Top header

কোয়ান্টাম ফিজিক্স-২ : আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব

0

[বইটির সূচীপত্র এবং সবখন্ডের লিংক একত্রে দেখুন এখানে]

১৬৭৮ সাল। ডাচ বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হাইগেনস বললেন, আলো আসলে এক ধরনের তরঙ্গ। আলো উৎস থেকে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব বুঝতে হলে তরঙ্গ কী সেটা আগে জানা জরুরি।

তরঙ্গ মানে ঢেউ। কম্পন। সমুদ্রের পানিতে বাতাস এসে ধ্বাক্কা মারে। ফলে তৈরি হয় ঢেউ। ছোট-বড় হরেক রকমের ঢেউ।  কখনো কখনো আবার ঢেউয়ের আকার পৌঁছে যায় বিশাল বিশাল অট্টালিকার সমান।

পুকুরের পানি এমনিতে শান্ত। হঠাৎ তারওপর একটা ঢিল ছোড়া হলো। তাহলে পানিতে ঢেউ তৈরি হবে। এই ঢেউ হলো পানির তরঙ্গ।

কেন এই ঢেউ তৈরি হয়?

পানিতে যেখানে ঢিলটা পড়ে সেখানকার পানির অণুগুলোতে সেই ঢিল আঘাত করে। অনুগুলোর ভেতর কম্পন তৈরি হয়। কাঁপতে কাঁপতে সেই অণুগুলো তাদের পাশের অণুগুলোর গায়ে ধ্বাক্কা মারে। পাশের অণুগুলো তখন কাঁপতে শুরু করে। তারা আবার তাদের আশপাশের অণুগুলোকে ধাক্কা মারে। সেগুলো আবার ধাক্কা মারে তাদের চারপাশের অণুগুলোকে। এভাবে কম্পন ছড়িয়ে পড়ে পকুর জুড়ে।

পানির তরঙ্গ

পানির তরঙ্গ

শব্দ কিন্তু এক ধরনের তরঙ্গ। কোনো কোনো বস্তু কোনো বস্তু আরেকটা বস্তুতে আঘাত করলে শব্দ হয়। আসলে দুটি বস্তুতে সংঘর্ষের ফলে কেঁপে ওঠে সেগুলোর আশপাশের বায়ুম-ল। সেই কম্পন শব্দ তরঙ্গাকারে ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।

শব্দ তরঙ্গ

শব্দ তরঙ্গ

আলোও একধরনের তরঙ্গ। তবে একটু ভিন্ন প্রকৃতির। অন্যসব তরঙ্গের ছড়িয়ে পড়তে মাধ্যমের দরকার হয়। যেমন শব্দ নিকে কোনো বস্তু বা বস্তুকণা নয়। শুধুই শক্তি। সেই শুক্ত বায়ুম-লের অণুগুলোতে আঘাত করতে করতে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

আলোক তরঙ্গ

আলোক তরঙ্গ

সাধারণ অর্থে তরঙ্গ দুই প্রকার। অনুদৈর্ঘ্য আর অনুপ্রস্থ তরঙ্গ। একটা স্পিংয়ের কথা ভাবা যাক। স্প্রিংকে টানলে প্রসারিত হয়। প্রসারিত সিপ্রং আবার ছেড়ে দিলে সংকোচন ঘটে। বার বার স্প্রিং টেনে এবং ছেড়ে দিলে স্প্রিংয়ে কম্পনের সৃষ্টি হয়। এই কম্পন এগিয়ে যায় স্পিংয়ের সংকোচন প্রসারণ যেদিকে হয় সেদিকে।

বাতাসের একটা চাপ আছে। এই চাপের কারণে বায়ুম-লে সংকোচান-প্রসারণ ঘটে। এই সংকোচন-প্রসারণের ভেতর দিয়েই চলতে হয় শব্দ তরঙ্গকে। এ ধরনের তরঙ্গকে অনুদৈর্ঘ তরঙ্গ বলে। এই তরঙ্গের বেগ সংকোচন-প্রসারণের দিকে হয়।

 স্প্রিংয়ের সংকোচন প্রসারণ হলো অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের জন্ম হয়


স্প্রিংয়ের সংকোচন প্রসারণ হলো অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের জন্ম হয়

