কোয়ান্টাম ফিজিক্স-৯ : ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের শক্তির গুচ্ছ তত্ত্ব

0

[বইটির সূচীপত্র এবং সব খন্ডের লিংক একত্রে দেখুন এখানে]

এক
ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের জন্ম জার্মানির কিয়েল শহরে।  ১৮৫৮ সালে ২৩ এপ্রিল। ম্যাক্সওয়েলের মতো ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের পরিবারও ছিল উচ্চ শিক্ষিত, নামি-দামি। বাবা উইলহেম প্ল্যাঙ্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ছোটবেলাটা প্ল্যাঙ্কের পরিবারের সাথেই কাটে। নয় বছর বয়সে তাঁকে ভর্তি করানো হয় ম্যাকমিলিয়ান জিমন্যাসিয়ামে। এটাকে শরীরচর্চা কেন্দ্র ভাবা ঠিক হবে। এটা বরং কিয়েল শহরের এক বিখ্যাত উচ্চবিদ্যালয়। ওখানকার শিক্ষকরা অত্যন্ত দায়িত্ববান এবং ছাত্রদের প্রতি যত্নশীল। ওই বিদ্যালয়েলরই একজন শিক্ষক হারমান ম্যুলার। পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর অগাধ পান্ডিত্য। তাঁর সাথে ম্যাক্সের বেশ সখ্যতা গড়ে ওঠে। ম্যুলার প্ল্যাঙ্ককে পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন।

১৯৭৪ সাল। জিমন্যাসিয়ামের পাঠ চুকিয়ে প্ল্যাঙ্ক ভর্তি হবেন মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর একান্ত ইচ্ছা পদার্থবিজ্ঞানে পড়া। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক ফিলিপ ভন জলি। প্ল্যাঙ্ক তাঁর কাছে পরামর্শ চাইলেন। পদার্থবিজ্ঞানে পড়লে ভবিষ্যৎ কী?

ভবিষ্যৎ বলতে প্ল্যাঙ্ক কী বুঝিয়েছিলেন? আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা যদি এই কথা কাউকে জিজ্ঞেস করে তো পরামর্শক ধরে নেন, ভবিষ্যৎ বলতে আয়-রোজগারের সম্ভবনা কেমন সেটা জানতে চাইছে! কিন্তু তখনকার ইউরোপ কিংবা এখনকার ইউরোপ-আমেরিকার ছেলেমেয়েদের কাছে ‘ভবিষ্যৎ’ শব্দটার তাৎপর্য অনেক বড়। সেটা টাকা-পয়সার পাল্লায় মাপা যায় না। প্ল্যাঙ্কও ভন জলির কাছে ভবিষ্যৎ বলতে আসলে গবেষণার সুযোগ-সুবিধার কথা জানতে চেয়েছিলেন।

সে যুগের বিজ্ঞানী মহলে একটা ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁরা মনে করতেন পদার্থবিজ্ঞানের সকল সূত্র আবিষ্কার হয়ে গেছে। শক্তির সংরক্ষণশীলতার নীতিই ছিল পদার্থবিজ্ঞানের চূড়ান্ত আবিষ্কার। ভন জলিও প্ল্যাঙ্কের ভেতর সেই ভুল ধারণাটা ঢুকিয়ে দিতে চাইলেন। পদার্থবিজ্ঞানে পড়তে নিরুৎসাহিত করলেন প্ল্যাঙ্ককে।  ফিলিপ ভন জলি সেদিন কি ঘুণাক্ষারেও জানতে পেরেছিলেন, যাঁকে তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন, সেই ছেলেটাই একদিন ওলট-পালট করে দেবে পদার্থবিজ্ঞানের জগৎ! খুলে যাবে কোয়ন্টামের অবারিত দ্বার। সেই দরজা দিয়েই বেরিয়ে আসবে পদার্থবিজ্ঞানের নতুন নতুন সব সমস্যা। নতুন নতুন তত্ত্বের জন্ম হবে। মানুষ সেদিন বুঝবে পদার্থবিজ্ঞানের খুব ক্ষুদ্র অংশ আবিষ্কার করতে পেরেছে। সামনে পড়ে রয়েছে অনন্ত মহাজগৎ। ভন জলি সেটা ভাবতে পারেননি, তাই তিনি প্ল্যাঙ্ককে নিরুৎসাহিত করেছিলেন পদার্থবিজ্ঞানে পড়তে।

