পরমাণুর গহীন নিসর্গে | ২: আলো | ২.৫: শক্তির বিভাজন

0

অধ্যায়-২: আলো
অনুচ্ছেদ-৫: শক্তির বিভাজন
[বইয়ের সূচীপত্র তথা প্রকাশিত সবগুলো আর্টিকেলের জন্য এখানে দেখুন]

তড়িৎ, চৌম্বকত্ব, আলো এবং মহাকর্ষ এসবই শক্তির বিভিন্ন রূপ যাদের মাধ্যমে কোনো কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। এদের একটির চেয়ে আরেকটিকে খুবই ভিন্ন ধরনের মনে হলেও একটিকে অন্যটিতে রূপান্তর করা যায়। আমরা এরই মধ্যে দেখেছি বিদ্যুৎকে চৌম্বকত্বে রূপান্তর করা যায়, যা এর বিপরীত প্রক্রিয়ার জন্যও প্রযোজ্য এবং একটি স্পন্দিত তড়িৎচৌম্বকক্ষেত্র আলো উৎপন্ন করতে পারে। মহাকর্ষের প্রভাবে পানির পতন ঘটানো যায়। সেই পতিত পানি একটি টারবাইনকে ঘোরানোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। তাপগতিবিদ্যায় শক্তি এবং এর পারষ্পরিক রূপান্তর সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়।

এ ধরনের রূপান্তর কখনোই পরোপুরি দক্ষতার সাথে হয় না। প্রতিটি প্রক্রিয়ায় কিছু না কিছু শক্তি সর্বদাই হারিয়ে যায়। তবে হারিয়ে যাওয়া শক্তি উধাও হয়ে যায় না, বরং তাপে পরিণত হয় যা শক্তির আরেকটি রূপ। যদি তাপশক্তিকেও আমলে নেওয়া হয়, তাহলে বলা হয় এই যাবৎ কোনো শক্তিই হারিয়ে যায়নি এবং কোথাও কোনো প্রকার শক্তি উৎপন্নও হয়নি। অন্য ভাষায়, এই মহাবিশে¡র মোট শক্তির পরিমাণ সুনির্দিষ্ট। এটিই হচ্ছে শক্তির নিত্যতা সূত্র, কিংবা তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র যা চূড়ান্তভাবে জার্মান পদার্থবিদ হারমান লুডভিগ ফার্দিনান্দ ভন হেলমহলজ (১৮২১-১৮৯৪) ১৮৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত করেন।

একভাবে দেখলে তাপ হচ্ছে শক্তির মৌলিক রূপ। যেকোন ভিন্ন রূপের শক্তিকে পুরোপুরিভাবে তাপে রূপান্তর করা যায়। কিন্তু তাপকে সম্পূর্ণরূপে অপর শক্তিতে রূপান্তর করা যায় না। এই কারণে তাপগতি নিয়ে অধ্যয়ন করার জন্য তাপই হচ্ছে শক্তির সবচেয়ে সুবিধাজনক রূপ।
১৭৬৯ সালে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার জেমস ওয়াট (১৭৩৬-১৮১৯) কর্তৃক যখন প্রথম ব্যবহারিক বাষ্পীয় ইঞ্জিন উদ্ভাবিত হয় তার আগে থেকেই তাপ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হয়ে আসছে। তারপর যখন শক্তির সংরক্ষণশীলতার বিষয়ে মানুষ উপলব্ধি করতে সক্ষম হলো  তখন থেকে এই গবেষণা আরো ব্যপকতা লাভ করেছে। বাষ্পীয়  ইঞ্জিনের আবির্ভাবের পরবর্তী সময়ে তাপ নিয়ে দুই ধরনের তত্ত্ব প্রচলিত ছিল। কিছু কিছু বিজ্ঞানী মনে করতেন, তাপ একধরনের সূক্ষ্ম প্রবাহী পদার্থ যা এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে ভ্রমণ করতে পারে। অন্যদল মনে করতেন, তাপ হচ্ছে একধরনের গতি যা পদার্থের অণু এবং পরমাণুর নড়া-চড়া এবং স্পন্দনের সাথে সম্পর্কিত।

