জীবন্ত প্রাণের প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ

0

জীবন্ত প্রাণকে যন্ত্রপাতির মতো মেরামত করতে আরো একধাপ এগিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীরা এমন একটি প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ তৈরি করেছেন যার সাহায্যে তুলনামূলকভাবে অনেক সহজে জীবন্ত প্রাণকে সাজানো যাবে। সফটওয়ারের মাধ্যমেই একটি কোষকে জীনগতভাবে প্রোগ্রাম করা তথা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করা যাবে।

জীববিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই জীবন্ত কোষকে পরিবর্তন পরিমার্জন করার চেষ্টা করছেন। সেই ১৯৭৩ সাল থেকেই এর যাত্রা শুরু। এতদিন পর্যন্ত অনেকগুলো ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা সফলও হয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ ডায়াবেটিক রোগীদের ব্যবহৃত ইনসুলিন হচ্ছে ইস্ট বা E. Coli ব্যাকটেরিয়ার জীনগতভাবে পরিবর্তিত রূপ। এর পাশাপাশি চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিকও বিভিন্ন প্রকার অণুজীবের জীনগতভাবে পরিবর্তিত রূপ। বায়োফুয়েল সহ অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে সীমিতভাবে জীবন্ত প্রাণের পরিবর্তন পরিমার্জন করা হয়।

কিন্তু এদের সবগুলোতেই প্রাণের পরিবর্তন করা হয়েছে প্রথাগত বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে। এই পদ্ধতি অনেক জটিল। বর্তমানে যে প্রোগ্রামের কথা বলা হচ্ছে এর মাধ্যমে প্রথাগত পদ্ধতির চেয়ে অনেক সহজে সংখ্যা বা বর্ণভিত্তিক কিছু কোডের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

মাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির গবেষকরা তাদের উদ্ভাবিত এই প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজের নাম দিয়েছেন সেলো (Cello)। গবেষকদের দাবী এর সাহায্যে প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে জীবন্ত কোষকে কোনো কাজের নির্দেশনা দেয়া, কম্পিউটারকে নির্দেশনা দেবার মতোই সহজ। এই ব্যাপারে গবেষকদলের প্রধান ক্রিস্টোফার ভয়েট বলেছেন “সময়ের পরিক্রমায় আমরা অনুধাবন করতে পেরেছি যে, জীবন্ত প্রাণ আসলে এতটা রহস্যময় আর অনিশ্চয়তায় ভরা নয়। এতদিন ধরে জীবন্ত প্রাণকে রহস্যময় বলে মনে হয়েছে কারণ এর অভ্যন্তরভাগকে ভেঙেচুরে দেখার ও সংশোধন করার উপযুক্ত পদ্ধতি আমাদের জানা ছিল না।” জীবন্ত প্রাণের রহস্যকে অনুধাবন করতে এই প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

সেলো ভাষাটি মূলত নির্দেশনা দিতে সাহায্য করবে কোন ধরনের প্রমোটার (ডিএনএ-র একটি অঞ্চল) ব্যবহার করতে হবে এবং কীভাবে ‘ডিএনএ সার্কিট’ ব্যবহার করতে হবে। নির্দেশ দেয়া হলে এটি প্লাজমিড এর মাধ্যমে বিন্যস্ত হয়ে মূল ডিএনএ-তে প্রবেশ করবে।

প্লাজমিড হচ্ছে ব্যাকটেরিয়াতে অবস্থান করা একধরণের গোলাকার ডিএনএ সূত্রক। মূল ডিএনএ হতে এরা বিচ্ছিন্ন থাকে। এদের অনন্য এক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে এরা স্বাধীনভাবেই মূল ডিএনএ-তে প্রবেশ করতে পারে এবং স্বাধীনভাবে মূল ডিএনএ থেকে বেরও হতে পারে। কোষের প্লাজমিডকে যদি প্রোগ্রাম করে মূল ডিএনএ-তে প্রেরণ করা যায় তাহলেই তো তুলনামূলকভাবে কম ঝামেলায় আদেশ উপদেশের কাজটা হয়ে যায়! বহিরাগত ডিএনএ প্রেরণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত কোষ বা ক্ষুদ্র প্রাণ পেয়ে যাবেন।

সেলো ভাষা ব্যবহার করে এমন ব্যাকটেরিয়া তৈরি করা যাবে যা তেলে মিশ্রিত অপাচ্য অংশ ধ্বংস করতে পারবে।

সেলো ভাষা ব্যবহার করে এমন ব্যাকটেরিয়া তৈরি করা যাবে যা তেলে মিশ্রিত অপাচ্য অংশ ধ্বংস করতে পারবে।

এই প্রজেক্টের জন্য প্রচুর কাজ করতে হয়েছিল। পুরো দলকে এক দশকেরও বেশি সময় দিতে হয়েছিল এর পেছনে। কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে যেমন সামান্য ত্রুটি পুরো ব্যবস্থাটিকে গড়বড় করে দিতে পারে তেমনই কোষের বেলাতেই সামান্য ত্রুটি অনেক বাজে হয়ে দেখা দিতে পারে। এজন্য খুব সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এমন ধরনের প্রজেক্ট সম্পন্ন হতে অনেক সময় লাগবে।

মজার কথা হচ্ছে এই ল্যাংগুয়েজটি ব্যবহার করে যে কেউই ইচ্ছামতো প্রাণের ডিজাইন করতে পারবে, এর জন্য জীনতত্ত্ব তথা জীববিজ্ঞানের কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নেই।

⚫ সিরাজাম মুনির

Share.

মন্তব্য করুন