University , Aurore Simonnet

Hlavacek- Larrondo বলেন, “মনে হয় আমরা যে ধরণের আশা করেছিলাম তার চেয়ে বড় ও শক্তিশালী ব্ল্যাক হোল পাচ্ছি এবং যা যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক” Hlavacek- Larrondo একজন নারী এবং জ্যোতির্বিদ (একজন জ্যোতির্বিদ বললেই পারতাম। কিন্তু যারা মেয়েরা সৃষ্টিশীল কিছু করতে পারে না এ ধরণের মত পোষণ করেন তাদের জন্যে জানিয়ে রাখলাম ইনি একজন নারী!)

তিনি আরও বলেন “আমরা জানি বড় ব্ল্যাক হোলে অতি শক্তিশালী গ্যাস কিংবা বিকিরণের ফোয়ারা আছে যা ছড়ালে সহজেই গ্যালাক্সির আকার পার হয়ে যাবে। ভেবে অবাক হতে হয় এত খুদ্র কিছু কিভাবে এত বৃহৎ প্রভাব করতে সৃষ্টি করতে পারে”

ব্ল্যাক হোলের এই উদ্গিরন থেকে আমরা তার আকার সম্বন্ধে ধারণা করতে পারি। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে Hlavacek- Larrondo ও অন্যান্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন যে কিছু কিছু ব্ল্যাক হোল এতই বড় যে তা ‘আলট্রা ম্যাসিভ’ (Ultra massive) নামের নতুন নাম দাবি করে। এধরণের ব্ল্যাক হোল সূর্যের তুলনায় ১০ বা ৪০ বিলিয়ন গুণ বেশী ভর ধারণ করে। Jonelle Walsh নামের আরেকজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী( ইনিও নারী!) বলেন, “৫ বছর আগেও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সূর্যের তুলনায় ১০ বিলিয়ন গুণ ভারী ব্ল্যাক হোলের কথা জানত না” অতি বিশাল ভর যুক্ত এসব ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণ শক্তি এতই বেশী যে তারা গ্যালাক্সি গুচ্ছকে ধরে রাখতে পারে।

আলট্রা ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলরা বিলিয়ন বছর আগে তৈরি হয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে ভর অর্জন করে এত বৃহৎ ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়েছে। বড় ব্ল্যাক হোলরা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে এটিই একমাত্র রহস্য নয়! এই ব্ল্যাক হোলরা কিভাবে সহস্র বিলিয়ন তারা ধরে রাখে তাও বিশাল রহস্য। সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলরা আগে সৃষ্টি হয়েছে নাকি গ্যালাক্সির গুচ্ছ বা ক্লাস্টার আগে সৃষ্টি হয়েছে তা আজও অজানা। Hlavacek- Larrondo স্বীকার করেছেন, “আমরা এখনও এ ব্যাপারে নিশ্চিত নই যে সুপার মেসিভ ব্ল্যাক হোলরা আগে সৃষ্টি হয়েছে তারপর গ্যালাক্সির গুচ্ছ সৃষ্টি করেছে” হতে পারে গুচ্ছই আগে সৃষ্টি হয়েছে।

গত বছরের একটি আবিস্কার ব্ল্যাক হোল নিয়ে রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে। Jonelle Walsh ও তাঁর সহকর্মীরা হাবল টেলিস্কোপের সাহায্যে NGC 1277 নামের একটি গ্যালাক্সি আবিস্কার করেছেন। গ্যালাক্সিটি ২০০ আলোক বছরের চেয়েও অধিক দূরে অবস্থিত। NGC 1277 এর আকার আমাদের মিল্কিওয়ের এক চতুরভাগ। কিন্তু Jonelle Walsh ও তাঁর সহকর্মীদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী গ্যালাক্সিটির কেন্দ্রে একটি ব্ল্যাক হোল আছে যার আকার এই পর্যন্ত যত বড় ব্ল্যাক হোল আবিস্কার হয়েছে তার একটি। ধারণা মতে এটি Sagittarius A* এর তুলনায় ৪০০০ গুণ বড়! Jonelle Walsh এর ভাষায় ‘ব্ল্যাক হোলটি তার গ্যালাক্সির তুলনায় অনেক বড়”

NGC 1277 গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটি ব্ল্যাক হোল পাওয়া গিয়েছে। ছবিসুত্রঃ D. Benningfield/K. Gebhardt/StarDate

NGC 1277 গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটি ব্ল্যাক হোল পাওয়া গিয়েছে। ছবিসুত্রঃ D. Benningfield/K. Gebhardt/StarDate

আগে ধারণা করা হত ব্ল্যাক হোল ও গ্যালাক্সি এক সাথে বড় হয় এবং এক সাথেই বড় হওয়া থেমে যায়। কিন্তু এই নতুন আবিস্কার অনুযায়ী হয় ব্ল্যাক হোল তার আশেপাশের তারা ও ব্ল্যাক হোল খেয়ে বড় শুধু বড়ই হতে থাকে অথবা শুরু থেকেই এটি কোন উপায়ে বেশী বড় হয়ে গিয়েছে।

সব গ্যালাক্সিতেই এধরণের বিন্যাস আছে নাকি তার উলটো অর্থাৎ বড় গ্যালাক্সির কেন্দ্রে ছোট ব্ল্যাক হোল আছে কিনা তা Jonelle Walsh জানতে চান।

ব্ল্যাক হোল এ মহাবিশ্বের অতি রহস্যময় ব্যাপার! আর বিজ্ঞানীরা লেগেই আছে এই রহস্যের পেছনে। আস্তে আস্তে রহস্যের জাল থেকে বেড়িয়ে আসবে এই রহস্যময় ব্ল্যাক হোল। তখন অনেক কিছুই হয়ত ব্যাখ্যা করা যাবে যা এখন আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছি।

[লেখাটি Science for kids ওয়েবসাইটে Stephen Ornes এর লেখা Black hole mysteries এর ভাবানুবাদ। মূল লেখাটি পাবেন এখানে(http://www.sciencenewsforkids.org/2013/05/black-hole-mysteries/)]

-সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ
অনুজীববিজ্ঞানের শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Share.

2 Comments

মন্তব্য করুন