দ্বিতীয় ধারণাটি অথার্ৎ গতীয় (kinetic) তত্ত্বটি শেষ পর্যন্ত যথার্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ম্যাক্সওয়েল এবং অপর একজন অস্ট্রীয় পদার্র্থবিদ লুডভিগ এডওয়ার্ড বোলজম্যান (Ludwig Eduard Boltzmann, ১৮৪৪-১৯০৬) গাণিতিকভাবে তা উপস্থাপন করেন। তাঁরা দেখান, যা কিছুই তাপ হিসেবে পরিচিত তার সবই অণু-পরমাণুর গতি বা স্পন্দনের মাধ্যমে সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। যেমন গ্যাসের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, এর অণু-পরমাণুগুলোর গতি কিংবা স্পন্দনের গড়বেগই তাপমাত্রার পরিমাপ হিসেবে পাওয়া যায়। যদি আমরা এর অণু-পরমাণুর ভরসমূহকেও আমলে নিই। যেকোনো বস্তুর গতিশীল কণাগুলোর মোট গতিশক্তিই ওই বস্তুর মোট তাপের পরিমাপক। গতিশক্তি, বস্তু, ভর ও বেগ থেকে পাওয়া যায়।

স্বাভাবিক ভাবেই এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে, একটি বস্তু যতই ঠাণ্ডা হতে থাকবে তার অণু-পরমাণুগুলোর গতি ততোই কমতে থাকবে। এটি যদি যথেষ্ট পরিমাণ ঠাণ্ডা হয়ে যায় তাহলে এর কণাগুলোর গতিশক্তি একটি সর্বনি¤œ অবস্থায় পৌঁছাবে। এটিকে এরপর আর ঠাণ্ডা করা যাবে না এবং এর তাপমাত্রাও হয়ে যাবে পরমভাবে শূন্য। এই ধারণাটি প্রথম প্রস্তাব করেন এবং স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেন ব্রিটিশ গণিতবিদ উইলিয়াম থমসন (William Thomson, ১৮২৪-১৯০৭)। তিনি লর্ড কেলভিন নামেই সমাধিক পরিচিত। পরমশূন্যের (absolute zero) চেয়ে কোনো বস্তুর তাপমাত্রা সেলসিয়াস স্কেলে যত ডিগ্রি বেশি তা-ই হচ্ছে তার প্রকৃত বা পরম তাপমাত্রা। যদি পরম শূন্য তাপমাত্রা -২৭৫.১৬ oC হয় তাহলে ০ ডিগ্রি হবে ২৭৩.১৫ ০ A (কেলভিন) অথবা ২৭৩.১৫ ০ A (absoulte) (পরম তাপমাত্রা বোঝাতে এখন আর ডিগ্রি (০) প্রতীকটি ব্যবহার করা হয় না, তবে আসিমভের মূল বইতে এর ব্যবহার রয়েছে)।

কোনো বস্তুর যার তাপমাত্রা তার পরিপার্শ্বের চেয়ে বেশি থাকে তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের বিকিরণের মাধ্যমে তাপ হারিয়ে ফেলার প্রবণতা দেখায়। তাপমাত্রা যত বেশি হয় বিকিরণও ততোই তীব্র হয়। ১৮৭৯ সালে অস্ট্রীয় পদার্র্থবিদ জোসেফ স্টেফান (Joseph  Stefan, ১৮৩৫-১৮৯৩) এটি যথার্থভাবে তুলে ধরেন। তিনি দেখালেন যে, মোট বিকিরণ পরম তাপমাত্রার চতুর্থঘাতের সমানুপাতিক। অর্থাৎ, যদি পরম তাপমাত্রা দ্বিগুণ করা হয় (উদাহরণস্বরূপ ৩০০ K থেকে ৬০০ K বা ২৭ oC থেকে ৩২৭ oC) তাহলে মোট বিকিরণ বৃদ্ধি পাবে ২ × ২ × ২ × ২ বা ১৬ গুণ।

ইতিপূর্বে, আনুমানিক ১৮৬০ সালে জার্মান পদার্র্থবিদ গুস্তাভ রবার্ট কার্শফ (Gustav Robert Kirchhoff, ১৮২৪-১৮৮৭) প্রতিষ্ঠিত করেন, কোনো বস্তুর তাপমাত্রা যদি তার পরিপার্শ্ব হতে কম হয় তাহলে তা নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে এবং একইভাবে তাপমাত্রা পরিপার্শ্ব হতে বেশি হলে সেই একই তরঙ্গদৈঘ্য বিকিরণের মাধ্যমে তাপমাত্রা হ্রাস করে। এর ফলশ্রুতিতে জানা গেল, যদি কোনো বস্তু সবরকম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে তাহলে উত্তপ্ত অবস্থায় সব তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোই বিকিরণ করে। বস্তুকে এদের ‘কৃষ্ণবস্তু’ (black body) বলা হয়। যারা আপতিত আলোর কোনো অংশ প্রতিফলিত না করে সবটুকুই শোষণ করে।