১৮৭৪ সালের অক্টোবরে প্ল্যাঙ্ক ভর্তি হলেন মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে। গণিতে। তবে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের সৌন্দর্য তাঁকে পিছু ছাড়ল না। গণিতের সাথে সাথে চর্চা করে গেলেন পদার্থবিজ্ঞানও। পদার্থবিজ্ঞান আর গণিতের মিশেলে অনন্য এক গবেষণায় সঁপে দিলেন নিজেকে।
১৮৭৭ সাল। প্ল্যাঙ্ক চলে গেলেন বার্লিনে। ভর্তি হলেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে। খুব কম মানুষের জীবনে মিউনিখ ও বার্লিন দুই বিশ্ববিদ্যালে পড়ার সৌভাগ্য ঘটে। বার্লিনে প্ল্যাঙ্ক শিক্ষক হিসেবে পেলেন গুস্তভ কার্শফ ও ফ্রেডেরিখ উইলহেমের মতো বিখ্যাত বিজ্ঞনীদের। শুরু হলো তাপগতিবিদ্যার ওপর তাঁর অধ্যায়ন। ক্লয়সিয়াসের তাপের যান্ত্রিক তত্ত্বের ওপর লেখা বইটি মন দিয়ে পড়া শুরু করলেন। তাপগতিবিদ্যায়ই তখন ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের ধ্যান-জ্ঞান হয়ে উঠল। পিএইচডির জন্যও তিনি তাপগতিবিদ্যাকেই বেছে নিলেন। ১৮৭৯ সালে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

এরপর প্ল্যাঙ্ক সেখানেই গবেষণা শুরু করেন। এসময় প্লাটিনাম ধাতুর উপস্থিতিতে হাইড্রোজেন গ্যাসের ব্যাপন নিয়ে গবেষণা করেন তিনি । তবে ওখানেই শেষ প্ল্যাঙ্কের পরীক্ষালব্ধ গবেষণা। এরপর শুধুই তাত্ত্বিক গবেষণা।

১৮৮৫ সালে কিয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক আসে প্ল্যাঙ্কের। শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন সেখানে। পদ প্রফেসর একস্ট্রাঅর্ডিনারিয়াস। পদটা আমাদের দেশের সহযোগী অধ্যাপকের মর্যাদার সমান। ওই বিশ্বদ্যিালয়ে তাঁর পদোন্নতি ঘটেনি। কারণ সেকালের জার্মানিতে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের মর্যাদা তুলনামূলক কম ছিল। তাঁদেরকে একটু খাটো চোখেই দেখা হত। তবু প্ল্যাঙ্ক সেখানে তিনি বছর কাটিয়ে দেন। কারণ পদটা স্থায়ী, মাইনে-কড়িও ভালো। ওখানেই তিনি মেরি মের্ককে বিয়ে করেন।

১৮৮৮ সাল পর্যন্ত কিয়েল বিশ্ববিদ্যালয়েই কাটিয়ে দেন প্ল্যাঙ্ক। সেবছরই ডাক আসে আাগের কর্মস্থল বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আগের বছর তাঁর শিক্ষক গুস্তভ কার্শফ মারা গেছেন। তাঁর পদটা শূন্য। অবশ্য পদটার জন্য বোলৎজম্যান ও হেনরিখ হার্ৎজকেও প্রস্তাব দেওয়া হয়। অজ্ঞাত কারণে তাঁরা রাজি হননি। অতএব প্ল্যাঙ্কের কাছে প্রস্তাব আসে। প্ল্যাঙ্ক সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেননি। কিয়েল ছেড়ে বার্লিনে চলে যান প্ল্যাঙ্ক।
১৮৯২ সালে প্ল্যাঙ্ক পূর্ণাঙ্গ প্রফেসর পদে উন্নীত হন। ১৯২৬ সালে অবসরের আগ পর্যন্ত সেই পদেই বহাল ছিলেন।

