Top header

জীবনের সংজ্ঞা

0

১.
গত বছর বেশ একটা আশাব্যাঞ্জক খবর পাওয়া গেলো সেটা হলো CRISPR/Cas9 এর মাধ্যমে এইচআইভি আক্রান্ত রোগ প্রতিরোধক কনিকার ডিএনএ কাটছাট করে এইচআইভি মুক্ত করতে পারে।

আসলে এইচআইভি এমন একটি রেট্রোভাইরাস যেটা মানুষের শরীরে ঢুকে তার রোগ প্রতিরোধক কনিকাসমূহকে নিশানা করে তাদের ডিএনএ তে এইচআইভির ডিএনএর অংশ ঢুকিয়ে দেয়। ফলে শরীরে এই ভাইরাস বহুদিন সুপ্ত অবস্থায় থাকে। যখন শরীরের রোগ প্রতিরোধক কনিকা সমূহের ডিএনএতে এই জীবানুর ডিএনএ তার পর্যায়ক্রমিক বৃদ্ধি ঘটিয়ে অনেকাংশ দখল করে ফেলে তখন শুরু হয় এইডসের প্রকোপ।

CRISPR/Cas9 এমনই একটা পদ্ধতি যার মাধ্যমে CRISPR নামক ডিএনএর একটা অংশ রক্তকনিকার ডিএনএর মধ্যে নিজেকে কপি করে এর বিস্তার ঘটাতে পারে। এটা অনেকটা এমন যে ধরুন একটা খালি গ্লাস হলো আপনার রক্তকনিকার ডিএনএ। এখন গ্লাসে এক ফোঁটা এইচআইভির ডিএনএ রাখলেন। কিছুদিন পর লক্ষ করলেন আপনার গ্লাসের কাচটা পুরোপুরি এইচআইভির ডিএনএ খেয়ে নিজের বংশবৃদ্ধি করে ফেলছে। এখন রক্তকনিকার ডিএনএ হলো উক্ত কোষের আত্মা। আত্মাটাকে খেয়ে যদি অন্য কোনো রোগের ডিএনএ বসবাস করতে শুরু করে তাহলে আপনার শরীরে আর কোনো রোগ প্রতিরোধ করার কোনো ক্ষমতা থাকবে না। আপনি সামান্য জ্বরে ভুগে মারা যাবেন। আপনার ওপর কোনো এন্টিবায়োটিক কাজ করবে না, কোনো ওষুধ কাজ করবে না।

CRISPR/Cas9 যেটা করে সেটা হলো এইচআইভির ডিএনএ যেভাবে একটা ডিএনএ র অংশে ঢুকে নিজের বৃদ্ধি ঘটাতে পারে তেমনি CRISPR নামের ডিএনএ ব্লক ইও এইচআইভি আক্রান্ত কনিকার ডিএনএতে ঢুকে এইচআইভির ডিএনএ কে সরিয়ে একই প্রক্রিয়ায় নিজে প্রতিস্থাপিত হয়ে বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। এই CRISPR নামর ডিএনএ ব্লক আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধক কনিকার ডিএনএব্লকেরইএকটা অংশ।Cas9 হলো আরএনএ দ্বারা তৈরী এমন একটি এনজাইম যেটা এই CRISPR নামক ডিএনএ ব্লককে ক্যাপসুলের মতো নিজের মধ্যে পরিব হন করে জায়গা মতো পৌছে দেয়।

তবে এই প্রক্রিয়াটাতে একটু সমস্যাও আছে সেটা হলো এগুলো অনেক রক্ত কনিকার এইচআইভি আক্রান্ত ডিএনএ না সরিয়ে ভালো অংশও সরিয়ে ফেলে। এতে খুব একটা কাজ হবে না যদি এইচআইভির অংশটা না সরানো হয়। এই প্রক্রিয়া নিয়ে এখনও অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে এবং আশা করা যায় এই প্রক্রিয়াটাকে কার্যকরী করা যাবে কয়েকবছরের মধ্যেই।