বস্তুত এই বিশ্বের কোনো বস্তুই পুরোপুরি সব দৈর্ঘ্যের আলোক তরঙ্গ শোষণ করে না, তবে সরু গর্ত বিশিষ্ট একটি বস্তুর ক্ষেত্রে এমনটি ধরে নেওয়া যায়। কোন বিকিরণ যদি সেই সরু গর্তে ঢুকে যায়, তাহলে তার পক্ষে পুনরায় বের হয়ে আসা সম্ভব হয় না এবং শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি শোষিত হয়ে যায়। কাজেই এধরনের একটি বস্তুকে যখন উত্তপ্ত করা হয় তখন বিপরীত প্রক্রিয়ায় সবরকমের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কৃষ্ণবস্তু বিকিরণই সেই গর্তের ভেতর থেকে বের হয়ে আসার কথা।

কৃষ্ণবস্তুর শোষণ পরীক্ষার সরঞ্জাম। একটি আপাত কৃষ্ণ বস্তুতে একটি ছিদ্র করে দিলে আলো সেই ছিদ্রের ভেতর দিয়ে একবার প্রবেশ করলে আর বেরোতে পারবে না। ফলে আমরা এই ব্যবস্থাটিকে আদর্শ কৃষ্ণবস্তু ধরে নিতে পারি।

কৃষ্ণবস্তুর শোষণ পরীক্ষার সরঞ্জাম। একটি আপাত কৃষ্ণ বস্তুতে একটি ছিদ্র করে দিলে আলো সেই ছিদ্রের ভেতর দিয়ে একবার প্রবেশ করলে আর বেরোতে পারবে না। ফলে আমরা এই ব্যবস্থাটিকে আদর্শ কৃষ্ণবস্তু ধরে নিতে পারি।

১৮৯০ এর দশকে জার্মান পদার্র্থবিদ উইলহেম ভিন (Wilhelm Wien, ১৮৬৪-১৯২৮) সর্বপ্রথম এই ধারণার অগ্রগতি সাধন করেন। যখন তিনি কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ নিয়ে কাজ করেন তিনি দেখতে পান যে, আগের ধারণার সাথে মিল রেখে একটি বিশাল বিস্তৃতির তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ নির্গত হচ্ছে। সবচেয়ে ক্ষুদ্র এবং সবচেয়ে বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণের পরিমাণ খুব কম এবং এদের মাঝামাঝি মানের বিকিরণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। ভিন দেখতে পেলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে সর্বোচ্চ  বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য ক্রমান¡য়ে কমতে থাকে। এই ঘটনা তিনি ১৮৯৫ সালে ঘোষণা করলেন।

স্টেফানের এবং ভীনের সূত্র আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায়। ধরা যাক, একটি বস্তুর তাপমাত্রা আমাদের শরীরের তাপমাত্রার চেয়ে সামান্য বেশি। আমরা যদি এই বস্তুটির কাছে আমাদের হাত রাখি তাহলে এই বস্তু থেকে বিকিরিত উষ্ণতা আমরা কিছুটা অনুভব করব। বস্তুর তাপমাত্রা বৃদ্ধি করলে বিকিরণ আরো তীব্র হবে এবং সর্বোচ্চ বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমতে থাকবে। ফোটানো পানিপূর্ণ একটি কেতলির উষ্ণতা যথেষ্টই অনুভবযোগ্য হবে যদি আমরা আমাদের হাত এর কাছাকাছি নিই। যদি তাপমাত্রা বৃদ্ধি করা হতে থাকতে তাহলে একসময় তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য এতোই ক্ষুদ্র হবে যে আমাদের চোখের রেটিনায় তা অনুভব করতে পারব। আমরা প্রথমে বস্তুটিকে লাল দেখব। কেননা দৃশ্যমান আলোর সীমার মধ্যে লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যই সবচেয়ে বেশি এবং এই ধরনের আলোই তাপমাত্রা বৃদ্ধি করতে করতে প্রথমে নিঃসৃত হবে। যদিও স¡াভাবিকভাবে তখনো সর্বোচ্চ বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য থাকবে অবলাল সীমানায়। তবে এই অবস্থায় নির্গত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সীমার মধ্যে দৃশ্যমান আলোর লাল অংশ কিছুটা ঢুকে যাবে তাই এটি আমাদের দৃষ্টিগোচর হবে।