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক

প্ল্যাকের ব্যক্তিগত জীবনটা সুখের ছিল না। ১৯০৭ সালে স্ত্রী মেরি মের্ক মারা যান। তাঁর ৬ সন্তান ছিল। ১৯১১ সালে মের্কের এক আত্মীয় ভার্গা ভন হোয়েসলিনকে বিয়ে করেন। ভার্গা এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন।

৬ সন্তানের ৫ জনই মারা যায় প্ল্যাঙ্কের জীবদ্দশায়। বড় ছেলে মারা যান প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্ল্যাঙ্কের বয়স ৭৫। তিনি যুদ্ধকে ঘৃণা করতেন। ঘৃণা করতেন হিটলারের বর্বরতাকেও।  সেই বয়সেও প্ল্যাঙ্ক উচ্চকণ্ঠ। হিটলারের বর্বরতার তীব্র প্রতিবাদ করন। হিটালার কখনো বিরেধিতা বরদাস্ত করতেন না। চরম প্রতিশোধ নেয় হিটলারের নাৎসি বাহিনী প্ল্যাঙ্কের ওপর। তাঁর ছেলে এরউইন প্ল্যাঙ্ককে ধরে নিয়ে যায়। হিটলারকে হত্যার চক্রান্তকারী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করে এবং শেষমেষ তাঁকে হত্যা করে। প্ল্যাঙ্কের বাড়ি লক্ষ্য করে বিমান থেকে বোমা ফেলে  নাৎসি বাহিনী। ঘর-বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। কোনোমতে প্রাণে বাঁচেন প্ল্যাঙ্ক দম্পতি।

শেষ দুটি বছর গটিংগনে কাটান ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক। তাঁর সম্মানে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক সোসাইটি গঠন করা হয় গটিংগনে। তরুণ বিজ্ঞানীদের গবেষণার সহায়তা করাই ওই সোসাইটির মূল লক্ষ্য। ১৯৪৭ সালের ৪ অক্টোবর ৮৯ বছর  মহান এই যুগস্রষ্টা বিজ্ঞানী মৃত্যুবরণ করেন।

হিটলার পরবর্তী জার্মান সরকার প্ল্যাঙ্কের মূল্য বুঝতে ভুল করেনি। কাইজার উইলহেম ইনস্টিটিউটের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট। জগৎজোড়া খ্যাতি এখন এই ইনস্টিটিউটের। তরুণ বিজ্ঞানীদের স্বপ্নের এক গবেষণাস্থল। ১৯৫৮ সালে জার্মান মুদ্রায় বসানো হয় প্ল্যাঙ্কের মুখের ছবি। তাঁর নামে প্রবর্তন করা হয়েছে বড় এক পদক। প্ল্যাঙ্ক পদক। যেকোনো বিজ্ঞানীর মহিমা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে।

দুই
রেলে-জিনসের সূত্রটা আবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক। ওই সূত্রে বলা হয়েছে. তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে কৃষ্ণবস্তুর সর্বোচ্চ বিকিরণের তীব্রতা বাড়ে। ভীনের ভাষায় তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে সর্বোচ্চ বিকিরণের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কমতে থাকে। অর্থাৎ বিকিরণের কম্পাঙ্ক বাড়তে থাকে। কম্পাঙ্ক বাড়তে অসীমে চলে যায়।

এখন হিসাবটা যদি উল্টোভাবে করা হয়, তাহলে দেখা যাবে বিকির্ণ শক্তি বাড়ার সাথে সাথে বস্তুর তাপমাত্রাও বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে তা অসীমের দিকে যেতে থাকে। তাই যদি হয় মহাবিশ্ব নরককু-ে পরিণত হবে।

তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমতে কমতে শূন্যের দিকে চলে যাবে, এটা সত্যি সত্যি দুশ্চিন্তার বিষয়। প্ল্যাঙ্ক বিষয়টা নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন। ভাবতে শুরু করলেন একই সাথে ভীন ও র‌্যালে-জিনসের সূত্রের সমাধান কীভাবে করা যায়, সেটা নিয়েও। ভাবলেন, এমন একটা সমাধান দরকার যেটা বিকিরণের শক্তিকে লাগাম পরাবে। এমন একটা সমীকরণ তৈরি করতে হবে হবে, যেটা বলবে বিকিরণের শক্তি ঘনত্বের একটা মান থকবে। বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমতে কমতে শূন্যে পৌঁছানের যে প্রবণতা গণিতের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সেটাতেও লাগাম পরাবে নতুন এই সূত্র। সেই সূত্র বলে দেবে তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমার একটা সীমা থাকবে। একটা নির্দিষ্ট সীমার পর বিকিরণের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য আর কমবে না। তেমনি বিকিরণের শক্তির একটা নূন্যতম মান নির্ণয় করা যাবে সেই সমীকরণ দিয়ে।

আগেই বলা হয়েছে, তাপগতিবিদ্যা নিয়ে প্ল্যাঙ্কের ব্যাপক আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি সেসময় পর্যন্ত তাপগতিবিদ্যার যতটুক জ্ঞান আবিষ্কার হয়েছে প্রায় সবটুকুই আহরণ করে ফেলেন। পদার্থবিজ্ঞানের অন্য শাখাতেও তাঁর জ্ঞান অপরিসীম। তুখোড় পারদর্শিতা গণিতেও।

প্ল্যাঙ্ক হিসাব কষে দেখলেন, বিকিরণের শক্তির একটা নির্দিষ্ট মান আছে। ওই মানের নিচে বিকিরণের শক্তি নামতে পারে না কখনও। তাই যদি হয়, বিকিরণের শক্তির একটা সর্বনিন্ম মান থাকবে। ওই মানের নিচে বিকিরণের শক্তি নামতে পারবে না কখনো। একেক রংয়ের বিকিরণের জন্য বিকিরণের এই সর্বনিন্ম মানটাও আলাদা আলাদা হবে। সেই সর্বনিন্ম মানটাই হবে বিকিরণ শক্তির সর্বনিন্ম একক। একটা পদার্থ যেমন ভাঙতে ভাঙতে পরমাণু পাওয়া যায়, পরমাণুই বস্তুর ক্ষুদ্রতম একক। যেমন এক টুকরো একটা লোহা নিয়ে দুজন বিজ্ঞানী পরীক্ষা করছেন। একজন বললেন তাতে ১ কোটি পরমাণু আছে। অন্য বিজ্ঞানী বললেন, না, ভুল। লোহার টুকরোতে ১ কোটির বেশি পরমাণু আছে। কতগুলো বেশি? ১০১ টা। লোহার সেই টুকরোই ১ কোটিই থাক আর ১০১ টা বেশিই থাক সব কিন্তু ১ এর সরল গুণিতক। অর্থাৎ পরমাণু সংখ্যা কখনো ভগ্নাংশতে যাবে না। যাওয়া সম্ভব নয়। ক্ষুদ্রতম এককগুলো আসলে এমনই হয়। কোনো বস্তুতে তাদের পরিমাণ সবসময় পূর্ণসংখ্যা দিয়েই গণনা করা হয়। অর্ধেক কিংবা একা বা দুই তৃতীয়াংশ ইত্যাদির জায়গা নেই।

প্ল্যাঙ্ক বললেন বিকিরণের এমন একক আছে। সেই এককটা হলো বিকির্ণ শক্তির। শক্তির একটা সর্বনি¤œ মান থাকবে। একটা নির্দিষ্ট বিকিরণের জন্য শক্তির সর্বনিন্ম মানটাও নির্দিষ্ট।

প্ল্যাঙ্কের এই কথা মেনে নিলে একটা সমস্যা দেখা দেয়। আমরা আলোকে রশ্মি হিসেবে দেখি। সেটা হলো লম্বা আলোর  স্রোত। একেবারে নিরবচ্ছিন্ন  স্রোত যাকে বলে। উৎস থেকে অনবরত সেই স্রোত নির্গত হয়, নিরবিচ্ছিন্নভাবে। আলোর শক্তির নির্দিষ্ট যদি একটা মান থাকে তখন এই নিরবিচ্ছিন্ন কথাটা আর বলা যায় না। একটা রাইস মিলের কথাই ধরা যাক। মিলের হলার থেকে যখন চাল গড়িয়ে পড়ে তখন প্রতিটা চালকে আলাদাভাবে বোঝা যায় না। তার বদলে চালের একটা লম্বা ধারা নিরবিচ্ছিন্নভাবে নিচে পড়তে থাকে। নিরবিচ্ছিন্ন দেখি বলেই কি চালের ধারা নিরবিচ্ছিন্ন?

