যে হাঙরটির বয়স ৪০০ বছর

0

এতদিন পর্যন্ত ধারণা করা হতো হাঙর ২০০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। ১৯৫২ সালে বেশ কিছু হাঙরের উপর পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন। তবে গ্রীনল্যান্ডে বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক আবিষ্কার ৬০ বছর আগের সেই তথ্যকে নতুন করে লিখেছে।

বয়সের বিবেচনায় নিজেকে শিশু হিসেবে ভাবার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে নিন। গবেষকরা গ্রীনল্যান্ডে এমন একটি হাঙরের দেখা পেয়েছেন যার বয়স প্রায় ৩৯২ বছর। এই হাঙরটি সাথে আরো কতগুলো হাঙরের সন্ধান পেয়েছেন যাদের গড় বয়স ২৭২ বছর। এই প্রজাতির হাঙরেরা ১০০ বছরের আগে পূর্ণতাই পায় না। সন্তান উৎপাদনে সক্ষম পুরুষ বা নারী হবার জন্য তাদেরকে ১০০ বছর অপেক্ষা করতে হয়। যার অর্থ ১০০ বছরের আগ পর্যন্ত তারা যৌনক্রিয়া সম্পাদনের উপযুক্ত হয় না। সায়েন্স জার্নালে বিজ্ঞানীরা তাদের অনুসন্ধান ও গবেষণার বিস্তারিত প্রকাশ করেছেন।

গ্রীনল্যান্ড অঞ্চলের তরুণ বা বয়স্ক হাঙর (Somniosus microcephalus) প্রকৃতির অদ্ভুত এক সৃষ্টি। সারা বিশ্বে মাংসাশী হাঙরের মাঝে এরা দ্বিতীয় বৃহত্তম। ভরে প্রায় আড়াই হাজার পাউন্ডের মতো হয়।এদের দাঁত গঠনগত দিক থেকে এমনভাবে বাঁকানো যার সাহায্যে শিকারের দেহ থেকে খুব সহজে মাংস ছিঁড়ে খেতে পারে এবং এদের নিজেদের মাংস বিষাক্ত। তবে এরা মানুষের জন্য কোনো হুমকি বহন করে না। এরা সাঁতারে খুব ধীর গতির এবং বসবাস করে সমুদ্রের একদম অন্ধকার তলদেশে।  এরা দিনের অনেকটা সময় অলসভাবে নড়েচড়ে কিংবা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়। এর জন্য এদেরকে ডাকা হয় ঘুমকাতুরে সরুমুখী হাঙর বা Tiny-Headed Sleeper।

অভয়ারণ্যে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে বয়স্ক সেই হাঙরটিকে।

অভয়ারণ্যে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে বয়স্ক সেই হাঙরটিকে।

এই ধরনের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হাঙর স্বভাবতঃই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বস্তু হবে। হাঙরের বয়স নিয়ে গবেষণা হয়েছিল অনেক আগে, ১৯৫২ সালে। বিজ্ঞানীরা ভেবে দেখলেন এতদিন পর এখন সময় এসেছে তাদের বয়সের ব্যাপারটা নতুনভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখার। ভাগ্যক্রমে বিজ্ঞানীরা হাঙর সম্বলিত এলাকায় সময়মতো পৌঁছুতে পারেন। দুর্ভাগ্যক্রমে কিছু হাঙর দুর্ঘটনার কিংবা মাছ শিকারিদের ফাঁদে পড়ে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের কোনো কোনোটির মৃত্যু হয়। বিজ্ঞানীরা এদের দেহ ও চোখ থেকে টিস্যুর নমুনা সংগ্রহ করেন এবং রেডিও ডেটিং প্রক্রিয়া ব্যবহার করে এদের বয়স নির্ণয়ের চেষ্টা করেন।

রেডিও ডেটিং একধরনের বিশেষ প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে পৃথিবীর বয়স কিংবা ফসিলের বয়স নির্ণয় করা হয়। এর জন্য কার্বন-১৪ পরমাণুকে ব্যবহার করা হয়। কার্বন-১৪ আইসোটোপ মূলত কার্বনের তেজস্ক্রিয় রূপ। তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায় এবং একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর মোট মৌলের অর্ধেক পরিমাণ ক্ষয় হয়। বিশেষ এই ধর্মকে বলা হয় অর্ধায়ু। তেজস্ক্রিয়তার অর্ধায়ু ধর্মকে কাজে লাগিয়ে প্রাগৈতিহাসিক বস্তুর বয়স নির্ণয় করা হয়।

ডাঙায় তেজস্ক্রিয়তার ধর্মকে ব্যবহার করে বয়স নির্ণয় করা সহজ হলেও সমুদ্রের বেলায় তার চিত্র ভিন্ন। সমুদ্রের ম্যাকানিজম ডাঙা থেকে একদমই ভিন্ন। তবে বিজ্ঞানীরা এই দিক থেকে ভাগ্যবান বলা যায়। পৃথিবীর জন্য ক্ষতিকর একটা জিনিস তাদের কাজকে সহজ করে দেয়। সেটি হচ্ছে নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৩ সালের ভেতর বিভিন্ন দেশ নিউক্লিয়ার বোমার বেশ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে। ঐ সময় থেকে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন সমুদ্রের তলদেশে একটা বিস্ফোরণে যে বিকিরণ হয় তা সামুদ্রিক প্রাণীর আণবিক পর্যায়ে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণে আবার কার্বন-১৪ আইসোটোপ অবমুক্ত হয়। গ্রীনল্যান্ডের হাঙররাও এমন বিকিরণে আক্রান্ত ছিল। আর এই সুবিধাটিকে কাজে লাগিয়ে ফেলেন বিজ্ঞানীরা।

– সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

Share.

মন্তব্য করুন