নিজেকে সুড়সুড়ি দেওয়া যায় না কেন?

0

সব কাজ আপাততঃ বন্ধ রেখে নিজেকে সুড়সুড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে দেখুন। অসম্ভব মনে হচ্ছে তাই তো? বিষয়টা বেশ অদ্ভুত বলেই মনে হয়। কেননা, মাঝে মাঝে অন্য কেউ আপনার পিঠে হাত রাখলেই অট্টহাসির উদ্রেক হয় এবং সারা শরীর দুলে ওঠে।

তাহলে কেন আমরা নিজেরা নিজেদের প্রতি একই ধরনের অনুভুতির উদ্রেক করতে পারি না? তবে কার্যকারণে যাওয়ার আগে আমাদের জানতে হবে সুড়সুড়ি জিনিসটা আসলে কি এবং কেন এটি মাঝে মাঝে আমাদের উন্মাদের মতো করে তোলে।

যুক্তরাজ্যের ইউভার্সিটি কলেজ লন্ডনের নিউরোসায়েন্টিস্ট সারাহ-জেইন ব্ল্যাকমোরের মতে আমাদের সুড়সুড়ির অনুভুতির জন্য মস্তিষ্কের দু’টি অংশ দায়ী: একটি সমাটোসেনসরি কর্টেক্স (somatosensory cortex) যা স্পর্শের অনুভুতির জন্য দায়ী এবং অন্যটি  সিঙ্গুলেট কর্টেক্স (cingulate cortex) যা আনন্দের অনুভুতি তৈরি করে। যখন কেউ আমাদের সুড়সুড়ি দেয় তখন এই দুটি এলাকা একত্রে কাজ করার মাধ্যমে আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে ট্রিগার করে। প্রকৃতপক্ষে সুড়সুড়ি আসলে দুই প্রকার, গারগালেসিস (gargalesis) এবং নিসমেসিস (knismesis)।

গারগালেসিস হলো বিকট ধরনের সুড়সুড়ি যা অট্টহাস্যের বা শরীরের দোলায়মান অবস্থা তৈরি করে অপর দিকে নিসমেসিসের মাধ্যমে শরীরে মৃদু সংকোচ বোধ তৈরি হয়। পায়ের পাতায় বা শরীরের অন্যান্য স্থানে পাখির পালক ইত্যাদির মাধ্যমে হালকা স্পর্শ করলে এধরনের সুড়সুড়ি বোধ হয়। অদ্ভুত বিষয় হলো সুড়সুড়ি মোটেও আনন্দদায়ক কোনো অনুভুতি নয় (অন্ততঃ আমাদের অধিকাংশের জন্য) অথচ তারপরও সুড়সুড়িতে আমরা দুনিয়া-দারী কাঁপিয়ে হাসি যেন সবচেয়ে হাস্যকর কৌতুকটি শুনেছি। কিন্তু কেন?

২০১৩ সালের জার্মানির এবারহার্ড কার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষনা অনুযায়ী, কৌতুক এবং  সুড়সুড়ি মস্তিষ্কের রোল্যান্ডিক অপারকুলাম (Rolandic Operculum) নামে একই এলাকায় ট্রিগার করে যা বাক্ এবং আবেগীয় প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। আর আমাদের পূর্বপুরুষগণ অট্টহাসির মাধ্যমে সম্ভবতঃ আগ্রাসন প্রতিহত করতেন যার মাধ্যমে কোনো অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী কাউকে বোঝানো হতো যে সে লড়াইয়ে উৎসাহী নয়। বর্তমান সময়ে যদিও এই প্রয়োজনীয়তা আর নেই তবে সুড়সুড়ির ফলে অট্টহাসির অভ্যাসটা এখনো রয়ে গেছে।

তাহলে, আমরা যদিও এখন সুড়সুড়ির শারীরবৃত্তীয় বিষয়ে কিছুটা জেনেছি কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায় কেন নিজেরা নিজেদের সুড়সুড়ি দিতে পারি না? আসলে এর জন্য আমাদের মস্তিষ্কের সেরেবেলাম দায়ী যে সুড়সুড়ির বিষয়টি আগে থেকে অনুমান করতে পারে এবং এই অনুভুতি তৈরির আগেই বাতিল করে দেয়। সায়েন্টিফিক আমেরিকানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্লেকমোর বলেন, “যখন আপনি নিজেকে সুড়সুড়ি দেওয়ার চেষ্টা করবেন, তখন সেরেবেলাম সেই অনুভুতি অনুমান করতে পারে এবং এবং এই পূবানুমান মস্তিস্কের অন্যান্য অংশের সুড়সুড়ির অনুভুতিকে বাতিল করতে কাজে লাগে।”

অন্য ভাষায়, সেরেবেলাম- যা আপনার ঐচ্ছিক নড়াচড়া নিয়ন্ত্রন করে তা জানে আপনার হাত কোথায় আছে এবং কোথায় সেই সুড়সড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে। মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয়ের বাইরেও আরো অনুভুতি আছে যার একটি হলো অঙ্গাবস্থান অনুভুতি, যার মাধ্যমে আপনার মস্তিষ্ক সনাক্ত করে আপনার কোন অঙ্গ কোথায় আছে।

এর ফলে এই অনুভুতি হারিয়ে যায় কারণ এটি আর আপনার জন্য চমক হিসেবে আসে না এবং এমন কিছু থাকে না যা আপনি নিয়ন্ত্রন করতে পারবেন না, যার দ্বারা বোঝা যায় এটি আর কোনো হুমকী নয়। ব্লেকমোর আরো জানান, “রোবটের মাধ্যমে আরো গবেষনা করে দেখা গেছে আপনার নিজের নড়াচড়া এবং সুড়সুড়ির মধ্যে যদি সামান্য দেরি হয় তাহলে তাতে সুড়সুড়ি অনুভব করা যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, এই দেরির পরিমান যত বেশী হবে অনুভুতিও তত তীব্র হবে। তাই আপনি যদি একজোড়া রোবটের জন্য বিনিয়োগ করতে পারেন তাহলে নিজেই নিজেকে সুড়সুড়ি দিতে পারবেন।” আপনার কাছে অদ্ভুত মনে হতে পারে তবে এধরনের রোবটের অস্তিত্ব আছে। [IFLScience অবলম্বনে]

-বিজ্ঞান পত্রিকা ডেস্ক

 

Share.

মন্তব্য করুন