এরপরে তাপমাত্রা আরো বৃদ্ধির সাথে সাথে বস্তুটি আরো উজ্জ্বলতর হতে থাকবে এবং রংও বদলাতে থাকবে এবং তখন আরো বেশি বেশি ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো বিকিরিত হতে থাকবে। পর্যায়ক্রমে বস্তুটি যখন আরো বেশি তপ্ত হয়ে উঠবে তখন এর রং বদলাতে বদলাতে লাল থেকে কমলা তারপর হলুদ হতে থাকবে। পর্যায়ক্রমে যখন কোনো কিছুর তাপমাত্রা সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রার সমান হবে তখন তা সাদা তপ্ত অবস্থায় পৌঁছাবে যে অবস্থায় সর্বোচ্চ  বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য হবে দৃশ্যমান আলোর সীমা। এটি যদি আরো উত্তপ্ত হতে থাকে তাহলে তার রং হবে নীলচে-সাদা (ধরে নিই যে আমাদের চোখ নষ্ট না করে আমরা এর দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছি) কেননা এ সময় এর সর্বোচ্চ  বিকিরণের সীমা থাকবে অতিবেগুনীর এলাকায়।

তাপ/আলোর এই ক্রমপরিবর্তন উনিশ শতকের বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটু সমস্যা সৃষ্টি করলো, কৃষবস্তুর বিকিরণ অনুধাবন করাটা একটু কষ্টসাধ্য। বিশেষত গাণিতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। ১৮৯০ এর দশকের শেষের দিকে ব্রিটিশ পদার্র্থবিদ জন উইলিয়াম স্ট্রীট (John  William Strutt, লর্ড রেলে (Lord  Rayleigh) নামে পরিচিত, ১৮৪২-১৯১৯) ধরে নিয়েছিলেন যে কৃষ্ণবস্তুর ক্ষেত্রে প্রতিটি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের জন্য বিকিরণের সুযোগ সমান এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে সর্বোচ্চ বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য সুষমভাবে পরিবর্তিত হবে। অনুমান নির্ভর হয়ে তিনি একটি সমীকরণও প্রতিষ্ঠিত করেন, যেখানে তিনি দেখান কীভাবে দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্য হতে ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দিকে যেতে যেতে বিকিরণ সুষমভাবে পরিবর্তিত হয়। যদিও এই সমীকরণে একটি মাঝামাঝি সর্বোচ্চ তীব্রতার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ দেখানো হয়নি যা তরঙ্গদৈর্ঘ্য হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে তীব্রতায় হ্রাস পেতে থাকে।

এর বদলে এই সমীকরণ থেকে দেখা গেল যে, তরঙ্গদৈর্ঘ্য যতই ছোট হতে থাকবে তীব্রতা ততোই বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এর মানে হচ্ছে যে কেউ অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রতর তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সহজেই বিকিরণ করতে পারবে। অতিরিক্ত তাপ খুব সহজেই বেগুনী, অতিবেগুনী কিংবা এর চেয়ে ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিতে পারবে। এই বিষয়টিকে মাঝে মাঝে ‘বেগুনী বিপর্যয়’ বলা হয়ে থাকে। কিন্তু বেগুনী বিপর্যয় কখনো ঘটতে দেখা যায় না। তাই নিঃসন্দেহে রেলে’র চিন্তা-ভাবনায় কোনো কিছু ভুল হয়েছিল। ভিন নিজেও একটি সমীকরণ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যদিও এটি ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণের বণ্টনের ক্ষেত্রে যথার্থতা দেখায় কিন্তু দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ক্ষেত্রে দেখায় না। দেখে মনে হয়, পদার্র্থবিদরা বিকিরণের সীমার অর্ধেকটা করে ব্যাখ্যা করতে পারছেন। কিন্তু পুরো বিকিরণের সীমা একসাথে ব্যাখ্যা করতে পারছেন না।

অবশেষে জার্মান পদার্র্থবিদ ম্যাক্স কার্ল প্ল্যাঙ্ক (Max Planck, ১৮৫৮-১৯৪৭) এই সমস্যাটি আমলে নিলেন। তিনি মনে করলেন, রেলে যেমনটি ভেবেছিলেন কৃষ্ণবস্তু হতে সকল তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণের সম্ভবনা সমান, এই ধারণায় কিছু একটা সমস্যা আছে। কেমন হয় যদি ক্ষুদ্রতর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিশিষ্ট বিকিরণের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম থাকে?