তবে এই প্রক্রিয়ার আরো সমস্যা হলো এইচআইভি নিজে নিজে পরিবর্তন হতে পারে। এটা অনেকটা বিবর্তনের মতো। ডারউইনের বিবর্তন অনুসারে পৃথিবীর আদিতেই মানুষ সৃষ্টি হয়নি। স্তন্যপায়ী প্রানী থেকে অনেক পরে নিয়েনডার্থালা তারপর মানুষ ইত্যাদি এসেছে। আবার আজ থেকে ২০০০ বছর আগে যেমন খর্বকায় বেঁটে-খাটো, অস্থিচর্মসার মানুষ ছিলো এখন কিন্তু মানুষের দৈহিক গঠন অনেক উন্নত হয়েছে তার চেহারায়, তার রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা ইত্যাদিতে। তেমনি এইচআইভিও নিজে নিজে খুব দ্রুত বন্ধুর পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।

একটু আগে তেমনি একটা গবেষনাপত্র প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে যে CRISPR/Cas9 এর বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধক ক্ষমতা অর্জন করতে পারে এইডসের এই জীবানু।

২.

আসলে আজকে আমার গল্প করার ইচ্ছে ছিলো অন্য বিষয়ে। সেটা হলো আত্মা বা জীবন। আসলে আমি জানতে চাই আমাদের সৃষ্টি রহস্য।

প্রায় দেড় দশক আগে ক্রেগ ভেন্টার নামের এক লোক চিন্তা করলেন তিনি কৃত্রিম ভাবে জীবনের সৃষ্টি করবেন। কৃত্রিম জীবন বলতে ধরুন কিছু রাসায়নিক দ্রব্যাদি দিয়ে আমাদের কোষের অভ্যন্তরে যে ডিএনএ বা জ্বীন আছে তার প্রোটিন তৈরী করবেন। এই প্রোটিনগুলো পরে জোড়া দিয়ে এমন ডিএনএ তৈরী করবেন যা দিয়ে জীবন্ত কোষ তৈরী করা যায়।এই ভাবে অজৈব পদার্থ দিয়ে যে জীবন সৃষ্টি করা যায় তাকে সিন্থেটিক জীবন বলে। তার প্রায় অর্ধ দশক পর তিনি তাঁর গবেষনায় কিছুটা সফলতা লাভ করলেন সেটা হলো প্রথমে তিনি কৃত্রিমভাবে এমনি ডিএনএ তৈরী করলেন একটা ব্যাকটেরিয়ার। অবশ্য যে ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ উনি কপি করেছিলেন একটু নতুনত্ব আনতে উনি ঐ ব্যাকটেরিয়ার সিকোয়েন্সে নিজের নাম লিখে দিলেন। সেটা এমন যে ব্যাসিক প্রোটিন ব্লকগুলো এমন ভাবে সাজালেন যে তার অদ্যাক্ষর যোগ করলে ক্রেগ ভেন্টার পাওয়া যাবে, তার প্রতিষ্ঠান এবং সহযোগীদের নাম পাওয়া যাবে। তিনি তেমন ভাবেই ডিএনএ গুলো সিক্যুয়েন্স করে একটা ডিএনএ বিহীন কোষে সেটা ঢুকিয়ে দিলেন।

ক্রেইগ ভেন্টর

ক্রেইগ ভেন্টার

কয়েকদিন পর দেখা গেলো ঐ কোষটা অন্যান্য সাধারন কোষের মতোই বিভাজিত হচ্ছে, বংশবৃদ্ধি করছে এবং নিজের জীবনচক্র পূর্ন করছে। তারও প্রায় ৭-৮ বছর পর আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সে পড়া ২ জন ছাত্রের একটা প্রজেক্ট দেয়া হলো যে বাজারে যে ঈস্ট কিনতে পাওয়া যায়, যা আমরা রুটিতে দেই সেই ঈস্ট তৈরী করার তবে এসব অজৈব রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না এই ঈস্ট হলো এক ধরনের ছত্রাক। যাই হোক ঐ ছেলেগুলো প্রায় ৬ মাস খাটাখাটনি করলো। পুরো কাজটিকে ভাগ করে ধাপে ধাপে বিভিন্ন প্রোটিন ব্লক তৈরী করলো, সেগুলো তৈরী করে একটা পূর্ন ডিএনএ তৈরী করলো প্রায় রাসায়নিক পদার্থ দিয়েই। পরে সেই ডিএনএটা অন্য একটা মৃত কোষে প্রতিস্থাপিত করে রেখে দেয়। প্রায় ঘন্টা খানেক পর ঐ কোষের বিভাজন শুরু হয় এবং প্রায় এক সপ্তাহ চলমান ছিলো ঐ কোষটির বিভাজন এবং বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়া