মোটেও নয়। আর সেটা প্রমাণ করার জন্য বেশিদূর যেতে হয় না। চাল মাটিতে পড়ার পর থেমে যায়। স্তূপ জমে চালের। সেই স্তূপ থেকে খুব সহজেই প্রতিটা চালকে আলাদা আলাদা করে বোঝা যায়। আসলে চালের ধারাকে নিরবিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছিল তার গতির কারণে। একটা একটা আলাদা চাল নিয়ে চালের ধারা তৈরি হয়।

প্ল্যাঙ্ক বললেন, বিকিরণের যে সর্বনিন্ম শক্তি আসলে সেটাকে শক্তির একটা প্যাকেট বলা যেতে পারে। এই প্যাকেটই হলো বিকিরণের ক্ষুদ্রতম একক। উৎস থেকে বিকিরণ বা আলো নির্গত হয় প্যাকেট আকারেই। কিন্তু প্রচন্ড গতিতে একের পর এক প্যাকেট নির্গত হয়। তাই প্রতিটা প্যাকেট আলাদাভাবে আমাদের মস্তিষ্ক অনুধাবন করতে পারে না। সত্যি বলতে কি আমাদের চোখ ও মস্তিষ্ক প্রায়ই আমাদের বিভ্রান্ত করে। চালের ধারাটাও তেমন এক বিভ্রান্তি।

ঝর্নার পানির ধারাও নিরবিচ্ছিন্ন মনে হয়। ট্যাপকল থেকে যে পানি পড়ে সেটাও মনে হয় নিরবিচ্ছিন্ন। ট্যাপকলের পরীক্ষাটা নিজেই করতে পারেন।  ট্যাপকলের চাবি ঘুরিয়ে ছেড়ে দিলে পানি ঝরতে থাকে অঝর ধারায়।  এবার ট্যাপকলের চাবি ধীরে ধীরে আটতে থাকুন। প্রথম দিকে পানির ধারা থাকবে ঠিকই, তবে গতি কমে যাবে। এরপর আর আটুন। পানি একসময় ফোঁটায় ফোঁটায় পড়তে থাকবে। তবে ফোঁটাগুলো একটার পর একটা বেশ দ্রুত গতিতে পড়বে। এরপর আরো ধীরে চাবি আটুন। একটা ফোঁটার পর আরেকটা ফোঁটা আসতে বেশ সময় লাগবে। তবে ফোঁটা একটা পর একটা ধীরেই আসুক আর দ্রুতই আসুক, ফোঁটার আকার কিন্তু সবগুলো সমান। তারমানে এই ফোঁটাই ট্যাপের পানির সর্বনি¤œ গুচ্ছ। এরপর চাবি আরও আটলে একটার পর একটা ফোঁটা আসবে আরও দেরিতে। সেটা ১ সেকেন্ড পর পরও হতে পারে। এরপর চাবি আরও আঁটলে পানির পড়া একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে।

আসলে একই আকারে ফোঁটা সবসময় পড়ে। কিন্তু পানির গতি যখন বেশি থাকে তখন ফোঁটাগুলো আলাদাভাবে বোঝা যায় না। মনে হয় নিরবিচ্ছিন্ন ধারায় পানি পড়ছে। আসলে সবসময় পানি একটা সর্বনিন্ম গুচ্ছ বা প্যাকেট আকারেই ঝরছে। সেই গুচ্ছটা হলো পানির ফোঁটা। আমাদের মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতার কারণে সেটা আমরা বুঝতে পারছি না।

কেন আমাদের মস্তিষ্কের এই সীমাবদ্ধতা? আলোকবিজ্ঞানে এই প্রশ্নটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কোয়ান্টামে সেটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

[বইটির সূচীপত্র এবং সব খন্ডের লিংক একত্রে দেখুন এখানে]

-আব্দুল গাফফার রনি
বিজ্ঞান লেখক
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

Share.

মন্তব্য করুন