অনুপ্রস্থ তরঙ্গ অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের চেয়ে আলাদা। একটা দড়ি নিয়ে পরীক্ষা করা যেতে পারে। ধরা যাক, দড়িটা বাঁধা আছে একটা খুঁটির সাথে। দড়ির খোলা প্রান্ত ধরে ঝাঁকুনি দিলে দড়িতে ঢেউ সৃষ্টি হয়। দড়ির মাঝখানের অংশগুলো ওঠানামা করে। একবার তরঙ্গশীর্ষ ও একবার পাদবিন্দু তৈরি হবে। একেক্ষেত্রে কম্পনের বেগ কিন্তু সোজা দড়ির দৈর্ঘ বরাবর। অর্থাৎ দড়ির ওঠানামার দিক ও কম্পনের বেগ পরস্পরের লম্ব। এ ধরনের তরঙ্গকে অনুপ্রস্থ তরঙ্গ বলে।

খুঁটিতে বাঁধা দড়িতে অনুপ্রস্থ তরঙ্গের জন্ম হয়

খুঁটিতে বাঁধা দড়িতে অনুপ্রস্থ তরঙ্গের জন্ম হয়

কিন্তু আলোর তরঙ্গ হতে হলে বেশকিছু সমস্যাও সামনে চলে আসে। শব্দ তরঙ্গ মাধ্যম ছাড়া চলতে পারে না। শব্দ বাতাসে তরঙ্গ আকারে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর বাতাসের বুকে ঢেউ তুলে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। তাহলে আলোক তরঙ্গ কীভাবে চলে?

প্রাচীন যুগের বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, গোটা মহাবিশ্বই ডুবে আছে ইথারের তরঙ্গে। নিউটনের মতো হাইগেনসও ব্যবহার করলেন ইথার তত্ত্ব। তিনি বললেন গোটা মহাবিশ্ব এমনকী বস্তুর ভেতরেও রয়েছে ইথারের অস্তিত্ব। আলো উৎস থেকে তরঙ্গকারে ছড়িয়ে পড়ে ইথারের এই মহাসমুদ্রে। তারপর ইথারের বুকে ঢেউ তুলে ছড়িয়ে পড়ে দূর-দূরান্তে।

তরঙ্গ তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল, এটা দিয়ে একই সাথে আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ, অপবর্তন, ব্যাতিচার ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু আলোক তরঙ্গ চলার জন্য যে মাধ্যম কল্পনা করা হয়েছে, সেই ইথারের অস্তিত্ব আদৌ আছে কিনা তা নিয়ে সংশয় ছিল।

তাছাড়া নিউটন তরঙ্গ তত্ত্বের ঘোর বিরোধী ছিলেন। বৈজ্ঞানিক সমাজে তখন নিউটনের ব্যাপক প্রভাব। তার বিপক্ষে কথা বলার মতো বিজ্ঞানী সে সময় হাতে গুণে কয়েকজন ছিল। সুতরাং নিউটনের কণা তত্ত্বের প্রভাবে হাইগেনসের তরঙ্গ তত্ত্ব চাপা পড়ে যায়।

তরঙ্গ তত্ত্বের আরেকটা বড় সমস্যা আছে। একটা পুকুরের কথা ভাবা যাক। পুকুরের মাঝখানে ঢিল ছোড়া হলো। পানিতে ঢিলের আঘাতে পানিতে আলোড়ন উঠবে। সৃষ্টি হবে ঢেউ। তারপর সেই ঢেউ তরঙ্গাকারে ছড়িয়ে সারা পুকুরে। শেষ হয় পুকুর পাড়ে এসে।

ধরা যাক, পুকুরের এক দিকে একটা বাঁশের খুঁটি পোতা আছে। ওখানে তরঙ্গ এসে কী করবে? বাঁশের দ্বারা পানির তরঙ্গ বাধা পাবে। তারপর ঢেউ সেই বাঁশকে দুদিক দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। বাঁশের পেছন দিকে দুপাশ থেকে পাশ কাটিয়ে আসা তরঙ্গ আবার মিলিত হয়।

আলোর তরঙ্গও যদি এমন হয়, বাঁশের পেছনে গিয়ে দু’ভাগ হওয়া তরঙ্গ যদি মিলিত হবে। তাহলে বাঁশটির ছায়া পড়ার কথা নয়। কিন্তু আমরা বস্তুর ছায়া পড়তে দেখি। হাইগেনসের তরঙ্গ তত্ত্ব এই ছায়ার ব্যাখ্যা দিতে পারে না। তারচেয়ে বরং আলোকে কণা হিসেবে দেখলে ছায়ার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে অবশ্য অ্যামেরিকান পদার্থবিদ থমাস ইয়ং তরঙ্গ তত্ত্বের প্রমাণ দেন। চতুর্থ অধ্যায়ে সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে।

[বইটির সূচীপত্র এবং সবখন্ডের লিংক একত্রে দেখুন এখানে]

-আব্দুল গাফফার রনি
বিজ্ঞান লেখক
[ফেসবুক প্রোফাইল]

Share.

মন্তব্য করুন