BE8B46DC-0CBB-45A9-A686B3CE664DC2C1

ইস্ট জাতীয় ছত্রাক

আর কিছু দিন আগে ক্রেগ ভেন্টার তার পুরোনো কাজটিকেই আরেকটা নতুন রূপে নিয়ে গেলেন। এবার তিনি কোষের পুরো ডিএনএ তৈরী করলেন না। তিনি প্রয়োজনীয় কিছু প্রোটিন ব্লক দিয়ে একটা অর্ধেক ডিএনএ তৈরী করলেন এবং সেটা একটা মৃতকোষে ঢুকিয়ে দিলেন। মৃতকোষটা এবার আগের মতোই জীবিত হয়ে উঠলো। তার পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিলো একটা কোষের মতো জীবন সন্ঞ্চারনের জন্য ঠিক কত গুলো এবং কোন কোন প্রোটিন ব্লকের দরকার!

এরকম পৃথিবীর বহু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সংজ্ঞা জানার জন্য প্রতিনয়ত গবেষনা করে যাচ্ছে শুধু এটা প্রমান করার জন্য আসলে আত্মা বা রুহ বলে স্বতন্ত্র কোনো অস্তিত্ব আছে কিনা নাকি এই যে এতো জীবনের লীলাখেলা, মানুষ জন্তু জানোয়ারের মধ্যে জীবনে সমারোহ এর সবই কি রাসায়নিক বিক্রিয়া?

মনে করা হলো আপনি কিছু টাকা পেলেন, আগারগাঁওয়ের আইডিবি বিল্ডিং এ গেলেন। ওখানে গিয়ে একটা কেসিং, একটা শক্তিশালী প্রসেসর, এজিপি কার্ড মেমোরী মনিটরস হ আর যা যা লাগে সব কিনে আনলেন। বাসায় এনে জোড়া দিলেন একটা ডেস্কটপ কম্পিউটারের জন্য। কিছুক্ষন পর সব জোড়া দেয়া হয়ে গেলো এখন আপনি পাওয়ার দিলেন ডেস্কটপ কম্পিউটারে। কম্পিউটার চালু হলো কিন্তু তা দিয়ে কোনো কাজ হচ্ছে না। কারন আপনি তাতে অপারেটিং সিস্টেম দেননি। এখন আপনি বাজারে গিয়ে উইন্ডোজ বা লিনাক্স বা অন্য যেকোনো অপারেটিং সিস্টেম কিনে আনলেন এবং আপনার কম্পিউটারে ইনস্টল করলেন। দেখলেন কম্পিউটার জীবন ফিরে পেলো। কিন্তু গান চালাতে গেলে আপনাকে সেখানে গান দিতে হবে। গান চালানোর সফটওয়্যার লাগবে।কিন্তু তার আগে আপনার ড্রাইভার সফটওয়্যার ইনস্টল করতে হবে। নাহলে এজিপি কার্ড, সাউন্ড কার্ড ঠিক মতো কাজ করবে না। ল্যান কার্ডও কাজ করবে না। তো আপনাকে এখন তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিতে হবে কোনটা দিয়ে কিভাবে কাজ করবে। এর পর তাতে আপনি বিভিন্ন সফটওয়্যার দিলেন যাতে সে সেগুলো দিয়ে কাজ করে আপনার প্রয়োজনীয় ফলাফল উপ হার দিতে পারে।

মানুষও কি এমন?

অবশ্য আমার মনে হয় এখনো সময় আসেনি। কারন এরা যা করেছে তা খুবই ছোট একটা কাজ। এক কোষী ব্যাকটেরিয়া বা সরল ছত্রাক দিয়ে মানুষ্য জীবের মতো এত জটিল এবং বুদ্ধিমান জীবনকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। এটা অনেকটা এমন যে আপনি ব হু গবেষনা করে একটা ক্যাপাসিটর আবিষ্কার করলেন যেখানে আপনার ডেস্কটপের প্রসেসরে আছে লক্ষ লক্ষ ট্রানজিস্টর যার নোডে আছে ক্যাপাসিটিভ ক্ষমতা। কিন্তু একটা ধারনা কি করতে পারি না?

⚫ উদাসী স্বপ্ন

তড়িৎ প্রকৌশলী ও বিজ্ঞান লেখক

Share.

মন্তব্য করুন