এই ব্যাপারটিকে একভাবে গ্রহণযোগ্যতা দেওয়া যায়, যদি ধরে নেওয়া যায় যে শক্তি নিরবচ্ছিন্ন নয় এবং ইচ্ছামত চিরস্থায়ীভাবে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতরভাগে ভাগ করা যায় না। প্ল্যাঙ্কের সময়কাল পর্যন্ত পদার্র্থবিদরা শক্তিকে নিরবচ্ছিন্ন বলে অনুমোদন দিয়েছিলেন। কেউই কখনো কল্পনা করেননি যে, শক্তি এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দিয়ে গঠিত যাদের আর ভাগ করা যায় না।

প্ল্যাঙ্ক মনে করলেন, শক্তির ক্ষুদ্রতম ভাগ তরঙ্গদৈর্ঘ্য হ্রাসের সাথে সাথে বড় হতে থাকে। এর মানে হচ্ছে, একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিশিষ্ট বিকিরণের তীব্রতা বেশি থাকে যেমনটি রেলে ধারণা দিয়েছিলেন। কিন্তুপর্যায়ক্রমে, আরো ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দিকে যেতে যেতে বিকিরণের ক্ষুদ্রতম অংশ যা প্রেরণ করা যায় তা এত বড় হয়ে যায় যে, এতো বড় শক্তির একককে বিকিরিত করতে বেশ কষ্ট হয়। এই কারণেই বিকিরণের একটি সর্বোচ্চ সীমা থাকবে যেখানে বিকিরণ সর্বোচ্চ হবে এবং এরপর থেকে আরো ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের জন্য বিকিরণের পরিমাণ কমে যাবে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে যখন তাপের তীব্রতা বাড়তে থাকে, তখন শক্তির অপেক্ষাকৃত বড় প্যাকেটগুলো পাঠানোও সহজ হয় এবং তাই সর্বোচ্চ  বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য সরে যেতে পারে, যেটুকু সরে গেলে ভিনের সূত্র কার্যকর হয়। সংক্ষেপে বলা যায়, প্ল্যাঙ্কের অনুমান কৃষ্ণবস্তু বিকিরণের সমস্যার পুরোপুরি সমাধান করল। প্ল্যাঙ্ক এসব ক্ষুদ্র শক্তির এককের নাম দিলেন কোয়ান্টা। quanta, একবচনে quantum; ল্যাটিন ভাষায় যার অর্থ ‘কী পরিমাণ?’। এরপর শুধু একটিই সমস্যা থেকে গেল আর তা হচ্ছে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের একেকটি কোয়ান্টায় এলে কী পরিমাণ শক্তি থাকে তা বের করা।

১৯০০ সালে প্ল্যাঙ্ক তাঁর কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন, যা একই সাথে কৃষ্ণবস্তুর উচ্চ ও নিন্ম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ ব্যাখ্যা করে। এই তত্ত্বটি পরবর্তীতে এতোই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে যে, প্ল্যাঙ্ক তাঁর সময়ে কখনো কল্পনাও করতে পারেননি, যে ১৯০০ সালের পূর্ববর্তী সমগ্র পদার্র্থবিজ্ঞানকে বলা হবে  চিরায়ত  (classical বা ক্লাসিকাল) পদার্থ বিজ্ঞান এবং এর পরবর্তীকালের পদার্থবিজ্ঞানকে বলা হবে আধুনিক পদার্র্থবিজ্ঞান। কৃষ্ণবস্তু নিয়ে এই গবেষণার জন্য ভিন ১৯১১ সালে এবং প্ল্যাঙ্ক ১৯১৮ সালে নোবেল পুরস্কার পান।

[বইয়ের সূচীপত্র তথা প্রকাশিত সবগুলো আর্টিকেলের জন্য এখানে দেখুন। বিজ্ঞান পত্রিকায় সম্পূর্ণ বইটিই পড়া যাবে, তবে মুদ্রিত সংস্করণটি সংগ্রহ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন: ছায়াবিথী প্রকাশনী, ফোন: ০১৯১৫৯৩৯৬৬৮]

-ইমতিয়াজ আহমেদ
সম্পাদক, বিজ্ঞান পত্রিকা
[ফেসবুক প্রোফাইল]

Share.

মন্তব্য করুন