এইচআইভির বিরুদ্ধে ক্রিস্পারের দ্বিমুখী আচরন!

0

জিনোম সম্পাদনার আধুনিকতম অস্ত্র ক্রিস্পার-ক্যাস৯(Crispr-Cas9) কে এইচআইভির বিরুদ্ধে ব্যবহার করে গত এক বছরে প্রায় অর্ধ ডজন গবেষনা প্রকাশিত হয়েছে। সবচাইতে সাম্প্রতিক প্রকাশিত গবেষনায় এই পদ্ধতি ব্যবহারের কার্যকারীতাকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। গবেষকরা বলছেন- যদিও এই আবিষ্কার একটি বাধা উন্মোচন করল কিন্তু সম্পুর্ন ধারনাকে বাতিল করে দেয়না।

এইচআইভি ভাইরাস আমাদের দেহের প্রতিরক্ষার সাথে জড়িত টি-কোষ(T cell) কে আক্রমন করে তার জিনোমকে কোষের ভেতর ঢুকিয়ে দেয় এবং এই কোষের নিজস্ব সরঞ্জামাদি ব্যবহার করে নিজের আরো বহু কপি তৈরি করে কোষটিকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়ে বের হয়।

ক্যানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের চেন লিয়াং এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষনায় টি-কোষকে দেয়া হয়েছিলো বিশেষ অস্ত্র ক্যাস৯ নামক এনজাইম। এই এনজাইমটি এমনভাবে ডিজাইন করা যে এইচআইভির জিনোমকে সনাক্ত করতে পারলেই তা কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলবে এবং ভাইরাসটি আর কাজ করতে পারবেনা। প্রাথমিক ভাবে এই পদ্ধটি কাজ করেছিলো। কিন্তু দুই সপ্তাহ পর গবেষকরা দেখেন আক্রান্ত টি-কোষগুলো থেকে ক্যাস৯ এর আক্রমনকে ফাঁকি দিয়ে নতুন নতুন ভাইরাস তৈরি হচ্ছে। ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করে জানা যায় যেই অঞ্চলের সিকোয়েন্স দেখে ক্যাস৯ এনজাইম ভাইরাসকে শনাক্ত করার কথা সেই অঞ্চলের কাছেই নতুন কিছু মিউটেশন দেখা গেছে।

এটা খুব একটা আশ্চর্যের বিষয় নয়, কারন এইচআইভি এখন পর্যন্ত মানুষের দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সকল প্রকার ভাইরাসনাশক ওষুধকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আসছে। এর কারন হচ্ছে যেই এনজাইম ব্যবহার করে এইচআইভি নিজের জিনোমকে কপি করে তা ত্রুটিপ্রবন। বেশিরভাগ ত্রুটিই ভাইরাসকে কাবু করলেও কিছু ত্রুটি শাপে বর হয়ে যায় এবং এইচআইভিকে বিভিন্ন আক্রমন ফাঁকি দিতে সাহায্য করে।

সব কোষেরই ডিএনএ মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম আছে। যদি কখনো কোন কারনে ডিএনএ কেটে যায়, এই এনজাইমগুলো সেই কাটা যায়গাগুলো জোড়া দিয়ে দেয়। কিন্তু সেই জোড়া ঠিক আগের মত আর হয়না, হয়তো নতুন কিছু বেস ঢুকে(insert) যায় অথবা মুছে(delete) যায় যাকে সংক্ষেপে ইনডেল বলে। এই ইনডেল সৃষ্টির কারনে সেই জিনটা আর কাজ করতে পারেনা। ক্রিস্পার-ক্যাস৯ প্রযুক্তিতেও জিনকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য এই পদ্ধতিই ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কখনো কখনো এটা কাজ করেনা, যেহেতু ইনডেল সৃষ্টি দৈবঘটনা(Random)। টি-কোষের ক্যাস-৯ এইচআইভিতে যেসব ইনডেল তৈরি করছে তার কিছু কিছু এর কোন ক্ষতি করতে পারছেনা, ঠিকই সে নিজের প্রতিলিপি সৃষ্টি করে অন্যান্য কোষকেও আক্রমন করতে পারছে। আবার কিছু কিছু এমন সব ইনডেল তৈরি করছে যার কারনে ক্যাস-৯ নিজেই পরে আর আক্রমনের জন্য ভাইরাসকে চিনতে পারছেনা। একদিকে সে ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করলেও আবার তাকে আক্রমন ফাঁকি দিতে সহায়তা করছে, এ যেন দুমুখো তরবারী!

ক্যাস৯ এর আক্রমনের দুইটি ফলাফল

ক্যাস৯ এর আক্রমনের দুইটি ফলাফল

কিন্তু এখনই সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি, গবেষকরা ধারনা করছেন তারা যেহেতু সমস্যাটা ধরতে পেরেছেন তাহলে এর সমাধান নিয়েও কাজ করতে পারবেন। এমন একটি সমাধান হতে পারে ক্রিস্পার ব্যবহার করে এইচআইভির জিনোমে “কার্পেট বোম্বিং”। যাতে একের অধিক যায়গা কেটে দেয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে এবং এই অবস্থা থেকে প্রতিরোধ সৃষ্টি করা ভাইরাসের জন্য কঠিন হবে। আরেকটি পদ্ধতি নিয়ে গবেষকরা ভাবছেন যাতে ক্রিস্পারের টার্গেট হবে সেসব জিন যা ভাইরাসের জিনোম মেরামতের সাথে জড়িত সেগুলোকে নষ্ট করে দেয়া। কেউ কেউ এমনও ভাবছেন ভাইরাসের নয়, মানুষের জিনোমই এমন ভাবে সম্পাদনা করার কথা যার ফলে আমাদের কোষগুলো এইচআইভির দ্বারা আর আক্রান্ত হবেনা। এই পদ্ধতিকে নিয়ে কাজও হচ্ছে, তবে তাতে ক্রিস্পার নয় জিংক ফিঙ্গার নিউক্লিয়েজ নামক আরেকটি জিনোম সম্পাদনা পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে।

⚫ রুহশান আহমেদ আবীর

Share.

মন্তব্য করুন